কোন পাখির গান সবচেয়ে মিষ্টি
ভোরে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। বিছানায় শুয়ে শুয়েই শুনছ। ভেতরটা কেমন হালকা হয়ে গেল। আবার মনে করো গভীর রাতে হঠাৎ কোথাও একটা প্যাঁচা কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল তোমার। দুটোই পাখির ডাক। অথচ অনুভূতি দুই রকম। এমন হয় কেন?
জার্মানির তুবিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষক এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন জীববিজ্ঞানী নাদিন কালব। সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপক ক্রিস্টফ র্যান্ডলার। কাজটা বড় পরিসরের নয়। তবু ফলাফল ভাবার মতো। ১ সেপ্টেম্বর ফ্রন্টিয়ার্স জার্নালে ছাপা হয়েছে এটা।
পরীক্ষার পদ্ধতি সহজ। ৮৪ জন মানুষকে বুনো পাখির ডাকের রেকর্ডিং শোনানো হলো। পাখি ছিল ১২৩ প্রজাতির। প্রতিটা ডাক শুনে তাঁদের নম্বর দিতে হলো, পাঁচের মধ্যে। এরপর নম্বরগুলো ডাকের শব্দের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলো।
প্রথম হলো কমন ব্ল্যাকবার্ড। গড় নম্বর ৪ দশমিক ৫২। এটা ইউরোপের পাখি। বাগান, পার্ক আর বনে খুব দেখা যায়। ওর গান নরম, ভরাট, বাঁশির মতো সুরেলা।
সবার নিচে নামল বার্ন আউল, মানে শিঁয়ালপ্যাঁচা। নম্বর পেল ১ দশমিক ৩২। ওর ডাক খসখসে। মাঝখানের সারিতে আছে ইউরোপীয় গোল্ডফিঞ্চ, ৪ দশমিক ২৬। ইউরোপীয় রবিন পেয়েছে ৪ দশমিক ০৪। আর ব্লু টিট ৩ দশমিক ৯২।
এখন প্রশ্ন, কিছু ডাক মিষ্টি লাগে কেন? গবেষকেরা কয়েকটা জিনিস পেয়েছেন। মানুষ সাধারণত নরম আওয়াজ বেশি পছন্দ করে। যে ডাকের কম্পাঙ্কের পরিসর কম, সেটাও বেশি ভালো লাগে। কম্পাঙ্ক মানে সুর কত উঁচু বা নিচু। পরিসর কম মানে সুরটা খুব বেশি লাফালাফি করে না। আর তৃতীয় জিনিসটা একটু অদ্ভুত। জটিল ডাক বেশি নম্বর পেয়েছে।
এই তৃতীয় ফলটা র্যান্ডলারকেও অবাক করেছে। তিনি ভেবেছিলেন, সরল আর বারবার ফিরে আসা সুর বুঝতে সহজ, তাই সেগুলোই বেশি ভালো লাগবে। হলো উল্টো। যে গানে প্যাঁচ আছে, বাঁক আছে, ওঠানামা আছে, মানুষ সেটাই বেশি পছন্দ করেছে।
তবে একটা বৈশিষ্ট্য একা কিছু ঠিক করে দেয় না। নাদিন কালব সেটা পরিষ্কার বলেছেন। কম্পাঙ্ক, জোর আর পরিসর—এই তিনটি মিলে ঠিক হয় ডাকটা কেমন লাগবে। ব্ল্যাকবার্ড, উইলো ওয়ার্ব্লার আর ব্ল্যাকক্যাপের গান একেবারে আলাদা। তবু তিনটাই অনেক বেশি নম্বর পেয়েছে। মিষ্টি গানের তাই কোনো একটা ফর্মুলা নেই।
আরেকটা ব্যাপার ছিল। যাঁরা নম্বর দিয়েছেন, তাঁদের কেউ পাখি ভালো চেনেন, কেউ প্রায় চেনেনই না। কিন্তু নম্বরে তেমন ফারাক হয়নি। মানে পাখি চেনা থাকলে যে বেশি ভালো লাগবে, তা নয়। নাদিন কালবের কথায়, গান উপভোগ করার সঙ্গে আরও গভীর কিছু জড়িয়ে আছে। কোন পাখি ডাকছে, সেটা জানার চেয়েও গভীর।
