ফোর্টনাইট কীভাবে গেমের দুনিয়া জয় করল

ফোর্টনাইট

কল্পনা করো, বিশাল এক উড়ন্ত বাসে বসে আছ তুমি। তোমার সঙ্গে আছে আরও ৯৯ জন খেলোয়াড়। জানালার বাইরে তাকালে নিচে দেখা যাচ্ছে এক প্রকাণ্ড রহস্যময় দ্বীপ। হঠাৎ তোমাকে সেই বাস থেকে প্যারাস্যুট নিয়ে দ্বীপের কোনো এক অচেনা জায়গায় নামিয়ে দেওয়া হলো। তোমার কাছে তখন আত্মরক্ষার জন্য কিছুই নেই। এমন এক কঠিন পরিবেশে বুদ্ধির জোরে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ নিয়েই শুরু হয় ‘ফোর্টনাইট’ গেমের রোমাঞ্চকর অভিযান।

দ্বীপে পা রাখতেই শুরু হয় টিকে থাকার আসল লড়াই। প্রথম কাজ দ্রুত চারপাশের ঘরবাড়ি বা জঙ্গল চষে ফেলা। সেখান থেকেই তোমাকে খুঁজে নিতে হবে প্রয়োজনীয় সব অস্ত্র, গোলাবারুদ আর নিজেকে সুস্থ রাখার ওষুধ।

কিন্তু গেমে শান্ত হয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই একদম। কারণ, চারপাশ থেকে ধেয়ে আসছে এক প্রলয়ংকরী ঝড়। গেমটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে নির্দিষ্ট সময় পরপর এই ঝড় পুরো দ্বীপকে চারপাশ থেকে ছোট করে আনে। কেন জানো? যাতে সব খেলোয়াড় শেষ পর্যন্ত একটা ছোট জায়গায় একে অপরের মুখোমুখি হতে বাধ্য হয় এবং লড়াইটা জমে ওঠে। একবার এই বিষাক্ত ঝড়ের কবলে পড়লে বাঁচার আশা কিন্তু একবারে শেষ।

আরও পড়ুন
শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে কিংবা সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে এই ‘বিল্ডিং’ বা তৈরির ক্ষমতা তোমাকে দেবে অন্য রকম এক স্বাধীনতা।
রয়টার্স

বর্তমানে ভিডিও গেমের জগতে সবচেয়ে আলোচিত নাম ফোর্টনাইট (Fortnite)। ফোর্টনাইট গেমটি যে কতটা জনপ্রিয়, তা এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায়। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৬৫ কোটির বেশি মানুষ গেমটি খেলেছেন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষ গেমটি খেলার সুযোগ পাচ্ছেন একদম বিনা মূল্যে। প্রতিদিন গড়ে তিন–চার কোটি মানুষ গেমটি খেলে থাকেন। বিশেষ কোনো ইভেন্ট বা নতুন সিজন শুরু হলে এই সংখ্যা একলাফে ছয় কোটি ছাড়িয়ে যায়।

আমরা আজ যে ফোর্টনাইটকে চিনি, এর শুরুটা কিন্তু একটু ভিন্ন ছিল। ২০১১ সালে যখন গেমটির ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন এটি ছিল ‘ফোর্টনাইট: সেভ দ্য ওয়ার্ল্ড’। এটি তৈরি করেছে বিখ্যাত মার্কিন গেম ডেভেলপার কোম্পানি এপিক গেমস (Epic Games)। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এটি প্রথম বাজারে আসে।

তবে শুরুতে এটি এখনকার মতো ১০০ জনের মারকাটারি ‘ব্যাটল রয়্যাল’ গেম ছিল না। তখন এটি ছিল জম্বিদের হাত থেকে নিজের দুর্গ বাঁচানোর একটি দলগত খেলা। গেমটিতে হঠাৎ আসা এক রহস্যময় ঝড়ে পৃথিবীর ৯৮ শতাংশ মানুষ হারিয়ে যায় এবং অন্যদের ওপর হামলা করতে শুরু করে জম্বি। খেলোয়াড়দের কাজ ছিল দল বেঁধে নিজেদের এলাকা রক্ষা করা ও দুর্গ তৈরি করে টিকে থাকা।

আরও পড়ুন
প্রতিটি সিজন যখন আসে, তখন গেমের মানচিত্র বা ম্যাপ বদলে যায়। যুক্ত হয় অত্যাধুনিক সব অস্ত্র আর শুরু হয় এক নতুন রোমাঞ্চকর গল্প।

কিন্তু ইতিহাসের মোড় ঘুরে গেল ওই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাসে, গেমটিতে যখন ১০০ জনের টিকে থাকার ‘ব্যাটল রয়্যাল’ মোডটি যুক্ত করা হলো। জম্বিদের লড়াই থেকে নিজেদের মধ্যে টিকে থাকার এই অনন্য লড়াই মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পেল। এভাবে একটি সাধারণ জম্বি গেম থেকে ফোর্টনাইট হয়ে উঠল বর্তমান গেমিং জগতের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী গেম।

