মানুষের হৃৎপিণ্ড কেন মাথার কাছাকাছি থাকে
মানুষের হৃৎপিণ্ড দেহের কোন দিকে থাকে? বাঁ দিকে, তাই না? হুম, তোমার উত্তরটা প্রায় ঠিক, কিন্তু পুরোটা নয়।
স্কুলে আমরা সবাই পড়েছি যে হৃৎপিণ্ড বুকের বাঁ পাশে থাকে। ডাক্তার যখন স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুক পরীক্ষা করেন, তখনো ওটা বাঁ দিকেই রাখেন। তাই আমাদের মনে হয়, হৃৎপিণ্ড বুঝি বুকের বাঁ পাশেই চুপটি করে বসে আছে। কিন্তু সত্যিটা হলো, হৃৎপিণ্ড আসলে বুকের ঠিক মাঝখানে থাকে! শুধু একটু বাঁ দিকে হেলে থাকে, এ–ই যা!
ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল অ্যানাটমি লার্নিং সেন্টারের পরিচালক ও অধ্যাপক অ্যাডাম টেইলর আমাদের এই মজার তথ্যগুলো জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের হৃৎপিণ্ডটা তার জায়গায় পৌঁছানোর আগে বেশ লম্বা একটা পথ ভ্রমণ করে। চলো, তাঁর মুখ থেকেই হৃৎপিণ্ডের এই ঠিকানা বদলের গল্প শুনে নিই।
হৃৎপিণ্ড আসলে কোথায় থাকে
অ্যাডাম টেইলর বলছেন, হৃৎপিণ্ড থাকে আমাদের বুকের খাঁচার ভেতরে। পাঁজর আর স্টারনাম একে রক্ষা করে। বুকের মাঝখানের শক্ত হাড়কে বলে স্টারনাম। হৃৎপিণ্ড আসলে বুকের ঠিক মাঝখানে থাকে। কিন্তু এর একটা অংশ বাঁ দিকে একটু হেলে থাকে। এ কারণেই আমাদের বাঁ ফুসফুসটা ডান ফুসফুসের চেয়ে একটু ছোট হয়, যাতে হৃৎপিণ্ডটা সেখানে জায়গা করে নিতে পারে।
তাহলে ডাক্তাররা কেন বাঁ দিকে পরীক্ষা করেন?
খুব ভালো প্রশ্ন! স্টারনাম বা বুকের মাঝখানের হাড়টা বেশ শক্ত। এর ভেতর দিয়ে হৃৎপিণ্ডের ধকধক শব্দ শোনা কঠিন। কিন্তু হৃৎপিণ্ডের নিচের দিকের কোনাটা বাঁ দিকে থাকে। আর পাঁজরগুলোর মাঝখানের ফাঁকা জায়গা দিয়ে এই শব্দটা খুব স্পষ্টভাবে শোনা যায়। ডাক্তাররা আসলে হৃৎপিণ্ডের ভাল্ভগুলো খোলার আর বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনেন। আর সেটা বাঁ দিক থেকেই সবচেয়ে ভালো শোনা যায়।
হৃৎপিণ্ড কি কাত হয়ে থাকে
টেইলর বলেছেন, হৃৎপিণ্ড দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো। আর পিরামিডটা কাত হয়ে পড়ে আছে। মিসরের পিরামিডের কথা ভাবো। ওটার যেমন একটা চূড়া থাকে, হৃৎপিণ্ডেরও তেমন একটা চূড়া আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে অ্যাপেক্স। এই অ্যাপেক্সই বাঁ দিকে থাকে। আর এর চ্যাপটা ভিত্তিটা থাকে পেছনের দিকে, ডান পাশে।
এমন অদ্ভুত আকার কেন
মায়ের পেটে যখন আমরা খুব ছোট ছিলাম, তখন আমাদের হৃৎপিণ্ডটা ছিল একটা সোজা পাইপের মতো। তারপর সেটা ভাঁজ হয়ে ইংরেজি ‘U’ অক্ষরের মতো আকার নেয়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা মোচড়াতে থাকে এবং ঘোরে। শেষমেশ এমন একটা আকার নেয়, যেন মনে হয় কাত হয়ে পড়ে আছে। আর এর কোনাটা চলে যায় বুকের বাঁ দিকে। কোনা মানে ওই অ্যাপেক্স।
কাত হয়ে থাকার সুবিধা কী
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, রক্ত পাম্প করার জন্য এটাই হৃৎপিণ্ডের সেরা পজিশন। যদি হৃৎপিণ্ড সোজা হয়ে থাকত, তবে মাধ্যাকর্ষণ বলের বিরুদ্ধে রক্ত পাম্প করতে অনেক কষ্ট হতো। কিন্তু কাত হয়ে থাকায় রক্ত পাম্প করা একটু সহজ হয়ে যায়।
হৃৎপিণ্ড কি অন্য কোথাও থাকতে পারে
সাধারণত না। মায়ের পেটে ভ্রূণ অবস্থায় হৃৎপিণ্ড তৈরি হয় মাথার কাছে! তারপর সেটা নিচে নেমে বুকের খাঁচায় এসে থামে। যেহেতু হৃৎপিণ্ড বেশ বড়সড় একটা পেশি, তাই ওটা নামার সময় অন্য সব অঙ্গকে সরিয়ে নিজের জায়গা করে নেয়।
তবে খুব বিরল কিছু ক্ষেত্রে হৃৎপিণ্ড ভুল দিকে থাকতে পারে। একে বলা হয় সিটাস ইনভার্সাস। এ অবস্থায় মানুষের শরীরের সব অঙ্গ উল্টো দিকে থাকে! মানে হৃৎপিণ্ড থাকে ডান দিকে, আর লিভার থাকে বাঁ দিকে। মজার ব্যাপার হলো, এতে শরীরের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। অনেক সময় মানুষ জানতেই পারে না যে তার সব অঙ্গ উল্টো দিকে আছে। অন্তত যতক্ষণ না ডাক্তার স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে অবাক হয়ে যান!
হৃৎপিণ্ড কি নড়াচড়া করতে পারে
হৃৎপিণ্ড বসে থাকে ডায়াফ্রাম নামে একটা বড় পেশির ওপর। এই ডায়াফ্রাম আমাদের বুক আর পেটের মাঝখানে থাকে এবং শ্বাস নিতে সাহায্য করে। আমরা যখন জোরে শ্বাস নিই, তখন ডায়াফ্রাম নিচে নামে, সঙ্গে হৃৎপিণ্ডকেও একটু নিচে টেনে নিয়ে যায়।