শুধু হাঁটলেই কি প্রয়োজনীয় ব্যায়াম করা হয়ে যায়
সুস্থ থাকতে মানুষ কত কিছুই না করেন। কেউ সাঁতার কাটেন, কেউবা দৌড়ান। কিছু মানুষ তো রীতিমতো জিমে গিয়ে ঘাম ঝরান। এসব করা কি খুব জরুরি? অনেকেই ভারী ব্যায়াম করতে চান না, শুধু হাঁটেন। তাঁদের মধ্যে প্রচলিত আছে, ঘর থেকে বেরিয়ে একটু দ্রুতপায়ে হাঁটলে খুব সহজে শরীরচর্চা করা হয়ে যায়। এটা কতটুকু সত্যি?
অল্প দূরত্বে রিকশা না নিয়ে অনেকেই হাঁটেন। কাজে যাওয়ার সময় বা ফেরার সময় হাঁটার অভ্যাস আছে অনেকের। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই অনেকের দৈনন্দিন নড়াচড়ার বড় অংশ। প্রশ্ন হলো, এই হাঁটাই কি পুরো ব্যায়াম হতে পারে? মানে, আর কোনো ব্যায়াম না করে শুধু হাঁটলেই চলবে?
হাঁটার স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে দ্বিমত নেই। নিয়মিত হাঁটা রক্তচাপ ভালো রাখতে সাহায্য করে। মন ভালো রাখে। পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায় এবং হৃদ্রোগ ও ডিমেনশিয়ার আশঙ্কা কমাতে এর প্রভাব আছে। প্রায় সবার জন্যই হাঁটা উপকারী। শরীরকে কার্যক্ষম রাখতে হাঁটা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘ভালো শারীরিক কাজ’ ও ‘কার্যকর ব্যায়াম’—এই দুটির মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। নিউইয়র্ক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ব্যায়ামবিজ্ঞানী অ্যালেক্স রথস্টাইনের ভাষায়, ব্যায়াম মানে পরিকল্পিত ও পরিমাপযোগ্য এমন শারীরিক কার্যকলাপ করা, যা শরীরকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
তাহলে হাঁটা কি যথেষ্ট? উত্তরটা সবার জন্য এক নয়। হাঁটার গতি কতটা, কতক্ষণ হাঁটা হচ্ছে, বর্তমান ফিটনেস কেমন এবং হেঁটে কী লক্ষ্য অর্জন করতে চান, এসবের ওপর নির্ভর করে শুধু হাঁটলেই প্রয়োজনীয় ব্যায়াম হয়ে যাবে কি না।
অনেকে প্রতিদিন কত হাজার পা হাঁটলেন, সেটাকেই একমাত্র মাপকাঠি ধরে নেন। কিন্তু রথস্টাইন সতর্ক করেন, ১০ হাজার কদম কখনোই দিনের ‘লক্ষ্য’ হিসেবে ভাবা ঠিক নয়। কত কদম হাঁটলাম, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কত দ্রুত হাঁটছেন বা কত সময় ধরে হাঁটা হচ্ছে। আমেরিকান কলেজ অব স্পোর্টস মেডিসিনের পরামর্শ অনুযায়ী, সপ্তাহে প্রায় ১৫০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার ব্যায়ামের তুলনায় ৭৫ মিনিট বেশি তীব্র ব্যায়াম করা ভালো। যেমন আস্তে হাঁটার চেয়ে দ্রুত হাঁটা ভালো।
হাঁটার ক্ষেত্রে ‘মাঝারি তীব্রতা’ বলতে কী বোঝায়? ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের প্রতিরোধমূলক হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ আশীষ সারাজু বলেন, একজনের কাছে যা মাঝারি, অন্যজনের কাছে তা কঠিন বা সহজ হতে পারে। এটি বোঝার সহজ উপায় আছে। হাঁটার সময় যদি শ্বাস একটু দ্রুত হয়, মানে চেষ্টার মাত্রা যদি ১০–এর মধ্যে ৬ বা ৭ হয়, তাহলে সেটা মাঝারি তীব্রতা। আরেকটা উপায় হলো ‘টক টেস্ট’ বা কথা বলার পরীক্ষা। স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারলে হাঁটার তীব্রতা কম। কয়েকটা শব্দ বলা যায়, কিন্তু গান গাওয়া যায় না, তাহলে বুঝতে হবে মাঝারি হাঁটা চলছে।
হাঁটার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। হাঁটা হৃদ্যন্ত্রের ফিটনেস বাড়ায়, তবে দৌড়ানোর মতো দ্রুত বাড়ায় না। সবচেয়ে বড় কথা, হাঁটা পেশি গড়তে খুব একটা সাহায্য করে না। স্কোয়াট, লাঞ্জ বা ওজন তোলার মতো শক্তি খরচ করা ব্যায়ামের সঙ্গে এর তুলনা হয় না। সে কারণেই আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করার পরামর্শ দেয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাড়ের স্বাস্থ্য কেমন, সেটা বিবেচনায় নিতে হয়। শুধু হাঁটার চেয়ে রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং হাড়ের ক্ষয় রোধে বেশি কার্যকর। রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং হলো এমন ব্যায়াম, যেখানে পেশিগুলোকে বাইরের কোনো শক্তির বিপরীতে কাজ করতে হয়। যেমন ওজন তোলা। পাশাপাশি হাঁটার পর ভারসাম্য রক্ষার ব্যায়াম ও হালকা স্ট্রেচিং করলে শরীরের নড়াচড়া ঠিক থাকে, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কমে।
তাহলে হাঁটাকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়? উপায় অনেক। হাঁটার গতি বাড়ানো যেতে পারে। হাঁটাকে ছোট ছোট পর্বে ভাগ করা যেতে পারে। কিছু সময় ধীরে ও কিছু সময় দ্রুত হাঁটা যেতে পারে। প্রতিদিন একই সমতল রাস্তায় না হেঁটে কখনো উঁচু–নিচু পথে হাঁটা যেতে পারে। চ্যালেঞ্জ বাড়ানোর জন্য কেউ কেউ উল্টো দিকে ঢাল বেয়ে হাঁটার কথাও বলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে ভালো ব্যায়াম সেটা, যেটা নিয়মিত করা সম্ভব। প্রতিদিন একই পথে হাঁটলে একসময় সেটা আর কঠিন লাগে না। তবু হাঁটা বন্ধ করা যাবে না। ফিটনেস বাড়াতে চাইলে নিয়মে সামান্য পরিবর্তন আনা যায়। একই পথ একটু কম সময়ে শেষ করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস