শরৎকালে গাছের পাতার রং বদলে যায় কেন
সারা বিশ্বে শরৎ বা হেমন্ত এলে প্রকৃতিতে দারুণ এক পরিবর্তন আসে, যার প্রভাব বাংলাদেশের প্রকৃতিতেও দেখা যায়। এই পরিবর্তন বিশেষভাবে চোখে পড়ে গাছের পাতার রং বদলে যাওয়ার সময়। যদিও আমাদের দেশে ইউরোপ বা আমেরিকার মতো গাছের পাতা লাল, হলুদ বা কমলা রঙের বাহার খুব কম দেখা যায়, তবু পার্ক বা বাগানে এই সময়ে পাতার রঙের পরিবর্তন বেশ ভালোই বোঝা যায়। মূলত এই সময়ে অনেক গাছের পাতা সবুজ রং হারিয়ে ধীরে ধীরে হলদেটে বা বাদামি হতে শুরু করে। কিন্তু গাছেরা কেন এমন করে? তাপমাত্রা কমা বা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে পাতার এই রঙের পরিবর্তনের আসল কারণটা কী?
প্রায়ই ইনস্টাগ্রামে দেখা মেলে, বিদেশের রাস্তায় সারি সারি গাছ লাল, হলুদ বা কমলা রঙের পাতায় ভরে আছে। এই অসাধারণ দৃশ্য দেখতেই বিশ্বের নানা প্রান্তের পর্যটকরা শরৎকালে কলোরাডো, ভারমন্ট বা ম্যাসাচুসেটসের মতো জায়গায় ভিড় করেন।
গাছ খাদ্য নিজেরা তৈরি করে, আর পাতা হলো এই খাদ্যের কারখানা। বছরের বেশিরভাগ সময় ধরে পাতার ক্লোরোফিল (Chlorophyll) নামক একটি রঞ্জক কণার কারণে পাতা সবুজ থাকে। এই ক্লোরোফিল সূর্যালোক ব্যবহার করে গাছের জন্য খাদ্য তৈরি করে। প্রক্রিয়াটিকে সালোকসংশ্লেষণ বলা হয়। ক্লোরোফিল সবুজ আলো ছাড়া বাকি সব আলো শোষণ করে নেয়, তাই সবুজ রং প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে। কিন্তু শরৎকাল এলে দিন ছোট হয়ে যায়। তখন গাছেরা সালোকসংশ্লেষণের পরিমাণ কমিয়ে দেয় এবং পাতা থেকে এদের দরকারি পুষ্টি বা শক্তি ধীরে ধীরে মূলের দিকে টেনে নিতে শুরু করে।
শরৎকালে সালোকসংশ্লেষণ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছেরা নতুন করে ক্লোরোফিল তৈরি করা বন্ধ করে দেয়। তখন পাতার ভেতরে থাকা সবুজ রঙের আস্তরণটি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। আসলে এই সবুজ রঙের নিচে অন্য রঙের কিছু রঞ্জক কণা সবসময় থাকে। এর মধ্যে রয়েছে হলুদ রঙের ফ্ল্যাভোনল ও জ্যান্থোফিল এবং কমলা রঙের ক্যারোটিনয়েড। ক্লোরোফিলের মাত্রা কমে গেলেই সেই লুকিয়ে থাকা হলুদ ও কমলা রংগুলো দেখা যায়।
পাতার মধ্যে এত রঞ্জক কণা থাকার বড় সুবিধা আছে। বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করতে পারলে গাছ সালোকসংশ্লেষণের সময় বেশি শক্তি সংগ্রহ করতে পারে। এতগুলো রঞ্জক তৈরি করা ব্যয়বহুল হলেও, যে গাছেরা এই কৌশল ব্যবহার করে, এরা দ্রুত বাড়ে।
কিছু বিশেষ গাছের প্রজাতি আবার কেবল শরৎকালে অ্যান্থোসায়ানিন (Anthocyanin) নামক আরও এক ধরনের রঞ্জক তৈরি করে। এই অ্যান্থোসায়ানিনগুলোই পাতায় লাল ও বেগুনি রঙের সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ক্লোরোফিল চলে যাওয়ার পরেও অ্যান্থোসায়ানিন পাতাগুলোকে সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। যাতে গাছ পাতা ঝরার আগে পাতা থেকে শেষবারের মতো পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে।
এছাড়াও প্রতিটি পাতায় রঞ্জক পদার্থের পরিমাণ আলাদা হয়। এ জন্যই একটি গাছের মধ্যেও পাতার রং ভিন্ন ভিন্ন হয়। আর পাতা ঝরে যাওয়ার ঠিক আগে গাছ সমস্ত ক্লোরোফিল শুষে নিয়ে নিজেদের কাছে রেখে দেয়। এর ফলে পরের বছর বসন্ত এলে গাছগুলোকে প্রথম থেকে নতুন করে পুষ্টি তৈরি করতে হয় না। ঋতু পরিবর্তনের সময় গাছের পাতার রং বদলানো আসলে গাছের এক ধরনের শক্তি বাঁচানোর কৌশল।
তবে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, শরৎকালে রঙের পরিবর্তন মূলত পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও, কখন এই পরিবর্তন শুরু হবে তা কিছুটা জিনগত কারণের ওপরেও নির্ভর করে। গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, রঙ পরিবর্তনের সময়কালে হাজার হাজার জিন ভিন্নভাবে কাজ করে। এই কারণেই সোরউড গাছের মতো কিছু প্রজাতি গ্রীষ্মের শেষের দিকেই রং বদল শুরু করে দেয়। অন্যদিকে ওক গাছ অন্য সব গাছের পাতা ঝরে যাওয়ার অনেক পরেও নিজেদের পাতা ধরে রাখে।
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান, লাইভ সায়েন্স, আইএফএল সায়েন্স