ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে দেখা যাবে বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য
মহাকাশপ্রেমীদের জন্য এই ফেব্রুয়ারি মাসটি হতে যাচ্ছে দারুণ। মাসজুড়ে আকাশে দেখা মিলবে একের পর এক বিস্ময়কর দৃশ্য। এ মাসেই খালি চোখে দেখা যাবে সৌরজগতের ছয়টি গ্রহ। শুধু কি তাই? সঙ্গে দেখা মিলবে বিরল বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণও। তাহলে জেনে নেওয়া যাক এই বিরল মহাজাগতিক ঘটনার দিনক্ষণ।
আলফা সেন্টোরিড উল্কাবৃষ্টি
বছরের শুরুতে সাধারণত উল্কাবৃষ্টির খুব একটা দেখা যায় না। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে সেই শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করে ‘আলফা সেন্টোরিড’ উল্কাবৃষ্টি। ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আকাশে দেখা মিলবে আলফা সেন্টোরিড উল্কাবৃষ্টি। তবে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাবে ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে। যদি আকাশ পরিষ্কার আর অন্ধকার থাকে, তবে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ছয়টি করে উল্কা দেখার সুযোগ মিলতে পারে।
এই উল্কাবৃষ্টি মূলত দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো থেকে সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। তবে উত্তর গোলার্ধের একদম দক্ষিণ দিকের কিছু অঞ্চল থেকেও দেখা যাওয়া সম্ভব। এই দৃশ্য সবচেয়ে উপভোগ করা যায় মাঝরাতের পরে। আকাশের সেন্টোরাস নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে তাকালেই দেখা মিলবে এই চমৎকার উল্কাবৃষ্টির।
বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ
আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি মহাকাশে এক বিরল বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যানুলার সোলার ইক্লিপস’। এই গ্রহণে চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না। কারণ, চাঁদ তখন পৃথিবী থেকে বেশ দূরে থাকে। ফলে চাঁদের চারপাশ দিয়ে সূর্যের আলো দেখা যায়, যা দেখতে অনেকটা উজ্জ্বল ‘অগ্নিবলয়’ বা আগুনের আংটির মতো লাগে।
সূর্যগ্রহণের এই পূর্ণ রূপটি মূলত অ্যান্টার্কটিকা ও দক্ষিণ ভারত মহাসাগর এলাকা থেকে দেখা যাবে। তবে আর্জেন্টিনা, চিলি, বোতসোয়ানা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো থেকে এর আংশিক রূপ দেখার সুযোগ মিলবে।
চাঁদ ও বুধের দেখা
১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আকাশে এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখা যাবে। অমাবস্যার ঠিক এক দিন পরেই, এদিন চাঁদের একটি সরু রেখা দেখা যাবে বুধ গ্রহের একদম কাছাকাছি। বাইনোকুলার দিয়ে দারুণ দেখাবে। এই দৃশ্যটি দেখার জন্য খোলা কোনো জায়গায় যেতে হবে। কারণ, চাঁদ ও বুধ উভয়ই দিগন্তের বেশ নিচের দিকে থাকবে। সূর্যাস্তের পর প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত এদের আকাশে দেখা যাবে। ঠিক এই সময়েই আশপাশে শনি ও শুক্র গ্রহেরও দেখা মিলতে পারে।
তবে একটি বিষয়ে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। সূর্য পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার আগে ভুলেও টেলিস্কোপ বা বাইনোকুলার দিয়ে আকাশের ওই দিকে তাকানো যাবে না। সরাসরি সূর্যের দিকে তাকালে চোখের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
বুধ গ্রহকে দেখার সেরা সুযোগ
বুধ গ্রহ সূর্যের খুব কাছে থাকে বলে সাধারণত সূর্যের তীব্র আলোয় একে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ১৯ ফেব্রুয়ারি বুধ সূর্য থেকে এর সবচেয়ে দূরবর্তী অবস্থানে পৌঁছাবে। সহজ কথায়, এদিন বুধ সূর্য থেকে দূরে সরে গিয়ে আমাদের দেখার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গায় থাকবে। এই মাসের চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহের সারিবদ্ধ হওয়ার সময়েই বুধ গ্রহকে দেখার এমন সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি সূর্যাস্তের ঠিক পরেই পশ্চিম দিগন্তের দিকে তাকালে ঝকঝকে এই গ্রহটিকে দেখা যাবে।
প্যারেড অব প্ল্যানেট
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাতের আকাশে এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা যাবে। আকাশে এই সারিতে গ্রহদের বিশেষ অবস্থানকে বলা হয় প্যারেড অব প্ল্যানেট বা গ্রহের মিছিল। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত সন্ধ্যার আকাশে সারিবদ্ধভাবে ছয়টি গ্রহকে দেখা যাবে। সূর্যাস্তের ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যে পশ্চিম আকাশে তাকালে একসঙ্গে শুক্র, বুধ ও শনি গ্রহকে দেখতে পাবে।
এ সময় শনি গ্রহের খুব কাছ দিয়েই ঘুরে বেড়াবে নেপচুন। আর আকাশের পুব দিকে তাকালে মাঝবরাবর দেখা যাবে উজ্জ্বল বৃহস্পতি গ্রহকে। এ ছাড়া দক্ষিণ আকাশে ‘কৃত্তিকা’ নক্ষত্রপুঞ্জের ঠিক পাশেই থাকবে ইউরেনাস। তবে শুক্র, বুধ, শনি আর বৃহস্পতিকে খালি চোখে দেখা গেলেও, নেপচুন আর ইউরেনাসকে দেখতে কিন্তু একটি ভালো টেলিস্কোপ বা বাইনোকুলার লাগবে।
মিল্কিওয়ের উজ্জ্বল কেন্দ্র
আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের মাঝখানের উজ্জ্বল অংশটি সব সময় দেখা যায় না। শীতের সময় এটি আকাশের নিচের দিকে থাকে। ফলে দেখা যায় না। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে এটি আবার রাতের আকাশে দেখা যায়। বিশেষ করে শহরের আলো থেকে দূরে কোনো অন্ধকার জায়গায় গেলে এই দৃশ্যটি দারুণভাবে দেখা মেলে। ফেব্রুয়ারি মাসে এটি দেখতে হলে তোমাকে ভোরে উঠতে হবে। সূর্য ওঠার কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণ-পূর্ব দিকের আকাশে তাকালে মিল্কিওয়ের এই উজ্জ্বল কেন্দ্রটি দেখা যাবে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক নাইট স্কাই গাইড