চার
প্যারালাল ইউনিভার্স আবার কী?’ জিজ্ঞেস করলাম।
চারপাশে উদ্বিগ্ন দৃষ্টি বোলাল দীপন।
‘আস্তে!’ বাজখাঁই চিৎকার ছাড়ল। ‘কেউ শুনে ফেলবে তো!’
‘চেঁচাচ্ছ তো তুমি, কানের পোকা নাড়িয়ে দিচ্ছ,’ বললাম। ‘এই প্যারালাল ইউনিভার্স জিনিসটা আসলে কী, বলবে?’
‘এটা অনেকটা এ রকম,’ বলল দীপন। ‘আমাদের পৃথিবী তোমাদেরটার ঠিক পাশেই। এতটাই কাছে যে বললে তুমি বিশ্বাস করবে না। এটা এমনকি তোমাদের পৃথিবীর মতোই মহাশূন্যের একই জায়গার খানিকটা অংশ দখল করে আছে। তোমরা শুধু আমাদের দেখতে পাও না আরকি। কেবল উদ্বোধনী দিনগুলো ছাড়া। যেমন আজকে।’
‘আজকে আবার কিসের উদ্বোধনী দিন?’ বললাম। ‘ক্রিকেট লিগ তো সেই কবেই উদ্বোধন হয়ে গেছে।’
ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়ল দীপন।
‘আরে বাবা, আমি অন্য উদ্বোধনী দিনের কথা বলছি,’ বলল। ‘এর সাথে ক্রিকেটের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি বলছি যখন তোমার আর আমার পৃথিবী একটা আরেকটার পাশে চলে আসে, সেদিনটার কথা। এটা সব সময় হয় না। আবার হয়তো অনেক বছর পর এমনটা ঘটবে।’
‘সূর্যগ্রহণের মতো?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘অনেকটা,’ বলল ও। ‘উদ্বোধনী দিনে, আমরা কিছু কিছু জিনিসের ভেতর দিয়ে দেখতে পারি, যেমন ধরো মেডিসিন ক্যাবিনেট। তখন আমরা তোমাদের পৃথিবীটা দেখতে পাই। ওটা অবশ্য কোনো দিক দিয়েই আমাদেরটার চেয়ে সুন্দর নয়।’
‘আমি কি বলেছি নাকি যে আমাদের পৃথিবী তোমাদের পৃথিবীর চেয়ে সুন্দর?’ বললাম। ‘বলিনি তো।’
‘বলোনি। কিন্তু আমি তো জানি, তুমি মনে মনে ঠিক এটাই ভাবছিলে,’ বলল ও। ‘তোমাদের যা আছে, তার সবই আমাদের এখানেও আছে। আমাদের পৃথিবী তোমাদেরটার মতোই সুন্দর। হয়তো আরও অনেক বেশিই সুন্দর।’
‘হয়েছে, হয়েছে!’ বললাম। এবার মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালাম। প্রথমবারের মতো, দীপনের বাথরুমে, সমান্তরাল জগৎটিকে ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেলাম।
হুম।
দেখতে প্রায় আমাদেরটার মতোই। শুধু একটু আলাদা। সিঙ্কটা কেমন বিদ্ঘুটে। দুটো কল ওটার। কিন্তু ও দুটোয় লেখা রয়েছে ‘ঠান্ডা’ আর ‘কম ঠান্ডা’। এবার টয়লেটের পাশে টয়লেট পেপারের রোল দেখলাম। জিনিসটা িসরিশ কাগজের মতো। মনে মনে বললাম, সমান্তরাল পৃথিবীতে আমার যেন বাথরুম না চাপে। ওহ্, কখন যে সটকাব এখান থেকে!
আরে, এত পানি কোত্থেকে এল? মেঝে পানিতে রীতিমতো সয়লাব। ঝরনাটির দিকে একপলক তাকাতেই কারণটা বুঝতে পারলাম। একটার বদলে ওখানে তিনটে ঝাঁঝরি।
‘তা তোমাদের আঢাকা আসলে কেমন?’ জবাব চাইলাম।
‘অসাধারণ,’ উত্তর পেলাম।
‘টিভি চ্যানেল কটা এখানে?’ প্রশ্ন আমার।
সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকাল ও।
‘তোমাদের কি একটার বেশি চ্যানেল নাকি?’ জিজ্ঞেস করল।
‘বাদ দাও,’ বললাম।
‘দেখো, মিয়া,’ বলল ও, ‘আমাদের ভিড়ের শহর তোমাদের ঢাকার সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা দিতে পারে, তা জানো? আমরা কোনো দিক দিয়েই তোমাদের চেয়ে কম নই।’
‘ও, তোমরা তার মানে আঢাকাকে ভিড়ের শহর বলো!’ বললাম। ‘আমরা যেমন ঢাকাকে বলি রিকশার শহর।’
‘আমাদের শহর অনেক বেশি সুন্দর,’ সগর্ব ঘোষণা করল ও।
‘হয়েছে, হয়েছে,’ ওকে শান্ত করতে চাইলাম। ‘মানলাম, তোমাদের পৃথিবী আমাদেরটার মতোই অপূর্ব সুন্দর, এবার হলো তো? এখন আমার রিটেইনারটা দেবে? তারপর, প্লিজ, আমাকে ফেরার রাস্তাটা বাতলে দাও।’
‘দীপন, কী রে, তোর গোছগাছ হলো?’ কণ্ঠটা অনেকটা আমার বাবার মতো।
‘হ্যাঁ, বাবা!’ পাল্টা গলা ছেড়ে বলল দীপন।
‘তাড়াতাড়ি কর! আটটায় উবার আসবে।’
অদ্ভুত দৃষ্টিতে দীপনের দিকে তাকালাম।
‘তুমি কি তোমার বাবার সাথে কোথাও যাচ্ছ নাকি?’ শুধালাম।
‘হ্যাঁ, উবারে করে টাভারে যাচ্ছি।’
হঠাৎই মাথাটা কেমন চক্কর মেরে উঠল আমার।
‘তোমরা কি আবাহনীর খেলা দেখতে যাচ্ছ?’ ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলাম।
‘না তো।’
‘যাক, বাবা, বাঁচলাম,’ স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললাম।
‘আমরা আগমনীর খেলা দেখতে যাচ্ছি। আমাদের ক্লাব এবার লিগ টেবিলের এক নম্বরে আছে। তোমাদের আবাহনীর সাথে আমরা যেকোনো সময় টক্কর দিতে পারি, তা জানো?’
‘হায়, খোদা,’ মৃদুস্বরে আওড়ালাম। ‘তোমার জীবন দেখি ঠিক আমার মতোই, অল্প একটু তফাত শুধু, তা–ই না?’
‘তা–ই তো,’ সহজকণ্ঠে বলল ও। ‘সমান্তরাল জগতে তো এমনটাই হওয়ার কথা, পিপন।’ ওর কথা বলার ভঙ্গি শুনে মনে হলো, যেন ছোট কোনো বাচ্চাকে জ্ঞান দিচ্ছে। পিত্তি জ্বলে গেলেও নিজেকে সামলে নিলাম। ‘তুমি সত্যিটা জানতে চাও? আমি আসলে নকল পৃথিবীতে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে গেছি। হাজার হলেও, আমাদেরটা তো আর আসল নয়, আসল হচ্ছে তোমাদেরটা।’
‘তাই? কিন্তু এইমাত্র না বললে...।’
‘কী বলেছি, ভুলে যাও। আমি হয়তো প্যারালাল ইউনিভার্সে থাকি, কিন্তু তাই বলে তো আর হাঁদারাম নই। আগমনীর চেয়ে মাঠে বসে আবাহনীর খেলা দেখতে পারলে আমার অনেক বেশি ভালো লাগত।’
‘দীপন, আমি তোর কথা শুনতে পাচ্ছি না!’ হেঁকে বললেন ওর বাবা। ‘তুই কি আমাকে কিছু বলছিস?’