সেই গভীর জিনিসটা কী? এই প্রশ্নের পুরো উত্তর কেউ জানে না। তবে একটা সম্ভাবনার কথা বলা হয়। আমাদের আদিম পূর্বপুরুষদের কথা ভাবো। বনের ভেতর পাখিরা নিজের মনে ডেকে যাচ্ছে। তার মানে আশপাশে কোনো বিপদ নেই। পাখির ডাক তখন হয়তো ছিল একরকম আশ্বাস। এটা এখনো অনুমান। প্রমাণ হয়নি। তবু ব্রিটেনের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ওলগা ফেহের মনে করেন, পাখির গান নিয়ে মানুষের পছন্দের পেছনে কিছু জৈবিক কারণ আছে। তিনি এই গবেষণায় ছিলেন না।
কিন্তু ফেহের নিজের একটা গল্পও বলেছেন। তিনি জেব্রা ফিঞ্চ নিয়ে কাজ করেন। ওই পাখির গান দ্রুত, যান্ত্রিক। অনেকে শুনে বিরক্ত হয়। ফেহেরের কিন্তু গানটা ভালো লাগে। কারণ, ওই পাখির সঙ্গে তাঁর ভালো কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কাজেই শুধু জীববিজ্ঞান নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও পছন্দ ঠিক করে।
এই কথাই আরেকজন গবেষক অন্যভাবে বলেছেন। তিনি রবার্ট ল্যাকল্যান, লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাখির যোগাযোগ নিয়ে কাজ করেন। তাঁর মতে, এই গবেষণা নতুন একটা দরজা খুলে দিয়েছে। তবে ভেতরে ঢুকতে আরও কাজ লাগবে। তিনি একটা প্রশ্নও তুলেছেন। গবেষণায় বলা হচ্ছে, কম পরিসরের সুর ভালো লাগে। কিন্তু ব্ল্যাকবার্ড আর নাইটিংগেলের মতো সুন্দর গলার পাখিরা তো তুলনায় নিচু সুরে বাঁশির মতো ডাকে। তাহলে কোন সুর আসলে আমাদের টানে?
গবেষকেরা বলছেন, এই ফল শহরের নকশা করার সময় কাজে লাগতে পারে। এত দিন শহর পরিকল্পনাকারীরা মূলত ভাবতেন, কীভাবে আওয়াজ কমানো যায়। এখন ভাবা দরকার, মানুষ কী শুনছে। পাখির গানও শহরের শব্দের অংশ। তবে র্যান্ডলার সাবধান করেছেন। পার্কে স্পিকার লাগিয়ে পাখির গান বাজালেই কাজ হবে না। তাঁর দল আগে দেখেছে, স্পিকারে বাজানো বাড়তি গান মনের আরাম বাড়ায় না। প্রকৃতিতে যে গান নিজে থেকে হয়, সেটাই কাজ করে।
ফেহেরের একটা সতর্কবার্তা আছে। মিষ্টি গলার পাখি নিয়েই যদি সবাই বেশি মাতামাতি করে, তাহলে কর্কশ গলার পাখিরা পিছিয়ে পড়বে। পাখি বাঁচানোর কাজে মানুষ হয়তো ওদের দিকে নজর কম দেবে। অথচ প্রকৃতিতে সবারই দরকার আছে। গান ভালো হোক বা না হোক।
এখন নিজের দেশের কথায় আসি। এই গবেষণার পাখিগুলো ইউরোপের। নম্বর যাঁরা দিয়েছেন, তাঁরাও ইউরোপের মানুষ। তাই দোয়েল, কোকিল বা বুলবুলির গান নিয়ে এখানে কিছু বলা নেই। র্যান্ডলার নিজেও বলেছেন, এই গবেষণা কেবল শুরু। কোন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পছন্দ জড়িয়ে আছে, তা জানা গেছে। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক কেন সেগুলো পছন্দ করে, তা এখনো জানা যায়নি। পরের ধাপে তাঁরা দেখতে চান, মানুষ কেন কিছু গান বেশি পছন্দ করে। আর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন পরিবেশে একই পছন্দ থাকে কি না।