আইনস্টাইন কি সত্যিই পারমাণবিক বোমা বানাতে সাহায্য করেছিলেন

পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনছবি: বেটম্যান / গেটি ইমেজ

আইনস্টাইন সারা জীবন বিশ্বাস করেছেন, যুদ্ধ করা চরম অন্যায়। কিন্তু তাঁর আজীবনের এই বিশ্বাসের এক কঠিন পরীক্ষা এবার দিতে হবে।

আইনস্টাইন ছিলেন কট্টর শান্তিবাদী। মানে তিনি যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, মানুষের যেকোনো ঝামেলা শান্তিপূর্ণভাবে মেটানো উচিত। কিন্তু হিটলারের উত্থানের পর তাঁর এই শান্তিবাদী বিশ্বাসে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। জার্মানিতে হিটলার ও তাঁর নাৎসি বাহিনী তখন ইহুদিদের ওপর নানাভাবে ভয়ংকর হামলা চালাচ্ছিল। তারা ইহুদিদের উপাসনালয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিচ্ছিল। ইহুদিদের ধরে ধরে জেলে আটকে রাখছিল। তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছিল। ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে হিটলারের নাৎসি বাহিনী জার্মানির আশপাশের বেশ কয়েকটি দেশও দখল করে নেয়। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

ইউরোপের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে আইনস্টাইন ভীষণ চিন্তায় পড়ে যান। এ সময় তিনি ও লিও সিলার্ড নামের আরেক জার্মান-ইহুদি পদার্থবিজ্ঞানী মিলে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টকে একটি চিঠি লিখলেন। চিঠিতে তাঁরা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে সতর্ক করে বললেন, হিটলার এমন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করছেন, যাঁরা নাৎসিদের সমর্থন করেন এবং তাঁরা একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছেন! এটি তখন সম্ভব হয়েছিল, কারণ বিজ্ঞানীরা সদ্য নিউক্লিয়ার ফিশন নামের একটি প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছিলেন। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একটি পরমাণুকে ভেঙে ফেললে তা থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি বেরিয়ে আসে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, এই নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়াটি আবিষ্কার করেছিলেন জার্মানিরই দুই বিজ্ঞানী—অটো হান ও ফ্রিৎস স্ট্র্যাসম্যান! তাই হিটলারের হাতে এই ভয়ংকর অস্ত্র চলে যাওয়াটা ছিল সময়ের ব্যাপারমাত্র।

আরও পড়ুন
এই বিশাল প্রজেক্টে স্বয়ং আইনস্টাইনই ছিলেন না! যেহেতু তিনি কট্টর শান্তিবাদী ছিলেন, তাই সরকার তাঁকে এই ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে চায়নি।

পদার্থবিজ্ঞানীরা খুব দ্রুত নিউক্লিয়ার ফিশনের এই ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা বুঝতে পেরেছিলেন। এটি প্রমাণ করার জন্য বিজ্ঞানী সিলার্ড নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু পরীক্ষাও করেন। তিনি বুঝতে পারেন, পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম নামের খনিজ পদার্থ সবচেয়ে উপযোগী। কারণ, ইউরেনিয়াম সহজে তোলা যায় এমন এটি তেজস্ক্রিয় খনিজ। এর পরমাণুগুলোকে ভেঙে বিশাল পরিমাণ শক্তি তৈরি করা সম্ভব। ফলে এমন এক বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে, যার আকার ও শক্তি হবে কল্পনাতীত। নাৎসি বিজ্ঞানীরা যদি সত্যিই এমন কোনো অস্ত্র তৈরি করে ফেলতে পারেন, তবে হিটলারের হাতে পৃথিবীর প্রতিটি দেশ দখল করার মতো ক্ষমতা চলে আসবে।

১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়

প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট সঙ্গে সঙ্গে এই বিপদের গভীরতা বুঝতে পারলেন। তিনি ‘অ্যাডভাইজরি কমিটি অন ইউরেনিয়াম’ নামের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করলেন। এখান থেকেই শুরু হলো সেই বিখ্যাত ও গোপন প্রকল্প ‘ম্যানহাটান প্রজেক্ট’। এটি ছিল আমেরিকার নেতৃত্বে একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রকল্প। ১৯৪২ সালের জুন মাস থেকে ইউএস আর্মি এই প্রজেক্ট পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এই পুরো প্রজেক্টের সামরিক প্রধান ছিলেন জেনারেল লেসলি গ্রোভস।