‘না, বাবা, একা একাই কথা বলছি!’ পাল্টা গলা ছাড়ল ও। এবার আমার দিকে ফিরে বলল, ‘অ্যাই, আমার মাথায় না একটা বুদ্ধি এসেছে। এসো, আমরা দুজন জায়গা পাল্টাপাল্টি করি। আমি তোমার বাবার সাথে আবাহনীর খেলা দেখতে যাব। আর তুমি যাবে আমার বাবার সাথে আগমনীর খেলা দেখতে।’
‘কক্ষনো না,’ সাফ জানিয়ে দিলাম।
‘আচ্ছা, থাক,’ বলল ও। ‘লাগবে না।’
‘তোর রিটেইনারটা নিয়েছিস তো?’ বললেন ওর বাবা। ‘আমরা কিন্তু রাতে ফিরছি না।’
‘তুমি কোনো চিন্তা কোরো না, বাবা!’ একরাশ উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেল দীপনের কণ্ঠে।
‘হায়, খোদা,’ অস্ফুটে বলে উঠলাম। ‘তুমিও রিটেইনার হারিয়েছ নাকি?’
‘হারালে কী হয়?’ খেপে উঠে পাল্টা বলল ও।
ছ্যাঁৎ করে উঠল আমার বুকের ভেতরটা।
‘দীপন,’ এ সময় ডাকলেন ওর বাবা। মনে হলো, তিনি দরজার ঠিক বাইরেই রয়েছেন, যেকোনো মুহূর্তে ঢুকে পড়বেন। ‘তুই আছিস ওখানে?’
দীপনকে ভয়ার্ত দেখাল।
‘বাবা যেন তোমাকে না দেখে,’ ফিসফিস করে বলল। ‘জলদি লুকাও!’
‘কোথায় লুকাব?’
‘এখানে।’
ও আমাকে বাথটাবের কাছে নিয়ে গেল। তারপর খড়খড়ি টেনে নামিয়ে আমাকে ঠেলে দিল ভেতরে। আমি ওকে মেডিসিন ক্যাবিনেটটা খুলতে আর বন্ধ করতে শুনলাম। তারপর সব সুনসান। ও গেল কোথায়?
হাতঘড়ি দেখলাম। উবার আসতে আর মাত্র ৩০ মিনিট বাকি। সমান্তরাল জগতের বাথটাবে লুকিয়ে থেকে আমি করছিটা কী? আর নিজের ভুবনে আমি ফিরবই বা কীভাবে?
খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে পিটপিট করে উঁকি মেরে তাকালাম। দীপনের টিকিটিও দেখলাম না। এবার হঠাৎই কারণটা বুঝে গেলাম।
ছুঁচোটা মেডিসিন ক্যাবিনেটের দরজা গলে আমার পৃথিবীতে গিয়ে সেঁধিয়েছে!
পাঁচ
আতঙ্কে জমে গেলাম।
ঠিক এ মুহূর্তে, দীপন ভান করছে ও আসলে আমি। আমার বাবার সঙ্গে সাভারে খেলা দেখতে যাওয়ার মতলব আঁটছে।
এ সময় বাথরুমের দরজায় টোকা পড়ল।
‘দীপন, শুনতে পাচ্ছিস? তুই রেডি?’ বলে উঠল ওর বাবার কণ্ঠ।
সভয়ে শ্বাস চাপলাম। সেরেছে!
দরজাটা খুলে গেল। দীপনের বাবা বাথরুমে ঢুকলেন। আর ঠিক সে মুহূর্তে, হাঁচি দিলাম আমি।
‘হ্যাঁচ্চো!’
