অ্যান্টার্কটিকায় পেঙ্গুইন ছোঁয়া কেন বারণ

অ্যান্টার্কটিকায় বরফরে রাজ্যে পেঙ্গুইনের সঙ্গে মেলিসা সুমিত্রা রায়। ছবি: সংগৃহীত

অ্যান্টার্কটিকার বরফে ঢাকা দেশের পেঙ্গুইনদের জন্য মানুষের সবচাইতে ভালো কাজ কোনটি জানো? এদের জন্য কিছুই না করা। অর্থাৎ এদের বিরক্ত না করে দূরে থাকা।

বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পর্যটকেরা অ্যান্টার্কটিকা ঘুরে দেখার সুযোগ পান। তাঁদের ধারণ করা ভিডিওগুলোতে পেঙ্গুইনদের অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ড দেখা যায়। প্রায়ই পেঙ্গুইনরা কোনো ভয় ছাড়াই মানুষের একদম কাছে চলে আসে। অনেক সময় পর্যটকেরাও পেঙ্গুইনদের চলাচলের পথে দাঁড়িয়ে পড়েন।

মানুষের প্রতি পেঙ্গুইনদের কিংবা পেঙ্গুইনদের প্রতি মানুষের এই কৌতূহল শেষ পর্যন্ত এই প্রাণীদের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে। মানুষের খুব কাছাকাছি যাওয়া বা এদের স্পর্শ করা এই মেরু অঞ্চলের প্রাণীদের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কীভাবে?

আরও পড়ুন
সামান্য একটু বাইরের তেল বা লোশন পেঙ্গুইনের পালকের বিন্যাস নষ্ট করে দেয়। এতে পালকগুলো অগোছালো হয়ে জট পাকিয়ে যায়। ফলে এদের শরীরের সেই পানিরোধী ক্ষমতা আর থাকে না।

তার আগে কখনো ভেবে দেখেছ পেঙ্গুইন অ্যান্টার্কটিকার হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় কীভাবে বেঁচে থাকে? উত্তরটা খুব সহজ, শুধুমাত্র এদের সাদা কালো পালকের সাহায্যে। মূলত পেঙ্গুইনের পালকগুলো শরীরের ওপর এমনভাবে সাজানো থাকে, যা বাতাসকে আটকে রেখে চামড়ার চারপাশে একধরনের উষ্ণ ইনসুলেশন তৈরি করে। এই পালকগুলো একই সঙ্গে ওয়াটারপ্রুফ। ফলে বরফশীতল পানিতে সাঁতার কাটার সময় এগুলো শরীরকে ভিজতে দেয় না ও মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রাতেও এদের শরীর দিব্যি গরম রাখে।

তবে আসল সমস্যাটা শুরু হয় তখন, যখন মানুষ শখের বসে পেঙ্গুইনদের স্পর্শ করে। আমাদের ত্বকে প্রাকৃতিকভাবেই একধরনের তেল থাকে। এ ছাড়া শীতের শুষ্কতা থেকে বাঁচতে আমরা হাতে বিভিন্ন ধরনের লোশন বা ক্রিম ব্যবহার করি। এই তেল বা লোশন আমাদের জন্য ভালো হলেও, পেঙ্গুইনদের সূক্ষ্ম পালকের জন্য তা ভীষণ ক্ষতিকর।

গবেষণায় দেখা গেছে, সামান্য একটু বাইরের তেল বা লোশন পেঙ্গুইনের পালকের বিন্যাস নষ্ট করে দেয়। এতে পালকগুলো অগোছালো হয়ে জট পাকিয়ে যায়। ফলে এদের শরীরের সেই পানিরোধী ক্ষমতা আর থাকে না। তখন বরফশীতল পানি সরাসরি এদের চামড়ায় গিয়ে লাগে, যা এদের জীবনের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করে।

আরও পড়ুন
এমনকি করোনা মহামারির সময়ও বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছিলেন যাতে অজান্তেই মানুষের শ্বাসতন্ত্রের কোনো ভাইরাস অ্যান্টার্কটিকার বন্য প্রাণীদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে।

ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ। পালকের সুরক্ষা হারিয়ে পেঙ্গুইনটি দ্রুত শরীরের তাপমাত্রা হারিয়ে হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি শরীর ভিজে ভারী হয়ে যাওয়ার কারণে সে পানিতে ডুবে যেতে পারে অথবা খাবার সংগ্রহ করতে অক্ষম হয়ে পড়তে পারে।

পেঙ্গুইনদের কাছে যাওয়া বা স্পর্শ করা কেবল এদের শারীরিক ক্ষতিই করে না। সঙ্গে তীব্র মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, মানুষের উপস্থিতিতে এদের স্ট্রেস হরমোন দ্রুত বেড়ে যায়। বারবার মানুষের কারণে বিরক্ত হলে পেঙ্গুইনরা এদের বাসা বাঁধার স্বাভাবিক অভ্যাস বদলে ফেলে। এতে বংশবৃদ্ধির হার কমিয়ে দেয়।

এ ছাড়া আমরা জানি, রোগ সাধারণত প্রাণীর দেহ থেকে মানুষের শরীরে আসে। কিন্তু এর উল্টোটাও ঘটতে পারে। যাকে বলা হয় রিভার্স জুনোসিস। অর্থাৎ মানুষের বহন করা রোগজীবাণু কোনো বন্য প্রাণীর শরীরে ছড়িয়ে পড়া।

আরও পড়ুন
একটি পেঙ্গুইনকে শুধু একবার স্পর্শ করা কিংবা অসাবধানতাবশত সেখানে কোনো জিনিস ফেলে আসার মাধ্যমেই নতুন কোনো রোগজীবাণু এদের এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে।

পেঙ্গুইনরা লাখ লাখ বছর ধরে অ্যান্টার্কটিকার বরফে বিচ্ছিন্নভাবে বাস করে আসছে। এর ফলে মানুষের শরীরে থাকা অনেক সাধারণ ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়ার মতো রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এদের তৈরি হয়নি। আমাদের কাছে যা সাধারণ ব্যাকটেরিয়া, পেঙ্গুইনদের জন্য তা হতে পারে প্রাণঘাতী।

জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের উপস্থিতির কারণে পেঙ্গুইনদের কলোনিতে সালমোনেলার মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছিলেন যাতে অজান্তেই মানুষের শ্বাসতন্ত্রের কোনো ভাইরাস অ্যান্টার্কটিকার বন্য প্রাণীদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে।

বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিক মরুভূমি
ছবি: রয়টার্স

একটি পেঙ্গুইনকে শুধু একবার স্পর্শ করা কিংবা অসাবধানতাবশত সেখানে কোনো জিনিস ফেলে আসার মাধ্যমেই নতুন কোনো রোগজীবাণু এদের এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে। একটি মাত্র পেঙ্গুইন থেকে সেই রোগ মুহূর্তেই পুরো পেঙ্গুইন কলোনিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই যৌক্তিক কারণেই অ্যান্টার্কটিক চুক্তির অধীনে বন্য প্রাণীদের বিরক্ত করা বা স্পর্শ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থা আইএটিও (IAATO) আরও কড়া নিয়ম করে দিয়েছে। সেখানে বলা আছে দর্শনার্থীদের পেঙ্গুইন থেকে কমপক্ষে পাঁচ মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এমনকি সেখানে যাওয়ার আগে জুতা ও সরঞ্জামগুলো জীবাণুমুক্ত করা বাধ্যতামূলক। যাতে আমাদের অজান্তেই কোনো রোগজীবাণু সেখানে পৌঁছাতে না পারে। দশকের পর দশক ধরে গবেষণার পরেই এই নিয়মগুলো তৈরি করা হয়েছে। যাতে পৃথিবীর এই শেষ অস্পৃশ্য পরিবেশটি সুরক্ষিত থাকে।

আরও পড়ুন