বর্ণবাদের শিকার মানুষদের রক্ষা করতে সংগঠনে যোগ দিয়েছিলেন আইনস্টাইন
আইনস্টাইন খুব দ্রুত মার্কিনদের জীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। এই দেশের সাধারণ মানুষের মানসিকতা ও স্বাধীন চিন্তাচেতনা তাঁর খুব ভালো লেগেছিল।
সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার দেখে। আমেরিকায় যে কেউ ভয়ডরহীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারত। কিন্তু জার্মানিতে? সেখানে অবস্থা ছিল ভয়ংকর! নাৎসি পার্টি শহর–গ্রামের অলিগলিতে গুপ্তচর বসিয়ে রাখত। কেউ যদি প্রকাশ্যে হিটলার বা তাঁর কোনো কাজের সমালোচনা করত, তবে তাকে ভয়াবহ শাস্তি দেওয়া হতো।
কিন্তু আইনস্টাইন দেখলেন, আমেরিকায় মানুষকে নতুন ধারণা নিয়ে ভাবতে ও স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়। তিনি আরও একটি ব্যাপার খুব পছন্দ করলেন। এখানে একজন সাধারণ মানুষও কঠোর পরিশ্রম করলে ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ালে জীবনে অনেক উন্নতি করতে পারে।
এর আগে আইনস্টাইন যেসব দেশে গেছেন, সেখানে একটি বিষয় তাঁকে খুব বিরক্ত করত। সেসব দেশে শুধু পরিচিতি থাকার জোরে মানুষ অনেক টাকা অর্জন করতে পারত। মানে, আমাদের দেশে যেটাকে মামা–চাচার জোর বলে, অনেকটা তেমন। আইনস্টাইনের কাছে এটা একদমই হাস্যকর মনে হতো।
আমেরিকায় থিতু হওয়ার পর আইনস্টাইন আবারও তাঁর তত্ত্ব নিয়ে গবেষণায় মন দিলেন। ১৯২০–এর দশকের শেষের দিকে তিনি এমন একটি তত্ত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, যার নাম ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি। খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আইনস্টাইন মহাবিশ্বের সব শক্তি কীভাবে বস্তুর ওপর কাজ করে, তা মাত্র একটি সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। তিনি বহু বছর ধরে এই তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন। এখন আমরা এই তত্ত্বকে বলি থিওরি অব এভরিথিং বা সবকিছুর তত্ত্ব।
আইনস্টাইন যদি এই তত্ত্বে সফল হতেন, তবে এটি দিয়ে মহাবিশ্বের বস্তুর গতিবিধির মতো সব প্রাকৃতিক ঘটনা আগে থেকেই বলে দেওয়া সম্ভব হতো। পদার্থবিজ্ঞানের সব ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্বকে একটি বিশাল সমীকরণের ভেতরে নিয়ে আসার অদম্য ইচ্ছা থেকেই এই কাজ শুরু করেছিলেন তিনি।
একাডেমিক জীবনে আইনস্টাইনের আরেকটি বড় চমক ছিল ১৯৩৫ সালে। এ বছর তিনি বরিস পোডলস্কি ও নাথান রোজেনের সঙ্গে মিলে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এর নাম ছিল আইনস্টাইন–পোডলস্কি–রোজেন প্যারাডক্স, সংক্ষেপে ইপিআর প্যারাডক্স। এই তিনজন মিলে এই প্যারাডক্স ব্যবহার করে কোয়ান্টাম মেকানিকসের অনেক নিয়মের ওপর প্রশ্ন তুলেছিলেন।
আমেরিকায় আইনস্টাইনের দিনগুলো শান্তিতে কাটলেও পুরো সময় কিন্তু শান্তির ছিল না। তাঁর স্ত্রী এলসা বহু বছর ধরে তাঁকে সব কাজে সাহস জুগিয়েছেন এবং মানসিক শান্তি দিয়েছেন। প্রিন্সটনের মার্সার স্ট্রিটে নিজেদের নতুন বাড়িতে ওঠার কিছুদিন পরই এলসা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অনেক ডাক্তার দেখিয়ে ও নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে জানা গেল, এলসার হার্ট ও কিডনিতে মারাত্মক সমস্যা ধরা পড়েছে। আইনস্টাইন সাধ্যমতো চেষ্টা করলেন স্ত্রীকে সুস্থ করে তুলতে। কিন্তু নিজের স্ত্রীকে চোখের সামনে এভাবে কষ্ট পেতে দেখাটা তাঁর জন্য ছিল চরম মানসিক যন্ত্রণার। এই কষ্ট ভোলার জন্য তিনি আগের চেয়ে আরও বেশি গবেষণায় ডুবে গেলেন।
১৯৩৬ সালের ২০ ডিসেম্বর এলসা চিরদিনের জন্য চোখ বুজলেন। আইনস্টাইনের হৃদয় যেন টুকরা টুকরা হয়ে গেল। এই দম্পতির এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানিয়েছিলেন, এলসাকে হারানোর পর তিনি আইনস্টাইনকে কাঁদতে দেখেছিলেন! এর আগে কেউ কখনো আইনস্টাইনকে কাঁদতে দেখেনি।
আমেরিকাকে আইনস্টাইন ভালোবাসতেন ঠিকই, এখানকার স্বাধীনতাও তাঁর পছন্দ ছিল, কিন্তু এই দেশের একটি জিনিস তাঁর কাছে ভীষণ আপত্তিকর মনে হতো। তা হলো, বর্ণবাদ! বর্ণবাদ মানে হলো, শুধু গায়ের রং বা জাতির কারণে কোনো একটি গোষ্ঠীকে ঘৃণা করা। আমেরিকার অতীতে এমন অনেক ভয়ংকর বর্ণবাদী ঘটনা ঘটেছে। হয়তো কারও চেহারা কালো বলে তাকে রেস্তোরাঁয় খেতে দেওয়া হতো না। অনেকের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, মারধর করা, এমনকি মেরে ফেলার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটেছে।
যেহেতু আইনস্টাইন নাগরিক অধিকারে বিশ্বাস করতেন এবং মনে করতেন প্রত্যেক মানুষের সমান মূল্য আছে, তাই আমেরিকার এই রূপ তাঁর কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ছিল। হিটলারের জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর যে ভয়ংকর বর্ণবাদ নেমে এসেছিল, সেই স্মৃতি তাঁর মনে এখনো দগদগে। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, এই নতুন দেশেও মানুষ হয়তো সেভাবেই আচরণ করছে!
