জাপানি চা মাচা যেভাবে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হলো

আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা ক্যাফেতে সবুজ রঙের এক পানীয় চোখে পড়ে, যার নাম ‘মাচা’। চা থেকে শুরু করে কেক, পেস্ট্রি বা আইসক্রিম সবকিছুতেই এখন এই সবুজ গুঁড়ার ব্যবহার দেখা যায়। একসময় কেবল জাপানের ঐতিহ্যবাহী চা হিসেবে পরিচিত মাচা আজ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু সাধারণ চা থেকে এই সবুজ চা কেন এত জনপ্রিয় হলো? কেনই–বা স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ থেকে শুরু করে জেন-জি এটি এত পছন্দ করছে?

মাচা আসলে কী

জাপানি ভাষায় ‘মাচা’ শব্দের অর্থ হলো ‘গুঁড়া চা’। এটি একটি উজ্জ্বল সবুজ রঙের গুঁড়া, যা গরম পানিতে ভালো করে ফেটিয়ে পান করতে হয়। ইচ্ছা করলে এর সঙ্গে দুধ মিশিয়ে সুস্বাদু ‘মাচা ল্যাটে’ তৈরি করা যায়।

নবম শতাব্দীর শুরুতে চীন থেকে জাপানে প্রথম সবুজ চায়ের আগমন ঘটে। সেই সময়ে এটি মূলত ওষুধ হিসেবে বা শরীর ভালো রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো।

তবে আজকের মাচার ইতিহাস শুরু হয় আরও পরে। ষোড়শ শতাব্দীতে জাপানের কিয়োটো শহরের বিখ্যাত চায়ের ওস্তাদ ‘সেন নো রিকিউ’ মাচাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি জাপানের ঐতিহ্যবাহী চা অনুষ্ঠানে বিশেষ কায়দায় গরম পানিতে মাচা গুঁড়া ফেটিয়ে চা তৈরি করতেন। তিনি সবাইকে শেখান, শুধু চা পান করাই বড় কথা নয়। বরং শান্ত মনে চা বানানোর মাধ্যমে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। তার এই ভাবনা ও চা বানানোর পদ্ধতিটি জাপানিদের মন জয় করে নেয়। সেখান থেকে মাচা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে জাপানে।

বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন মানের বা গ্রেডের মাচা পাওয়া যায়। চা হিসেবে খাওয়ার জন্য উচ্চমানের সেরিমোনিয়াল গ্রেড এবং বিভিন্ন খাবার, কেক ও পেস্ট্রি তৈরিতে ব্যবহারের জন্য কুলিনারি গ্রেড মাচা পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন

মাচা কীভাবে তৈরি করা হয়

মাচা কিন্তু যেকোনো সাধারণ চায়ের পাতা থেকে তৈরি হয় না। এটি তৈরি করা হয় তেনচা নামের একটি বিশেষ চায়ের পাতা থেকে। চায়ের পাতা তোলার আগের কয়েক সপ্তাহ এই চায়ের গাছগুলোকে ছায়ায় ঢেকে রাখা হয়। ছায়ায় রাখার ফলে পাতার স্বাদ, উজ্জ্বল সবুজ রং এবং ভেতরের পুষ্টিগুণ অনেকগুণ বেড়ে যায়।

টোকিওর উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সায়ামা এলাকার একজন চা–চাষি মাসাহিরো ওকুতমি জানান, মাচার পাতা চাষের জন্য সূর্যের আলো আটকানোর একটি বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়। গাছের ওপর বাঁশ বা খুঁটি বসিয়ে ছাদ তৈরি করে আলো ছাঁকার কাঠামো তৈরি করা হয়।

ছায়ায় বড় হওয়ায় তেনচা পাতায় প্রচুর পরিমাণে ক্লোরোফিল ও এল-থিয়ানিন তৈরি হয়। এল-থিয়ানিন হলো এমন একটি উপাদান, যা মন চাঙা ও শান্ত রাখতে সাহায্য করে। পাতা তোলার সময় এই পাতাগুলো খুব যত্নে হাত দিয়ে তোলা হয় এবং পাতার ভেতরের শক্ত শিরা ফেলে দেওয়া হয়। এরপর পাতাগুলো ভাপিয়ে শুকিয়ে নেওয়া হয়। সবশেষে দুটি পাথরের জাঁতায় ঘুরিয়ে পিষে অতি সূক্ষ্ম গুঁড়া তৈরি করা হয়।

