মেয়াদ শেষের আগেই চাঁদে মানুষ পাঠাতে চান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তিনি কি সফল হবেন

৫০ বছর পর মানুষ আবার চাঁদে ফিরছে, কিন্তু এবার দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। নাসার নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর হাতে। একদিকে চীনের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে ট্রাম্পের সময়ের আলটিমেটাম। সবকিছু সামলে নিরাপদে চাঁদে অবতরণ কি সম্ভব?

মেয়াদ শেষের আগেই চাঁদে মানুষ পাঠাতে চান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পছবি: এএফপি

ডোনাল্ড ট্রাম্প চান তাঁর প্রেসিডেন্সির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যেন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা আবার চাঁদের মাটিতে পোঁতা হয়। কিন্তু আসলেই কি তা সম্ভব?

২০২৬ সালটা মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে এক অনন্য বছর হতে যাচ্ছে। সব ঠিক থাকলে ৫০ বছর পর মানুষ আবার চাঁদের দিকে যাত্রা করতে প্রস্তুত। এ বছরেই মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা আর্টেমিস ২ মিশনে নভোচারীদের আবার চাঁদের কক্ষপথ ঘুরিয়ে আনবে। কিন্তু ট্রাম্পের লক্ষ্য শুধু ঘুরে আসা নয়, চাঁদের মাটিতে মানুষের নামা!

এই কঠিন লক্ষ্য পূরণের পথে নাসা এখন এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুনলে অবাক হবে, নাসার নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বিলিয়নিয়ার ও প্রাইভেট অ্যাস্ট্রোনট জ্যারেড আইজ্যাকম্যান। অন্যদিকে ইলন মাস্ক ও জেফ বেজোসের মতো ধনকুবেরদের প্রাইভেট স্পেস কোম্পানিগুলো এখন আর নাসার নিছক সহকারী নয়, বরং মূল চালিকা শক্তি হিসেবে মাঠে নামছে। তাদের সবার লক্ষ্য একটাই, চীনের আগে চাঁদে পৌঁছানো।

আরও পড়ুন

মহাকাশের এই দৌড় এখন সরাসরি চীনের সঙ্গে। গত ডিসেম্বরে জ্যারেড আইজ্যাকম্যানকে নাসার পরবর্তী প্রধান হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। আইজ্যাকম্যান শুধু বিলিয়নিয়ারই নন, তিনি স্পেসএক্স প্রধান ইলন মাস্কের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মিত্র। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি একদম পরিষ্কার। চীন ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের চাং’ই প্রজেক্টের মাধ্যমে চাঁদে মানুষ পাঠানোর যে পরিকল্পনা করেছে, তার আগেই আমেরিকাকে সেখানে পৌঁছাতে হবে। প্ল্যানেটারি সোসাইটির স্পেস পলিসি ডিরেক্টর ক্যাসি ড্রায়ার বলছেন, বিগত বছরটি ছিল আর্টেমিস প্রোগ্রামের জন্য একটা মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। এখন আর কোনো রাখঢাক নেই, আমেরিকা সরাসরি চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আইজ্যাকম্যান নিজেও দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই এক্স হ্যান্ডলে ঘোষণা দিয়েছেন, মহাকাশে আমেরিকার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই তাঁদের এক নম্বর অগ্রাধিকার।

মিশন আর্টেমিসের বর্তমান অবস্থা এক বছর আগের তুলনায় বেশ ভালো মনে হচ্ছে। টাইমলাইনটাও এখন অনেকটা স্পষ্ট। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে আর্টেমিস ২ উৎক্ষেপণ করা হবে। তবে মনে রাখবে, এই মিশনে নভোচারীরা চাঁদের বুকে নামবেন না, শুধু চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। আর আর্টেমিস ৩ হলো সেই বহুপ্রতীক্ষিত মিশন, যা ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে চাঁদের বুকে মানুষ নামাবে। এতে চারজন ক্রু থাকবেন। এই চারজনের মধ্যে একজন থাকবেন নারী। তিনিই চাঁদের বুকে পা রাখা প্রথম নারী হবেন।