আইনস্টাইন তাঁর এই বর্ণবাদবিরোধী লড়াই শুরু করেছিলেন নিজের শহর প্রিন্সটন থেকেই। তিনি খুব দ্রুতই বুঝতে পারলেন, সে সময়কার প্রিন্সটন শহরটি ছিল ভীষণভাবে বিভক্ত। মানে, একই এলাকায় থাকার পরও বিভিন্ন বর্ণের মানুষকে আলাদা করে রাখার এক জঘন্য প্রথা। প্রিন্সটনে শ্বেতাঙ্গদের এলাকা থেকে দূরে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য আলাদা ব্ল্যাক নেইবারহুড ছিল। কিছু কিছু দোকান শুধু সাদা চামড়ার মানুষদেরই জিনিসপত্র বিক্রি করত। কৃষ্ণাঙ্গদের বাধ্য হয়ে বাজার করতে হতো অন্য দোকান থেকে।
এই সবকিছু দেখে আইনস্টাইন শিউরে উঠলেন। তিনি এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি মনে করতেন, এটি শ্বেতাঙ্গদের মানসিকতা থেকে তৈরি হওয়া একটি রোগ। তিনি ঘোষণাই দিয়েছিলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে চুপ করে থাকার পাত্র নই।’
আইনস্টাইন সবাইকে সমান সম্মান দিতেন এবং যাদের সঙ্গে অন্যায় হতো, তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। একবার মারিয়ান অ্যান্ডারসন নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ গায়িকা প্রিন্সটনে এসেছিলেন। কিন্তু শুধু গায়ের রঙের কারণে কোনো হোটেল তাঁকে ঘর ভাড়া দেয়নি! ঘটনা শুনে আইনস্টাইন সেই গায়িকাকে নিজের বাড়ি এনে থাকার জায়গা দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি এক তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পুরো খরচও জুগিয়েছিলেন। কারণ, ওই ছাত্রের পড়ার খরচ চালানোর ক্ষমতা ছিল না।
এ ছাড়া আইনস্টাইন ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালারড পিপল বা এনএএসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। এটি আমেরিকার একটি বিখ্যাত সংগঠন। এই সংগঠনের কাজ হলো, বর্ণবাদের শিকার মানুষদের রক্ষা করা। এটি ১৯০৯ সালে তৈরি হয়েছিল। এটিই আমেরিকার সবচেয়ে পুরোনো নাগরিক অধিকার রক্ষার সংগঠন।
আমেরিকায় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আইনস্টাইনের এই লড়াই আগামী বছরগুলোয়ও চলতে থাকবে। মজার ব্যাপার হলো, আইনস্টাইনের এই রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা নিয়ে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই খুব দুশ্চিন্তায় ছিল। তারা আইনস্টাইনের ওপর নজরদারি করার জন্য একটি গোপন ফাইলও খুলেছিল!
তবে ১৯৩০–এর দশকের শেষের দিকে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যা ঘটছিল, তা নিয়ে আইনস্টাইন ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। জার্মানিতে হিটলার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাবান। সহিংসতা ও বর্ণবাদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে হিটলার তখন পুরো ইউরোপ দখলের ছক কষছেন। তাঁর ভয়ংকর লক্ষ্য ছিল, ইহুদি ও তাঁর চোখে যারা অযোগ্য, তাদের এই পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেওয়া। এই বিকৃত চিন্তাভাবনা নিয়েও হিটলার ও তাঁর নাৎসি বাহিনী অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। আইনস্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন, অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই এই পাগলপ্রায় মানুষটিকে থামাতে হবে!