খুব দ্রুত ম্যানহাটান প্রজেক্টের কাজ চলতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি গ্রেট ব্রিটেন ও কানাডাও এই প্রজেক্টে সমর্থন দিয়েছিল। শুরুতে মাত্র কয়েক ডজন কর্মী নিয়ে কাজ শুরু হলেও শেষের দিকে এই প্রকল্পে ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করছিলেন! সে সময়ের সবচেয়ে সম্মানিত ও প্রতিভাবান বিজ্ঞানীরা এখানে কাজ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এনরিকো ফার্মি, রিচার্ড ফাইনম্যান ও রবার্ট ওপেনহাইমারের মতো দিকপাল বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানী ওপেনহাইমারকে বলা হয় পারমাণবিক বোমার জনক। নিউ মেক্সিকোর লস অ্যালামোসের এক নির্জন মরুভূমিতে এই বোমার গোপন গবেষণাগার তৈরি করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন
এত বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর আইনস্টাইনকে ভয়ংকর অনুশোচনায় ডুবিয়ে দেয়। সিলার্ড ও আইনস্টাইন যে চিঠি রুজভেল্টকে পাঠিয়েছিলেন, তা লিখেছিলেন স্বয়ং সিলার্ড।

কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার কী জানো? এই বিশাল প্রজেক্টে স্বয়ং আইনস্টাইনই ছিলেন না! যেহেতু তিনি কট্টর শান্তিবাদী ছিলেন, তাই সরকার তাঁকে এই ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে চায়নি। এ ছাড়া মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা আইনস্টাইনের বামপন্থী রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার কারণে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি বলে মনে করত। এই প্রজেক্ট এতই গোপনে চালানো হয়েছিল যে আইনস্টাইন ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসের আগ পর্যন্ত এর বিন্দুবিসর্গও জানতে পারেননি!

১৯৪৫ সাল। নাৎসিরা তখন যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে। অবশেষে এপ্রিল মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সৈন্যরা জার্মানির রাজধানী বার্লিন ঘিরে ফেলল। শত্রুদের হাতে ধরা পড়ার চেয়ে হিটলার নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি আত্মহত্যা করলেন। এর পরপরই জার্মানি আত্মসমর্পণ করল। কিন্তু এশিয়ায় জাপান তখনো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড়। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট মারা যাওয়ায় দায়িত্ব নেন হ্যারি এস ট্রুম্যান। তিনি বুঝতে পারলেন, জাপান না থামলে এই যুদ্ধ আরও কয়েক বছর ধরে চলতে পারে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ম্যানহাটান প্রজেক্টের তৈরি করা দুটি পারমাণবিক বোমা জাপানে ব্যবহার করা হবে।

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরে প্রথম বোমাটি ফেলা হয়। বোমাটির নাম ছিল ‘লিটল বয়’। এরপর ৯ আগস্ট জাপানের নাগাসাকিতে ফেলা হলো দ্বিতীয় বোমাটি, এর নাম ছিল ‘ফ্যাট ম্যান’। এই ভয়ংকর বোমার আঘাতে জাপান আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

আরও পড়ুন
আলবার্ট আইনস্টাইন

কিন্তু এই দুই বোমায় প্রায় আড়াই লাখ জাপানি নাগরিক প্রাণ হারায়! এত বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর আইনস্টাইনকে ভয়ংকর অনুশোচনায় ডুবিয়ে দেয়। সিলার্ড ও আইনস্টাইন যে চিঠি রুজভেল্টকে পাঠিয়েছিলেন, তা লিখেছিলেন স্বয়ং সিলার্ড। সেই চিঠি পড়েই প্রেসিডেন্ট বোমা তৈরির কাজ শুরু করেন। কিন্তু তাতে আইনস্টাইনের দোষ ঢাকা পড়ে না। কারণ, চিঠির নিচে তাঁর স্বাক্ষর ছিল। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, চিঠির নিচে তাঁর নিজের সই ও সমর্থন না থাকলে প্রেসিডেন্ট বিষয়টিকে এত গুরুত্ব দিতেন না।

