বিটকেলে বুট
মায়ামাঠে ছুটছে বিটু। দূর থেকেই ভেসে আসছে মানুষের হইচই। মায়ামাঠ আজ লোকে লোকারণ্য। ভিড় ঠেলে করিম ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল বিটু। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘আমাকে আজ খেলায় নিতেই হবে। না করতে পারবেন না। বুট ছিল না বলে এত দিন খেলায় নেননি। এই দেখেন, আমি বুট পরে এসেছি।’
বিটুর বুটের দিকে তাকালেন করিম ভাই। তাকিয়েই কপাল কুঁচকে ফেললেন। অবাক হয়ে বিটুর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কোত্থেকে কিনেছ?’
‘কিনিনি। পাড়াতো মামার বুট। ধার এনেছি। খেলা শেষে আবার ফেরত দিয়ে আসব।’
আগের দুটো ভাঁজের সঙ্গে কপালে এবার আরও দুটো ভাঁজ যোগ করে করিম ভাই বললেন, ‘কিন্তু তোমার পায়ের থেকে তো বুটের সাইজ অনেক বড়। পায়ে আঁটালে কীভাবে? অসুবিধা হচ্ছে না?’
মুচকি হাসি দিয়ে বিটু বলল, ‘প্রথমে কিছুটা অসুবিধা হয়েছিল। ব্যবস্থা করে নিয়েছি।’
‘কী ধরনের ব্যবস্থা?’
জবাবটা আর শুনতে পারেননি করিম ভাই। খেলা শুরু হওয়ার বাঁশি বেজে গেছে। বাঁশি শুনেই দল নিয়ে মাঠে ঢুকে পড়লেন। দলের সঙ্গে বিটুও ঢুকে পড়ল মাঠে।
শুরু হয়ে গেল খেলা। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। করিম একাদশ বনাম রহিম একাদশ। তবে করিম একাদশের বারোজন খেলোয়াড় যে মাঠ দাবড়ে বেড়াচ্ছে, এটা কিন্তু কেউ খেয়ালই করল না। এমনকি রেফারিও নয়।
বিটুকে মাঠের ভেতরে দেখে চমকে গেলেন করিম ভাই। বিটুর কাছে ছুটে এসে জানতে চাইলেন, ‘মাঠে কী করছিস?’
বিটু বুঝল করিম ভাই ভীষণ খেপেছেন। খেপে গেলে তুই–তোকারি করেন।
জবাব দিল বিটু, ‘খেলছি।’
‘খেলছি মানে? তুই তো একাদশে নেই। মাঠে নেমেছিস কেন?’
‘এত কষ্ট করে বুট জোগাড় করেছি কি মাঠের বাইরে থাকার জন্য?’
চোখ দুটো লাল করে বিটুর দিকে তাকালেন করিম ভাই। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, ‘শিগগির মাঠ থেকে বেরিয়ে যা বলছি!’
কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বিটু বুট পায়ে মাঠে নামেনি। বলল, ‘আপনি আমাকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে বলার কে? ওটা রেফারির কাজ। তা ছাড়া ওদের এগারোজনের বিপক্ষে আমরা বারোজন। বিষয়টা...’
গর্জে উঠলেন করিম ভাই, ‘মাঠ থেকে বেরোবি? নাকি রেফারিকে জানাব?’
বলেই রেফারির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ডান হাত উঁচু করলেন।
বিটু ফিসফিস করে বলল, ‘আমার কিছু হবে না। আপনি দলের ক্যাপ্টেন; আপনিই ঝামেলায় পড়বেন।’
সঙ্গে সঙ্গে হাত নামিয়ে ফেললেন করিম ভাই। চাপা রাগে গজগজ করে বললেন, ‘আমাকে হুমকি দিচ্ছিস? মাঠে আছিস দেখে কিছু বললাম না। তোকে আমি দেখে নেব, মনে রাখিস!’
করিম ভাইয়ের হুমকিকে পাত্তাই দিল না বিটু। বলের খোঁজে এদিক–ওদিক তাকাল। আর তখনই বলটা ওর বুটের দিকেই এগিয়ে এল। বল পেয়েই আর দেরি করল না বিটু, ছুট দিল রহিম একাদশের গোলপোস্টের দিকে। বুটশটে গোল দিয়ে দেখিয়ে দেবে। কিন্তু বিটুকে বাধা দিল রহিম একাদশের ডিফেন্সে থাকা জসিম।
চোখের সামনে জসিমকে দেখে বিটুর পুরোনো পায়ের ব্যথা চাঙা দিয়ে উঠল। জসিমের পা অসম্ভব শক্তপোক্ত। তার সামনে পড়লে সবাই পা বাঁচিয়ে খেলার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হলে আর রক্ষা নেই। পায়ের পাতার চামড়াসহ হাড়ও যেন থেঁতলে যায়। একবার তো জসিমের পায়ের ঠোকা খেয়ে টানা দুই মাস মাঠেই নামতে পারেনি বিটু।
পুরোনো কৌশল কাজে লাগাতে চাইল জসিম। বিটুর পায়ে দড়াম করে লাথি কষাল। কিন্তু বিটু ওই লাথি এড়িয়ে জসিমকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল শাঁই শাঁই করে। দর্শকসারি থেকে উল্লাসধ্বনি ভেসে এল, ‘শাবাশ, বিটু! শাবাশ!’
