চুইংগাম চিবালে মস্তিষ্কের উপকার না ক্ষতি

চুইংগাম চিবালে আপনার মস্তিষ্ক বিপদ বা স্নায়ুচাপের কথা ভুলে যায়ছবি: পেক্সেলস

গত পাঁচ বছরে চুইংগামের ব্যবসায় বড়সড় একটা ভাটা পড়েছে। করোনার সময় চুইংগাম বিক্রি আগের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমে গিয়েছিল। বেশ কিছু পরিচিত কোম্পানি তখন বন্ধও হয়ে যায়। এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে চুইংগাম কোম্পানিগুলো কী করছে? তারা জোরেশোরে প্রচারণায় নেমেছে। কোম্পানিগুলো তাদের পুরোনো মার্কেটিং কৌশলে ফিরে যাচ্ছে। তারা বোঝাতে চাইছে, চুইংগাম শুধু মুখ সতেজ রাখে না। চুইংগাম মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে। কিন্তু বিজ্ঞাপনের এসব কথার পেছনে আসলে কতটা সত্যতা আছে?

পুরোনো সেই দিন

আট হাজার বছর আগেও মানুষ বিশেষ একধরনের চুইংগাম চাবাত। সেই গাম আসলে ছিল বার্চগাছের কষ বা আঠা। তখন এই আঠা চিবিয়ে মানুষ যন্ত্রপাতি জোড়া লাগানোর কাজ করত। তবে স্রেফ মজার জন্যও মানুষ গাছের আঠা চাবাত। এমনকি পাঁচ বছরের শিশুদের জীবাশ্ম হওয়া দাঁতেও আঠা চিবানোর দাগ পাওয়া গেছে। এটা শুধু কোনো একটি অঞ্চলের ঘটনা নয়। প্রাচীন গ্রিস, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, মায়া সভ্যতা থেকে শুরু করে আমেরিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল গাছের আঠা চাবানোর এই অভ্যাস।

আজকের দিনে আমরা যে চুইংগাম দেখি, সেটার ইতিহাস শুরু হয় ১৮৫০ সালের দিকে। নির্বাসিত এক মেক্সিকান রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ‘চিকল’ (একধরনের গাছের আঠা) পান নিউইয়র্কের টমাস অ্যাডামস। প্রথমে এই চিকল দিয়ে তিনি রাবারের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু রাবার বানাতে গিয়ে তিনি বানিয়ে ফেলেন চুইংগাম। এরপর চুইংগামকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে আসল অবদান রাখেন উইলিয়াম রিগলি নামের এক ব্যবসায়ী।

আরও পড়ুন

১৮৯০ সালের দিকে উইলিয়াম রিগলি সাবান আর বেকিং সোডা বিক্রি করতেন। জিনিসপত্রের সঙ্গে তিনি বিনা মূল্যে চুইংগাম উপহার দিতেন। খুব শিগগিরই তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর দেওয়া এই উপহার মানুষ খুব পছন্দ করছে। চুইংগামের চাহিদা দেখে রিগলি নিজের ব্যবসাতেই পুরোপুরি বদল আনেন। বাকি সব বাদ দিয়ে তিনি শুধু চুইংগাম বিক্রির দিকেই ঝুঁকে পড়েন।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় চুইংগাম কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা, উইলিয়াম রিগলি। পাশেই দেখা যাচ্ছে তাঁর কোম্পানির পুরোনো একটি বিজ্ঞাপনের পোস্টার
সূত্র: এক্স ডট কম

হাঁকডাকে চুইংগাম

উইলিয়াম রিগলি বিশ্বাস করতেন, চুইংগাম একবার সাধারণ মানুষের হাতে গেলেই হলো। গাম সবাই পছন্দ করবেই। তাই তিনি চুইংগামের ব্যাপক প্রচারণায় মেতে ওঠেন। আটলান্টিক সিটির মাইলের পর মাইল রাস্তায় তিনি চুইংগাম বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড লাগান। সে যুগে ফোনবুক বলতে একটা জিনিস ছিল। ওই বইয়ে মানুষের নাম, ফোন নম্বর আর ঠিকানা লেখা থাকত। যুক্তরাষ্ট্রের ফোনবুকে থাকা সব ঠিকানায় চুইংগাম পাঠানোর ব্যবস্থাও করেন রিগলি!

যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মহামন্দা চলছিল তখন উইলিয়াম রিগলি একটা ব্যাপার খেয়াল করেন। তিনি দেখেন, মানুষ দুশ্চিন্তায় থাকলে তাদের চিবানোর প্রবণতা বেড়ে যায়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি চুইংগামের নতুন বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করেন। বিজ্ঞাপনে বলা হয়, চুইংগাম চাবালে মানুষের মানসিক চাপ কমে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকেও প্রভাবিত করেছিলেন রিগলি। তিনি সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হন যে চুইংগাম চিবালে সেনাদের লাভ হবে। গাম খেলে খিদে কম পাবে, মুখ সতেজ থাকবে আর মাথা পরিষ্কার থাকবে সেনাদের। ব্যস, এরপর সেনাদের রেশনেও জায়গা করে নেয় চুইংগাম।

আমেরিকার অন্যতম বিখ্যাত একটি অফিস টাওয়ার হলো এই ‘রিগলি বিল্ডিং’। চুইংগাম ব্যবসার সফলতার এক বিশাল প্রতীক হিসেবে ভবনটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে
সূত্র: ড্রিমসটাইম

অবশ্য সবাই চুইংগামকে ভালোভাবে নেয়নি। তখনো মানুষ চুইংগাম খেয়ে রাস্তায় ফেলে রাখত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নিউইয়র্কের তৎকালীন মেয়র, ফিওরেল্লো লা গার্দিয়া অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। তিনি চুইংগাম কোম্পানিগুলোকে অনুরোধ করেন চুইংগামের বর্জ্য অপসারণে সাহায্য করতে।

আরও পড়ুন

শুধুই কি ফাঁকা বুলি?

চুইংগাম চাবানো মানুষের ওপর ঠিক কেমন প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে অনেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হয়েছে। উইলিয়াম রিগলির কোম্পানি নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তাই তাদের নিজস্ব বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানও আছে। ২০০৬ সালে ‘রিগলি সায়েন্স ইনস্টিটিউট’ পিএইচডি গবেষণায় অর্থায়নও শুরু করে। তবে তাদের করা গবেষণায় পক্ষপাত আছে বলে অনেকেই সন্দেহ করে।

কার্ডিফ ইউনিভার্সিটির অ্যান্ড্রু স্মিথ আর নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটির ক্রিস্টাল হাসকেল-র‍্যামসে চুইংগাম নিয়ে স্বাধীনভাবে গবেষণা করেছেন। তাঁদের গবেষণার তথ্য দেখায়, চুইংগাম চাবালে স্মৃতিশক্তি বাড়ে না। আবার অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তার সময় গাম কোনো কাজেই আসে না। ধরো, কঠিন কোনো অসুখ বা বড় কোনো সমস্যা নিয়ে চিন্তায় আছ। তখন চুইংগাম চাবালে বিশেষ কোনো লাভ হয় না।

অ্যান্ড্রু স্মিথ আর ক্রিস্টাল হাসকেল-র‍্যামসের গবেষণা আরও বলছে, চুইংগাম মূলত মানুষের সতর্কতা বাড়িয়ে দেয়। চুইংগাম চাবানোর সময় মানুষের মনোযোগ প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একঘেয়ে কোনো কাজ করার সময় গাম চাবালে কাজে মনোনিবেশ করতে অনেক সুবিধা হয়। এ ছাড়া জীবনের ছোটখাটো সমস্যার চাপ কমাতেও এটি সাহায্য করে। এই ধরো, কাল তোমার অঙ্ক পরীক্ষা, তাই খুব ভয় পাচ্ছ। কিংবা তোমার কোথাও বক্তৃতা দিতে হবে ভেবে আতঙ্ক কাজ করছে। এসব সময় যদি তুমি চুইংগাম চাবাও, তাহলে তোমার মানসিক চাপ বেশ কিছুটা কমে আসবে।

রিগলির তৈরি চুইংগামের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় কয়েকটি নাম হলো অরবিট, এক্সট্রা ও একলিপস
সূত্র: ইউএসএ টুডে