‘কী রে, দীপন, তুই গোসল করছিস নাকি?’
‘না,’ বললাম।
খড়খড়িগুলো ওপরে তোলা। যে ভদ্রলোক ওখানে দাঁড়িয়ে, তিনি দেখতে অবিকল আমার বাবার মতো।
প্রথমটায় ভেবেছিলাম উনি বুঝি রেগে আগুন হয়ে যাবেন। কিন্তু তার বদলে ভদ্রলোক শব্দ করে হাসতে লাগলেন।
‘কাপড় পরে তুই শাওয়ারে কী করছিস রে?’ প্রশ্ন করলেন।
‘বিশ্রাম নিচ্ছি,’ জানালাম।
‘এখন বিশ্রামের সময় নয়। আধঘণ্টার মধ্যেই উবার আসছে। তোর রিটেইনারটা নিয়েছিস তো? সবকিছু ঠিকঠাকমতো গোছগাছ করেছিস?’
‘একদম,’ বললাম।
তিনি অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন।
‘তোকে আজ একটু অন্য রকম দেখাচ্ছে। চুলের স্টাইলটা কি নতুন নাকি?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ।’
‘ঠিক আছে। আমার কিছু কাজ বাকি আছে। তুই এক কাজ কর, এক দৌড়ে ড্রাই ক্লিনার্স থেকে আমাদের কাপড়চোপড়গুলো নিয়ে আয়।’
ড্রাই ক্লিনার্স! আমি তো কোনো ড্রাই ক্লিনার্সে যেতে চাই না, শুধু মেডিসিন ক্যাবিনেটটা দিয়ে ঘরে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু সে কথা তো আর ওঁকে বলা যায় না!
‘আ-আচ্ছা,’ কোনোমতে বললাম। ‘কোন ক্লিনার্সটা যেন?’
‘ওই যে, তুই তো চিনিসই। রাস্তার ও মাথারটা।’
‘কোন রাস্তা?’
উনি আমার দিকে চেয়ে একটা ভ্রু তুললেন।
‘কী শুরু করলি!’ বললেন তিনি। ‘এতবার গেছিস ওখানে! তাড়াতাড়ি যা। হাতে সময় নেই।’
‘যাচ্ছি,’ বললাম।
তিনি আমাকে একটা রসিদ আর একখানা ১০০০ টাকার নোট গছিয়ে দিলেন। তারপর বাথরুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
১০০০ টাকার নোটটা দেখতে ভারি অদ্ভুত। ইয়া বড়। কাছ থেকে খুঁটিয়ে লক্ষ করার পর দেখলাম, ওটার ওপর দিকে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ লেখা রয়েছে। তবে নোটের ছবিটা চিনলাম না, আগে কখনো দেখিনি। একমাথা ঝাঁকড়া চুল আর দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল নিয়ে এক লোকের ছবি, নাকের ডগায় নেমে আসা চশমার ওপর দিয়ে জুলজুল করে চেয়ে রয়েছে।
অ্যাপার্টমেন্টটি থেকে বেরিয়ে, এলিভেটরে চেপে নিচে নামলাম। তারপর বাইরে বেরিয়ে এলাম। যথাসম্ভব দ্রুত ক্লিনার্সের ওখানে যাওয়া-আসার কাজটা সারতে চাই আমি।
কোনায় পৌঁছে, গাড়িগুলোর থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলাম। অনন্তকাল ধরে চলছে যেন ওগুলো। এবার ট্রাফিক সিগন্যালের দিকে চোখ তুলে চাইতেই কারণটা বুঝতে পারলাম। লাল-হলুদ-সবুজ বাতির বদলে ওখানে চারটে বাতি।
বাতিগুলো বলছে, ‘থামুন’, ‘এখনই নয়’, ‘অপেক্ষা করুন’ এবং ‘এবার যান’।