আসল টাকা তবে বিনিময় মূল্য নেই
তোমরা কি জানো, বাংলাদেশে ২৫ টাকা, ৪০ টাকা কিংবা ৬০ টাকার নোট আছে? হুট করে দেখলে অনেকেই হয়তো চমকে যাবে। এগুলো আসলে স্মারক নোট। কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কিংবা বর্তমান সময়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্মারক নোট প্রকাশের নজির রয়েছে। স্মারক নোট মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে—‘বিনিময়যোগ্য’ এবং ‘বিনিময়যোগ্য নয়’। বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯৬ সালে প্রচলিত ১০ টাকা মূল্যের নোটের ওপর ‘বিজয় দিবস রজতজয়ন্তী ’৯৬’ কথাটি ওভারপ্রিন্ট করে প্রথমবারের মতো স্মারক নোট বাজারে এনেছিল। তৎকালীন গভর্নর লুৎফর রহমান সরকারের স্বাক্ষর করা ওই নোটটি ছিল বিনিময়যোগ্য স্মারক নোট। পরে একে একে আরও ১৩টি নোট বাজারে ছাড়া হয়, এর মধ্যে ২০২১ সালে প্রকাশিত ৫০ ও ২০০ টাকার নোট দুটি ছাড়া বাকি একটি নোটও ‘বিনিময়যোগ্য নয়’। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত যে ১৪টি স্মারক নোট অবমুক্ত করেছে, তার মধ্যে ১১টি নোটেরই নেই কোনো বাজারমূল্য। এই ১১টি স্মারক নোট নামেই শুধু টাকা, আসলে টাকা নয়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে ‘বিনিময়যোগ্য নয়’, এমন স্মারক নোট আনুপাতিক হারে কম থাকে, বিনিময়যোগ্য স্মারক নোটেরই প্রচলন বেশি দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে বিগত সরকার ঘটিয়েছে এক বিরল ঘটনা। একই সঙ্গে অল্প সময়ের (২০১১-২৪) মধ্যে ১৩টি স্মারক নোট বাজারে ছেড়েছিল তারা। অন্যান্য নোটের মতোই ‘সিকিউরিটি থ্রেড’, জলছাপসহ কাগুজে টাকার সব বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের স্মারক নোটেও দেখা যায়।
২৫ টাকার নোট
‘সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস (বাংলাদেশ) লিমিটেড’-এর রজতজয়ন্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালে ২৫ টাকা মূল্যমানের স্মারক নোট অবমুক্ত করে। নোটটির এক পাশে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, প্রচলিত টাকা ও ডাকটিকিটের ছবি দেখা যায়; যেগুলো এই প্রেস থেকে মুদ্রিত হয়েছিল। অপর পাশে বাংলাদেশের পতাকাসহ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস বিল্ডিং উঠে আসে। তবে গভর্নর আতিউর রহমানের স্বাক্ষর করা ২৫ টাকার স্মারক নোটটি বিনিময়যোগ্য নয়।
৪০ টাকার নোট
বাংলাদেশের বিজয়ের ৪০ বছর পূর্তিতে অবমুক্ত করা হয় ৪০ টাকার স্মারক নোট। নোটটির এক পাশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ও স্মৃতিসৌধ এবং অপর পাশে অস্ত্র হাতে বিজয় উল্লাস করা মুক্তিযোদ্ধাদের দেখা যায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত গভর্নর আতিউর রহমানের স্বাক্ষর করা এ স্মারক নোটটিও বিনিময়যোগ্য নয়, তবে নোটটির কোথাও সে কথা উল্লেখ করা হয়নি। তাই সাধারণ মানুষ নোটটি অন্যান্য প্রচলিত মুদ্রার মতো বিনিময় করতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হলে বাংলাদেশ ব্যাংক পরে নোটটিকে ‘বিনিময়যোগ্য নয়’ বলে ঘোষণা করে।
৫০ টাকার পাঁচটি স্মারক নোট
বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত ৫০ টাকার পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন স্মারক নোট প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে চারটি নোটই বিনিময়যোগ্য নয়। ২০২১ সালের ২৮ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৫০ টাকা মূল্যমানের বিনিময়যোগ্য নোটের পাশাপাশি আরেকটি স্মারক নোট অবমুক্ত করা হয়, যার কোনো বাজারমূল্য নেই। ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের সুবর্ণজয়ন্তীতে আরও একটি ৫০ টাকা সমমূল্যের স্মারক নোট প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ১০ দিন পরই মেট্রোরেলের উদ্বোধন উপলক্ষে বিনিময়যোগ্য নয়, এমন আরেকটি ৫০ টাকার একটি স্মারক নোট অবমুক্ত করা হয়। ৫০ টাকা মূল্যমানের শেষ স্মারক নোটটি বাংলাদেশ ব্যাংক অবমুক্ত করে ২৯ অক্টোবর ২০২৩ সালে কর্ণফুলি টানেল উদ্বোধন উপলক্ষে।
৬০ টাকার নোট
ভাষা আন্দোলনের ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১২ সালে অবমুক্ত করে ৬০ টাকা মূল্যের স্মারক নোট। গভর্নর আতিউর রহমানের স্বাক্ষর করা এ নোটটি বিনিময়যোগ্য নয়। নোটটির এক পাশে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও অপর পাশে ভাষাশহীদদের প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে।
৭০ টাকার নোট
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হবে, একই বছর বাংলাদেশ উদ্যাপন করবে স্বাধীনতার ৭০ বছর। সেই লক্ষ্যে আগে থেকেই প্রকাশ করে রাখা হয়েছে ৭০ টাকার নোট। ২০১৮ সালে অবমুক্ত হয় গভর্নর ফজলে কবিরের স্বাক্ষর করা নোটটি।
১০০ টাকার তিনটি স্মারক নোট
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক তিনটি ১০০ টাকা সমমূল্যের স্মারক নোট অবমুক্ত করেছে। প্রথমটি ২০১৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরের শতবর্ষ উপলক্ষে। নোটটির এক পাশে জাদুঘরে সংরক্ষিত ১৮ শতকের অশ্বারোহীর প্রতিকৃতি-সংবলিত একটি টেরাকোটা, অপর পাশে জাতীয় জাদুঘর ভবন। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে ১০০ টাকা মূল্যমানের একটি নোট অবমুক্ত করা হয় ২০২০ সালের ১৮ মার্চ এবং ১০০ টাকা মূল্যমানের শেষ স্মারক নোটটি ২০২২ সালের ২৬ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে ছাড়া হয়। এসব নোটের কোনোটিই বিনিময়যোগ্য নয়।
বর্তমান বাজারে প্রচলিত নোটের ‘প্রিফিক্স’-এ বিভিন্ন অক্ষর (ক ক, ক খ, খ ক, চ ক, জ ল ইত্যাদি) দেখা যায়। কিন্তু বিনিময়যোগ্য নয়, এমন স্মারক নোটে ‘স জ’, ‘স প’ এবং ‘স ন’ এই ৩টি প্রিফিক্স ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ্বের যেসব দেশে রাজতন্ত্র কিংবা স্বৈরতন্ত্র জারি রয়েছে, সাধারণত ওই সব দেশের মুদ্রায় শাসকের প্রতিকৃতি দেখা যায়, বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তোমরা চাইলে স্মারক নোটগুলো টাকা জাদুঘরে গিয়ে দেখতে পারো।