মাচা তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। মাত্র ৪০ গ্রাম মাচা গুঁড়া তৈরি করতে পাথরের জাঁতায় প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এই অতিরিক্ত সময় ও কঠোর পরিশ্রমের কারণেই বাজারে মাচার দাম সাধারণ সবুজ চায়ের চেয়ে গড়ে প্রায় দ্বিগুণ।

আরও পড়ুন
মাচা চা
ছবি: পেক্সেলস

মাচার উপকারিতা কী

অনেকে মাচা পান করে রিফ্রেশিং স্বাদের জন্য। আবার অনেকে পছন্দ করে এর দুর্দান্ত স্বাস্থ্যগুণের কারণে। মাচাতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট রয়েছে। পাশাপাশি এতে থাকা ক্যাফেইন মনোযোগ বাড়াতে এবং শরীরকে চাঙা রাখতে সাহায্য করে। এক কাপ মাচায় গড়ে প্রায় ৪৮ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। এটি সাধারণ গ্রিন টি এর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। তবে কফির চেয়ে সামান্য কম।

টোকিওর পুরোনো চায়ের দোকান জুগেৎসুদোর ম্যানেজার শিগেহিতো নিশিকিদা জানান, বেশির ভাগ মানুষ স্বাস্থ্যকর মনে করেই মাচা বেছে নেয়। তবে শুধু স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, মানুষ মাচার সঙ্গে জড়িত জাপানি সংস্কৃতির প্রতিও বেশ আকর্ষণ বোধ করে। বিশেষ নিয়মে চা বানানোর পদ্ধতি, মন শান্ত রেখে চা তৈরির সময় এবং তা পরিবেশনের সুন্দর নিয়ম মানুষকে খুব মুগ্ধ করে।

আরও পড়ুন

মাচা কেন এত জনপ্রিয়

জাপানে আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি মাচা তৈরি হচ্ছে। ২০১৩ সালে যেখানে মাত্র ১ হাজার ৪৩০ টন মাচা তৈরি হতো, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ১৭৬ টনে। আর ২০২৫ সালে জাপান থেকে মাচা রপ্তানি হয় ১২ হাজার ৬১২ টন।

জাপানের কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উৎপাদিত এই মাচার অর্ধেকের বেশি পাঠানো হয় বিদেশে। বিশেষ করে আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এর দারুণ চাহিদা রয়েছে।

টিকটক, ইনস্টাগ্রাম আর ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে মাচা বানানোর অজস্র ভিডিও আছে। সুন্দর করে মাচার পানীয় তৈরি করা কিংবা বাঁশের তৈরি বিশেষ ব্রাশ ‘চাসেন’ দিয়ে চা ফেটানোর দৃশ্য মানুষকে বেশ আকর্ষণ করে।

সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে মূলত জেন-জিরা মাচাকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। তবে কোনো একজনের জন্য কিন্তু মাচা বিখ্যাত হয়নি। স্বাস্থ্যসচেতনতা, নতুন জীবনযাত্রা এবং ডিজিটাল মিডিয়ার প্রভাবই মাচাকে এত পরিচিত করেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইনফ্লুয়েন্সাররা নিয়মিত মাচার উপকারিতার নিয়ে কন্টেন্ট বানান। সঙ্গে বড় ক্যাফেগুলোয় মাচা ল্যাটে বা আইসড মাচার মতো নতুন পানীয় চালু করায় সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

আবার টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে সবুজ রঙের মাচা তৈরির ভিডিওগুলো বেশ ভাইরাল। চা তা ছাড়া এটি দিয়ে কেক, পেস্ট্রি বা আইসক্রিম তৈরিতেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এসব কারণেই মাচা আজ সবার কাছে এত পছন্দের হয়ে উঠেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ফ্রান্স ২৪
আরও পড়ুন