দর্শকসারির উল্লাসধ্বনি বিটুর বুটে তুমুল শক্তি জোগাল। ওর সামনে গোলপোস্ট আগলে দাঁড়িয়ে আছে কেবল গোলকিপার। ডান বুটে তুমুল একটা শট হাঁকাল রহিম একাদশের গোলপোস্টে। আর তখনই ঘটে গেল ঘটনা।
বলটা সোজা ঢুকে পড়ল গোলপোস্টের ভেতরে। আর বিটুর ডান পায়ের বুট রকেটের গতিতে উড়াল দিল আকাশে।
অবাক করা ব্যাপার হলো, বলটা যে কোথায় গেল, সেটা কেউ খেয়াল করল না। এমনকি রেফারিও গোলের বাঁশি বাজাতে ভুলে গেলেন। সবার চোখ বুটের দিকে।
বুটটা তখন ওপরে উঠতে উঠতে আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা করছিল এবং কুচকাওয়াজে অংশ নেওয়া বিমানের মতো ডিগবাজিও দিতে লাগল। ডিগবাজির সঙ্গে বুটের ভেতর থেকে বেরোতে লাগল দুমড়ানো–মোচড়ানো কাগজ। কাগজগুলো আবার প্যারাট্রুপারের মতো ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগল।
বুটের ভেতরে কাগজ এল কোত্থেকে! সবাই অবাক হলেও কিছু বুঝতে পারেনি। বুঝতে পেরেছেন একমাত্র করিম ভাই। পায়ের চেয়ে বুটের সাইজ বড় হওয়ায় দলা দলা কাগজ ঢুকিয়ে নিয়েছিল বিটু।
কিছুক্ষণ পর বুটের ওপরে ওঠার দম ফুরিয়ে গেল। বুটটা এবার নিচে নামতে শুরু করল। যেন মহাশূন্য ভ্রমণ শেষে পৃথিবীতে ফিরে আসছে কোনো মহাকাশযান। কিন্তু সমস্যাটা হলো ল্যান্ডিং করতে গিয়ে। বুটের ভেতরে থাকা কাগজগুলো নিরাপদে ভূমিতে অবতরণ করলেও বুটটা যেন রানওয়ে খুঁজে পাচ্ছে না। কিংবা এই রানওয়ে বুটটার পছন্দ হয়নি। তাই মাঠের ঠিক পাশেই ডালপালা মেলে থাকা বিশাল এক আমগাছের ডালে ঝুলে পড়ল ফাঁসির আসামির মতো। মানে বুটের ফিতে আটকে গেল গাছের ডালে। আর ফিতের সঙ্গে ঝুলে রইল আস্ত একটা বুট। মাঠের তেইশজন খেলোয়াড় আর রেফারির চব্বিশ জোড়া চোখ আটকে রইল বুটে। আমগাছের কাছাকাছি থাকা দর্শকেরা হই হই করে উঠল। তবে এই হই হই গোলের জন্য নাকি বুটের জন্য, ঠিক বোঝা গেল না।
বাঁ পায়ের বুট খুলে চটপট গাছে উঠে পড়ল বিটু। কিন্তু বুটের আত্মাহুতি দেওয়ার ডালটার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারল না। মোটা একটা ডালের মাথায় গজানো আরেকটা চিকন ডালে আটকে আছে বিটুর বুট। মোটা ডালটাকে ঝাঁকি দিতে লাগল বিটু।
একটু পর কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওরে, জলদি গাছ থেকে বুটটা নামিয়ে আন!’
বললেই হলো বুটটা নামিয়ে আন? কে নামিয়ে আনবে? বুট নামিয়ে আনার ব্যাপারে কারও বিন্দুমাত্র উত্সাহ দেখা গেল না। এমন একটা ডালে আটকেছে, নিচ থেকে তো নয়ই, গাছে উঠেও ওখান থেকে বুটের নাগাল পাওয়া সহজ নয়। তবে লম্বা বাঁশ থাকলে চেষ্টা করা যায়। লম্বা বাঁশের খোঁজে এদিক–ওদিক তাকাল কয়েকজন। যেন আশপাশে তাকালেই বাঁশের দেখা মিলবে! কিন্তু আশপাশে কোথাও বাঁশ তো পরের কথা, বাঁশের কঞ্চিরও দেখা মিলল না।
নিজের বুট হলে বিটু কী করত কে জানে। কিন্তু ধারে আনা বুটকে গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে যাওয়া অসম্ভব। বিটুর মা পইপই করে বলেছিলেন, ‘অন্যের জিনিস ধার করে পরতে নেই।’
বিটু আপত্তি জানিয়েছিল, ‘মামা কি পর?’