১৯৪৬ সালের মে মাসে তিনি এবং তাঁর মতো একই চিন্তাধারার অন্য বিজ্ঞানীরা মিলে ‘ইমার্জেন্সি কমিটি অব অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’ নামের আরেকটি সংগঠন গড়ে তোলেন।

আইনস্টাইন যখন বুঝতে পারলেন, তাঁরই গবেষণা ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরিতে সাহায্য করেছে, তখন তাঁর আক্ষেপ ও কষ্ট আরও গভীর হলো। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি প্রায়ই বলতেন, পারমাণবিক বোমা তৈরির চিঠিতে সমর্থন দেওয়াটা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল! একবার তিনি গভীর দুঃখে বলেছিলেন, ‘আমি যদি জানতাম, জার্মানি পারমাণবিক বোমা বানাতে সফল হবে না, তাহলে আমি জীবনেও ওই চিঠিতে সই করতাম না। এর চেয়ে আমি বরং রাস্তার ধারে বসে ঘড়ি মেরামত করতাম!’ তবু হিটলারকে আগে বোমা বানানো থেকে আটকানোর জন্য তখন এটি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না বলেও তিনি সান্ত্বনা খুঁজতেন।

পারমাণবিক বোমার এই ভয়াবহতা দেখে আইনস্টাইন খুব দ্রুতই বুঝে গেলেন, বিশ্ব এখন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। মানুষের হাতে এখন এমন এক অসীম ক্ষমতা চলে এসেছে, যা দিয়ে তারা চারপাশের পুরো পৃথিবীকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই মানুষকে এখন খুব দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে।

আরও পড়ুন

এই দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার জন্য আইনস্টাইন ন্যাশনাল কমিটি অন অ্যাটমিক ইনফরমেশনের সঙ্গে যুক্ত হন। এই কমিটি কয়েক ডজন শিক্ষামূলক, নাগরিক ও ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করত। যেহেতু পারমাণবিক বোমা তৈরির বিষয়টি শুরু থেকেই একটি গোপন প্রজেক্ট ছিল, তাই সাধারণ মানুষ যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে এর অস্তিত্বই জানত না। পারমাণবিক শক্তির এই ভয়ংকর ক্ষমতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন ও শিক্ষিত করাটা আইনস্টাইনের কাছে খুব জরুরি মনে হয়েছিল।

১৯৪৬ সালের মে মাসে তিনি এবং তাঁর মতো একই চিন্তাধারার অন্য বিজ্ঞানীরা মিলে ‘ইমার্জেন্সি কমিটি অব অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’ নামের আরেকটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই দ্বিতীয় সংগঠনটিও সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। সেই সঙ্গে তারা বিশ্বের নেতাদের বোঝানোর চেষ্টা করে, তারা যেন ভবিষ্যতে আর পারমাণবিক বোমা ব্যবহার না করে শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে কাজ করে।

পরের বছরগুলোতে আইনস্টাইন এই কমিটিগুলোর লক্ষ্য পূরণের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজে নিজের নাম ও জনপ্রিয়তা ব্যবহার করেন। তিনি জাতিসংঘকে অনুরোধ করেন, তারা যেন এমন কিছু কড়া নিয়ম তৈরি করে, যাতে যেসব দেশের কাছে পারমাণবিক বোমা আছে, তারা এর যথেচ্ছ ব্যবহার করতে না পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব ও জাতিসংঘের চরম ব্যর্থতার কারণে ১৯৫১ সালে এই কমিটি ভেঙে দিতে বাধ্য হন বিজ্ঞানীরা।

তবে কমিটি ভেঙে গেলেও আইনস্টাইন দমে যাননি। তিনি প্রকাশ্যে তাঁর সেই দৃঢ় বিশ্বাস প্রচার করতে থাকলেন। তিনি বললেন, মানবজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য শান্তিই হলো একমাত্র এবং সত্যিকারের পথ।

সূত্র: ডি কে প্রকাশনীর লাইফ স্টোরিস সিরিজের আলবার্ট আইনস্টাইন বই অবলম্বনে

আরও পড়ুন