আরও পড়ুন

রকেট নিয়ে বিতর্কও এত দিনে কম হয়নি। এক বছর আগেও নাসার নিজস্ব রকেট এসএলএস নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা ছিল। এটি বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং তৈরিতে অনেক দেরি হচ্ছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, নাসা হয়তো এসএলএস বাদ দিয়ে ইলন মাস্কের স্টারশিপ ব্যবহার করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে স্টারশিপই মূল ভরসা হবে। তবে ট্রাম্পের এই দ্রুততম সময়ে পতাকা ওড়ানোর সাধ মেটাতে হলে আপাতত এসএলএসই ভরসা। খোদ আইজ্যাকম্যান সিনেট শুনানিতে বলেছেন, আমেরিকান নভোচারীদের চাঁদে ফেরানোর জন্য এসএলএস এবং বর্তমান আর্টেমিস আর্কিটেকচারই সবচেয়ে দ্রুততম উপায়। যদিও দীর্ঘ মেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়।

মিশনের পরিকল্পনা যতই সুন্দর হোক, পেছনের গল্পটা কিন্তু বেশ গোলমেলে। ক্যাসি ড্রায়ার মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো মিশনের পর এই প্রথম মানুষ চাঁদে যাচ্ছে। কিন্তু সাফল্য এখনো নিশ্চিত নয়। নাসার ভেতরে গত এক বছরে ব্যাপক তোলপাড় চলেছে। কর্মী ছাঁটাই হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক বাজেট প্রস্তাব করেছিল, যা অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে মেরে ফেলত। যদিও কংগ্রেস সেটা বাতিল করেছে। আইজ্যাকম্যানের নিয়োগ নিয়েও চলেছে দীর্ঘ নাটক। বাজেট কাটছাঁটের কারণে নাসার অনেক দক্ষ লোকবল নষ্ট হয়েছে। তারা কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই একটা বছর নষ্ট করেছে। এখন আইজ্যাকম্যানের হাতে সময় আছে মাত্র তিন বছর বা হয়তো এক বছর। কারণ, এরপরই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

আরও পড়ুন
শিল্পীর কল্পনায় নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রাম
ছবি: সংগৃহীত

এখন সময় এসেছে নাসার পুরোপুরি প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল হওয়ার। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির স্পেস পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্কট পেস মনে করেন, ‘এখন দরকার ঠিকঠাক বাস্তবায়ন। ২০২৬ সালে আমরা মহাকাশে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পার্টনারশিপের নতুন রূপ দেখব। ইলন মাস্কের স্পেসএক্স আর্টেমিস ৩ ও ৪ মিশনের জন্য হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম তৈরি করছে। ২০২৫ সালে তারা একাই ১৬৫টি রকেট লঞ্চ করেছে। জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিনও পিছিয়ে নেই; তাদের বিশাল রকেট নিউ গ্লেন মঙ্গলের পথে পা বাড়িয়েছে। ২০৩০ সালের আগেই তাদের ল্যান্ডার ওড়ানোর পরিকল্পনা আছে। এমনকি ভার্জিন গ্যালাকটিকও তাদের নতুন মহাকাশযান লঞ্চ করার পরিকল্পনা করছে।

তাহলে ঝুঁকিটা কোথায়? সবকিছু শুনতে দারুণ লাগলেও রকেট ওড়ানোর চেয়ে কঠিন কাজ হলো ভিনগ্রহের মাটিতে সেটা নিরাপদে নামানো। ক্যাসি ড্রায়ার যেমনটা বলেছেন, মহাকাশে কিছু পাঠানো সহজ কাজ, কিন্তু ভিনগ্রহের মাটিতে সেটা নিরাপদে নামানো অনেক কঠিন। আমেরিকা তাদের জাতীয় সম্মান ও নিরাপত্তার মতো বিশাল বিষয়গুলো এমন এক-দুটি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিয়েছে, যাদের আগে কখনো চাঁদে মানুষ নামানোর অভিজ্ঞতা নেই। পরিস্থিতিটা এমন দাঁড়িয়েছে যে আমেরিকা নিজের জাতীয় অগ্রাধিকারের চালকের আসনে না থেকে এখন অনেকটা দর্শকের ভূমিকায় চলে গেছে। নিয়ন্ত্রণ এখন নাসার চেয়ে বেশি প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর হাতে। ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চাঁদে পতাকা উড়বে কি না, তা এখন নির্ভর করছে এই কোম্পানিগুলো কতটা নিখুঁতভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে তার ওপর।

সূত্র: গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন