তুমি কি রাত জাগো, নাকি তুমি ভোরের পাখি

দরকার পর্যাপ্ত ঘুমছবি: প্রথম আলো

রাত ১২টা পেরিয়ে গেছে। সবাই ঘুমাতে গেলেও তোমার চোখে ঘুম নেই। বরং এখনই যেন মাথায় আসছে নতুন নতুন ভাবনা! পড়তে বসলে, বই পড়লে কিংবা নিজের পছন্দের কাজ করলে সময় কীভাবে কেটে যায়, টেরই পাও না। আবার সকালে অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ার অভ্যাসও তোমার থাকতে পারে। ঘুম থেকে উঠেই মন ফুরফুরে, মাথাও বেশ পরিষ্কার। তোমার কোন অভ্যাসটা বেশি পরিচিত? তুমি কি রাত জাগো, নাকি ভোরেই ঘুম থেকে উঠে যাও?

মানুষের ঘুমানোর ও ঘুম থেকে জেগে ওঠার স্বাভাবিক সময়ের এ পার্থক্যকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ক্রোনোটাইপ’। কেউ স্বাভাবিকভাবেই সকালে বেশি সতেজ থাকে, কেউ রাতে। আবার অনেকের অভ্যাস এই দুইয়ের মাঝামাঝি। এটি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়। শরীরের ভেতরের দেহঘড়ি, বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

আরও পড়ুন

শরীরের ভেতরে যে ঘড়ি আছে

ধরো, তোমার ঘুমানোর সময় প্রতিদিন রাত ১১টা। কিন্তু ছুটির দিনে কোনো অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুমাতে গেলে দেখা গেল, রাত ২টার আগে ঘুমই আসছে না। সকালে আবার দেরি করে ঘুম ভাঙছে। এর মানে কি তুমি অলস? মোটেও নয়! এর পেছনে কাজ করতে পারে তোমার শরীরের নিজস্ব সময়ের ছন্দ।

আমাদের শরীরে রয়েছে প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি অভ্যন্তরীণ সময়ব্যবস্থা, যাকে বলা হয় ‘সার্কাডিয়ান রিদম’। কখন ঘুম পাবে, কখন সতেজ লাগবে, শরীরের তাপমাত্রা কখন বাড়বে বা কমবে, এমনকি বিভিন্ন হরমোন কখন নিঃসৃত হবে—এসবের অনেক কিছুই এই ছন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। দিনের আলো ও রাতের অন্ধকার দেহঘড়িকে সময় বুঝতে সাহায্য করে। খাবার খাওয়া, ব্যায়াম ও ঘুমানোর সময়ও এ ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে।

পৃথিবীর সব মানুষকে রাত জাগা ও ভোরের পাখি হিসেবে ভাগ করা যায় না। অনেকেই মাঝামাঝি ধরনের। আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের সময়ও বদলাতে পারে। যেমন কিশোর-কিশোরীদের অনেকেরই স্বাভাবিকভাবে রাতে দেরিতে ঘুম আসে এবং সকালে দেরিতে ঘুম ভাঙে। তাই রাতে দেরি করে ঘুমানো মানেই যে কারও ঘুমের সমস্যা আছে, এমন নয়।

আরও পড়ুন

রাতজাগার স্বাস্থ্যঝুঁকি কি বেশি?

রাতজাগা মানুষের জন্য গবেষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, রাতে বেশি সক্রিয় থাকা মানুষের হৃৎস্বাস্থ্যের কিছু সূচক অন্যদের তুলনায় খারাপ হতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয় জার্নাল অব দ্য আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সাময়িকীতে।

গবেষকেরা যুক্তরাজ্যের তিন লাখের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের গড় বয়স ছিল প্রায় ৫৭ বছর। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ নিজেদের নিশ্চিতভাবে রাতের মানুষ বলে জানিয়েছেন। প্রায় ২৪ শতাংশ ছিলেন নিশ্চিতভাবে সকালে ঘুম থেকে ওঠা মানুষ। বাকিদের বেশির ভাগের ঘুমের ধরন ছিল মাঝামাঝি।

গবেষণায় দেখা যায়, মাঝামাঝি ধরনের মানুষের তুলনায় রাতজাগা মানুষের হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্যের সামগ্রিক সূচক খারাপ হওয়ার হার ছিল ৭৯ শতাংশ বেশি। প্রায় ১৪ বছর ধরে অনুসরণের সময় তাঁদের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকিও ছিল ১৬ শতাংশ বেশি। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। এগুলো গবেষণায় পাওয়া দুই দলের মধ্যকার তুলনামূলক পার্থক্য। এর অর্থ এই নয় যে রাতজাগা প্রত্যেক মানুষের হৃদরোগ হওয়ার আশঙ্কা ৭৯ শতাংশ বেশি।

কেন এমন পার্থক্য দেখা গেল? গবেষকদের মতে, এর একটি বড় অংশের সঙ্গে জীবনযাপনের অভ্যাসের সম্পর্ক রয়েছে। রাতজাগা মানুষের মধ্যে ধূমপান, অপর্যাপ্ত ঘুম, অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং শারীরিক পরিশ্রম কম করার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। এসব অভ্যাস হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।

এ ছাড়া রাতে সক্রিয় মানুষের শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে দৈনন্দিন কাজের সময়ের অমিল হতে পারে। ধরো, তোমার শরীর রাত ২টায় ঘুমাতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু স্কুল বা কাজের জন্য তোমাকে সকাল ৬টায় উঠতে হয়। ফলে পর্যাপ্ত ঘুমানোর সুযোগ পাচ্ছ না। এভাবে নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি হলে শরীরের ওপর চাপ পড়তে পারে।

তবে গবেষকেরা বলছেন, রাতজাগা মানুষের শরীর এমনিতেই অসুস্থ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। গবেষণাটি মূলত সম্পর্ক দেখিয়েছে; রাতজাগার অভ্যাসই সরাসরি হৃদরোগের কারণ, তা প্রমাণ করেনি। গবেষণায় অংশ নেওয়া মানুষদের ঘুমের ধরনও তাঁদের নিজেদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

কত ঘণ্টা ঘুমানো দরকার?

ঘুমের প্রয়োজন বয়সভেদে আলাদা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সুপারিশ অনুযায়ী, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের দরকার অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুম।

অর্থাৎ তুমি রাত ১টায় ঘুমিয়ে সকাল ৯টায় উঠলেও পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর সুযোগ পেতে পারো। আবার রাত ১০টায় ঘুমিয়ে ভোর ৪টায় উঠে পড়লে ঘুমের ঘাটতি থেকে যেতে পারে। শুধু কখন ঘুমাতে যাচ্ছ, সেটাই শেষ কথা নয়; কতক্ষণ ঘুমাচ্ছ এবং ঘুমের মান কেমন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুমের অভ্যাস ভালো রাখতে প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করতে পারো। দিনের বেলায় আলো-বাতাসে সময় কাটানো, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত উজ্জ্বল পর্দার আলো এড়িয়ে চলাও কাজে আসতে পারে।

আর যদি রাতে ঘুম আসতে নিয়মিত সমস্যা হয়, পর্যাপ্ত সময় ঘুমিয়েও ক্লান্ত লাগে কিংবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

আরও পড়ুন