মা বলেছিলেন, ‘নিজের বুট ছাড়া...’
বাকিটা আর শোনেনি বিটু। এখন মনে হচ্ছে, শুনলেই ভালো হতো।
বাঁ পায়ের বুট খুলে চটপট গাছে উঠে পড়ল বিটু। কিন্তু বুটের আত্মাহুতি দেওয়ার ডালটার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারল না। মোটা একটা ডালের মাথায় গজানো আরেকটা চিকন ডালে আটকে আছে বিটুর বুট। মোটা ডালটাকে ঝাঁকি দিতে লাগল বিটু। কিন্তু সেই ঝাঁকিতে মোটা ডালটা ঝাঁকি খাওয়া তো পরের কথা, কাঁপলও না। তবে গাছে যে ঝাঁকি দেওয়া হচ্ছে, সেটা টের পেল অন্য কেউ। আর টের পেয়েই ক্বা ক্বা স্বরে হাঁকডাক শুরু করে দিল ওরা। এর মধ্যেই কয়েকটা কাক বিটুর মাথায় ঠোকর দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। কোনোরকমে দুহাত চালিয়ে মাথা বাঁচাল বিটু। শেষে কাকের আক্রমণে নাস্তানাবুদ হয়ে নেমে এল গাছ থেকে।
এগিয়ে এলেন করিম ভাই। হাতে ফুটবল। হঠাৎ বলটা একটু শূন্যে তুলে বুট আটকে থাকা ডাল লক্ষ্য করে কিক মারলেন। কিন্তু একটুর জন্য ব্যর্থ হলেন। বুটকে পাশ কাটিয়ে বলটা কিছুটা ওপরে ওঠার পর নিচে নামতে লাগল। কিন্তু এ কী! নিচে নামতে গিয়ে বলটা এবার গাছের একটা তিন ডালের মোহনায় আটকে গেল।
তিন ডালের ওই মোহনায় বাসা বেঁধেছে তিন জোড়া কাক। তিনটা কাক তখন বাসায় বসে ডিমে তা দিচ্ছিল। একটু আগে গাছের ঝাঁকিতে কাকগুলো এমনিতেই রেগে ছিল। এবার তাতে ব্যাঘাত ঘটায় ওরা রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। তারস্বরে ক্বা ক্বা করতে লাগল আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে। তাদের ক্বা ক্বা শুনে আশপাশ থেকে কয়েকটা কাক ছুটে এল। তারপর আরও। এবং আরও...
এত কাক কোত্থেকে এল, কে জানে। কালো কালো কাকে ছেয়ে গেল পুরো মায়ামাঠ। শুধু তা–ই নয়, কাকদের সঙ্গে যোগ দিল বেশ কিছু ফিঙে। ফিঙেরা বরাবরই কাকদের বিরুদ্ধে থাকে। কিন্তু সেবারই প্রথম সবাই অবাক হয়ে দেখল, ফিঙেরা কাকেদের পক্ষ নিয়েছে। কাক আর ফিঙেদের এমন রুদ্র মূর্তি ওখানকার মানুষ আগে কখনো দেখেনি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাক আর ফিঙেদের যৌথ আক্রমণে ফাঁকা হয়ে গেল মায়ামাঠ। সেদিন তো নয়ই, পরদিনও কেউই মায়ামাঠে ফুটবল খেলতে পারল না।
এমনকি তার পরের দিনও নয়।
তার পর থেকে ওই মাঠে আর ফুটবল খেলা হয়নি। আশপাশ থেকে মাইগ্রেট করে অনেক কাক এসে আস্তানা গাড়ল আমগাছে। এত দিন আমগাছের আংশিক ছিল তাদের দখলে। এবার তারা পুরো আমগাছটাই দখলে নিয়ে নিল। একটা বিটকেলে বুটের কারণে শিকেয় উঠল মায়ামাঠের ফুটবল।
কিন্তু ঘটনাটা আমগাছের পুরো দখল পর্যন্ত এসেও থেমে থাকেনি। কাকেরা বিটুকে ভীষণভাবে মনে রেখেছে। বিটু রাস্তায় বেরোলেই কাকেরা কীভাবে যেন জেনে যায়। চোখের পলকে ছুটে এসে বিটুকে ধাওয়া করে। বিটুর স্বাভাবিক জীবনটাকে অস্বাভাবিক করে তুলল কাকেরা। ওকে একেবারে ঘরবন্দী করে ফেলল।
একটা বিটকেলে বুট কাউকে ঘরবন্দী করে রাখতে পারে, বিশ্বাস হয়? হয় না। কিন্তু এটাই ঘটেছিল।