বিজ্ঞান যা বলে

চুইংগাম চাবানো মানুষের ওপর অল্পবিস্তর প্রভাব ফেলে, তা তো বোঝাই গেল। কিন্তু এসব প্রভাবের পেছনে কারণ কী? এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশ তর্কবিতর্ক আছে। তবে বেশ কিছু যৌক্তিক তত্ত্বও পাওয়া গেছে।

বলা হয়, চুইংগাম চাবালে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। এই বাড়তি রক্ত মানুষকে আরও সতর্ক করে তোলে। আবার চাবানোর সঙ্গে মুখের পেশি নাড়ানোর একটা সম্পর্ক আছে। বারবার মুখমণ্ডল নাড়াচাড়া করলে মানুষের ঘোর কেটে যায়। তার ফলে যেকোনো একটি কাজে মন দেওয়া সহজ হয়। কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোন নিয়ে আরেকটি তত্ত্ব আছে। চাবানোর কাজটা মস্তিষ্ককে স্ট্রেস হরমোনে প্রতিক্রিয়া দেখাতে কিছুটা দেরি করিয়ে দেয়। তাই হয়তো গাম চাবালে মানুষের চাপ অল্প একটু কমে যায়। তবে গাম চিবানোর সময় কর্টিসল মেপে গবেষকেরা মিশ্র ফলাফল পেয়েছেন।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি হালে পানি পেয়েছে মানুষের উসখুস করার প্রবণতা নিয়ে দেওয়া একটি তত্ত্ব। বিবর্তনীয় বায়োমেকানিকস গবেষক অ্যাডাম ভ্যান কাস্টেরেন দেখিয়েছেন, মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মতো শুধু বেঁচে থাকার জন্যই চিবায় না। যেমন ধরো, শিম্পাঞ্জিরা দিনে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা কেবল খাবার চিবিয়েই কাটায়। অন্যদিকে রান্না করা শেখার পর মানুষ দিনে গড়ে মাত্র ৩৫ মিনিট খাবার চিবায়। তাই মানুষের কাছে এখন চিবানোর ব্যাপারটা অনেকটা খেলার মতো।

আরও পড়ুন

কোনো লাইনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হলে, তুমি কি পুরোটা সময় একদম সোজা হয়ে থাকতে পারবে? নিশ্চয়ই না। তুমি হয়তো হাত নাড়াবে কিংবা পা দোলাবে। হাতে কলম থাকলে সেটা খুলবে আর বন্ধ করবে। এসব কাজ বারবার করার মানে এই নয় যে মানুষ খুব অস্থির। বরং এ ধরনের খেলার মতো কাজগুলো মানুষের বেশ উপকারে আসে।

ক্যালিফোর্নিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, সান্তা ক্রুজের গবেষক, ক্যাথরিন ইজবিস্টার তাঁর গবেষণায় দারুণ এক তথ্য দিয়েছেন। এই যে মানুষ পা দোলানোর মতো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে, এগুলো আসলে মানুষকে সাহায্য করে। দীর্ঘক্ষণের কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে এমন বোকাটে খেলাগুলো বেশ কাজে দেয়। এগুলো পরোক্ষভাবে চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতেও সাহায্য করে। চুইংগাম চাবানোকেও ওই পা দোলানো বা কলম টেপার দলেই ফেলা যায়। অর্থাৎ একধরনের সহজাত প্রবণতা হিসেবেই গাম চাবানো মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

এখন তুমি চাইলে সময় পার করতে চুইংগাম খেতেই পারো। একঘেয়ে কোনো কাজে মন দিতেও চুইংগাম চাবাতে পারো। মনকে একটু অন্যদিকে ব্যস্ত রাখতেও এটা বেশ কাজে দেয়। কিন্তু চুইংগাম খাওয়ার আদবকায়দার কথা ভুললে চলবে না। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা আনুষ্ঠানিক জায়গায় চুইংগাম না খাওয়াই ভালো অভ্যাস। আর খাওয়া শেষে কী করতে হবে, তা তো নিশ্চয়ই জানো? যেখানে-সেখানে আঠালো চুইংগাম ফেলে দেওয়া যাবে না। একটা ময়লার ঝুড়ি খুঁজে, গামটা সেখানেই ফেলে আসতে হবে।

তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

আরও পড়ুন