তবে ফোর্টনাইট অন্য সব গেমের চেয়ে আলাদা কেন জানো? এখানে তুমি শুধু যুদ্ধই করবে না, তুমি হবে একজন কারিগর। হাতের কুড়াল দিয়ে গাছ বা পাথর ভেঙে কাঠ আর ইট সংগ্রহ করে বানিয়ে ফেলতে পারো বিশাল দেয়াল কিংবা মজবুত দুর্গ। শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে কিংবা সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে এই ‘বিল্ডিং’ বা তৈরির ক্ষমতা তোমাকে দেবে অন্য রকম এক স্বাধীনতা। এ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত যে ব্যক্তি বা দলটি টিকে থাকে, তাদের পর্দায় ভেসে ওঠে ‘ভিক্টরি রয়্যাল’ লেখা।

ফোর্টনাইট কম্পিউটার, প্লে স্টেশন কিংবা স্মার্টফোন—সব মাধ্যমেই একদম বিনা মূল্যে খেলা যায়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ‘ক্রস-প্লে’ ফিচার। অর্থাৎ তুমি মোবাইল থেকে খেললেও পিসি বা কনসোলে থাকা বন্ধুর সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। এ ছাড়া অন্যান্য অ্যাকশন গেমের মতো এতে খুব বেশি রক্তারক্তি নেই। বরং এর রঙিন ও কার্টুনিশ গ্রাফিকস সব বয়সের মানুষকে, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের সবচেয়ে পছন্দের। সেই সঙ্গে জনপ্রিয় তারকাদের ভার্চ্যুয়াল কনসার্ট আর বিখ্যাত গেমাররা গেমটিকে বিশ্বজুড়ে এক বিশাল উন্মাদনায় পরিণত করেছে।

আরও পড়ুন
ফোর্টনাইটকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে গেমারদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। গেমটি যখন নতুন বাজারে আসে, তখন একদল গেমার ইন্টারনেটে সরাসরি স্ট্রিম করে দেখাতে শুরু করেন।

ফোর্টনাইট গেমটি কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। খেলোয়াড়দের মনে সারাক্ষণ কৌতূহল ধরে রাখতে এপিক গেমস গেমটিকে ভাগ করেছে বিভিন্ন ‘চ্যাপ্টার’ ও ‘সিজনে’। বর্তমানে ফোর্টনাইট চলছে চ্যাপ্টার ৭ সিজন ১। আর সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত গেমটি ৩৯টি সিজন পার করেছে।

প্রতিটি সিজন যখন আসে, তখন গেমের মানচিত্র বা ম্যাপ বদলে যায়। যুক্ত হয় অত্যাধুনিক সব অস্ত্র আর শুরু হয় এক নতুন রোমাঞ্চকর গল্প। ফলে পুরোনো খেলোয়াড়েরা বছরের পর বছর ধরে খেলেও কখনো একঘেয়েমি বোধ করেন না। প্রতিটি সিজন যেন একেকটি নতুন রহস্যময় অ্যাডভেঞ্চার, যা জয় করতে সব সময় মুখিয়ে থাকে লাখ লাখ খেলোয়াড়।

ফোর্টনাইট প্রায়ই বিশ্বখ্যাত ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে কোলাবরেশন করে। নতুন সিজনে মার্ভেল কিংবা ডিসির সুপারহিরোদের দেখা যায়। এমনকি স্টার ওয়ারস, নারুটো কিংবা জন উইকের মতো জনপ্রিয় চরিত্রগুলোকেও এই গেমে দেখা যায়। গেমটির আরেকটি মজার দিক হলো, বাস্তব জীবনে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন নাচ বা অঙ্গভঙ্গি, যা গেমে ‘ইমোটস’ হিসেবে যুক্ত করা হয়।

আরও পড়ুন
‘নিনজা’র মতো গেমিং সুপারস্টার কিংবা ‘বুঘা’র সাফল্য লাখ লাখ কিশোরকে এই গেমের প্রতি অনুপ্রাণিত করেছে।

ফোর্টনাইটকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে গেমারদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। গেমটি যখন নতুন বাজারে আসে, তখন একদল গেমার ইন্টারনেটে সরাসরি স্ট্রিম করে দেখাতে শুরু করেন। তাদের সেই রোমাঞ্চকর লড়াই দেখে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি কিশোর এই গেমের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। বিখ্যাত র৵াপার ড্রেক, ফুটবল তারকা নেইমার জুনিয়র কিংবা বাস্কেটবল কিংবদন্তি লেব্রন জেমসের মতো তারকারাও নিয়মিত এই গেমে সময় কাটান।

‘নিনজা’র মতো গেমিং সুপারস্টার কিংবা ‘বুঘা’র সাফল্য লাখ লাখ কিশোরকে এই গেমের প্রতি অনুপ্রাণিত করেছে। ২০১৯ সালে আয়োজিত ফোর্টনাইট ওয়ার্ল্ড কাপে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই বুঘা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি জিতে নেন ৩০ কোটি টাকার বেশি, যা তাঁকে ফোর্টনাইটের ইতিহাসে সর্বাধিক উপার্জনকারী খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। আর নিনজা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গেম স্ট্রিমার। এমন আরও হাজার হাজার ফোর্টনাইট গেমার আছে বিশ্বজুড়ে।

সূত্র: প্লে স্টেশন, দ্য গার্ডিয়ান, এনবিসি নিউজ

আরও পড়ুন