কাজাখস্তানের সবচেয়ে বড় গর্ব হয়ে উঠেছেন যে রুশ তরুণী

গ্র্যান্ডস্লাম জয়ের আনন্দটা ঠিক কী রকম? রাফায়েল নাদাল তো আনন্দে শুয়ে পড়তেন কোর্টে। জোকোভিচ উইম্বল্ডন জিতে চিবিয়েছিলেন ঘাস। আনন্দে চিৎকার করা, লাফিয়ে ওঠা থেকে শুরু করে কত রকম আনন্দ করতে যে দেখা গেছে টেনিস কোর্টে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু কখনো কি দেখেছো, গ্র্যান্ডস্লাম জিতে শুধু হাত নেড়ে কোর্ট দেখে কাউকে বিদায় নিতে? কাজাখস্তানের ইয়েলেনা রিবাকিনা সেটাই করে দেখালেন। নিজের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডস্লাম জয়ের আনন্দ করলেন শুধু হাত নেড়ে!

বেশ কয়েক বছর ধরেই নারী টেনিসে একটা কথা বেশ জনপ্রিয়। এখনকার নারী টেনিস খেলোয়াড়েরা একদমই ধারাবাহিক নন। এই আজকে ভালো খেলছেন, গ্র্যান্ডস্লাম জিতছেন তো পরদিনই আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাঁকে। প্রতিবছরই নতুন নতুন নাম সামনে আসছে, তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন বটে কিন্তু টিকে থাকতে পারছেন না। ইয়েলেনা রিবাকিনাও ছিলেন সেই তালিকায়। ২০২২ সালে তাক লাগিয়ে জিতে নিয়েছিলেন উইম্বল্ডনের শিরোপা। এর পর থেকেই যেন তিনি হাওয়া। গত চার বছরে মাত্র একবার ফাইনাল খেলেছেন, একবার জিতেছেন ডব্লিউটিএ ফাইনালস। তবে এবার সবাইকে চমকে দিয়ে জিতে নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপা। সেটাও চার বছর পর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আরিনা সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে।

অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের জন্য রিবাকিনা অবশ্য ফেভারিটই ছিলেন। গত বছরের শুরুটা ভালো না হলেও বছরের শেষদিকে এসে নিংবো ওপেন ও ডব্লিউটিএ ফাইনালস জিতে বছরটা শেষ করেছিলেন হাসিমুখে। মজার ব্যাপার হলো ডব্লিউটিএ ফাইনালসেও তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন আরিনা সাবালেঙ্কা। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে সেই ফর্মটাই টেনে এনেছেন।

ফাইনাল পর্যন্ত এক সেটও হারেননি তিনি। ইগা সিওন্তেকের মতো খেলোয়াড়কে সরাসরি সেটে হারিয়েছেন কোয়ার্টার ফাইনালে। টাইব্রেকারে গিয়েছেন মাত্র একবার, সেটাও সেমি ফাইনালে। সব মিলিয়ে রিবাকিনা ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। কিন্তু প্রতিপক্ষ তো আরিনা সাবালেঙ্কা। গত কয়েক বছরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে এই তারকা।

আরও পড়ুন
রিবাকিনা-সাবালেঙ্কার দ্বৈরথ হয়ে উঠছে উপভোগ্য।
ছবি: এক্স

তবে চুপিসারে নারী টেনিসে যে রাইভালরিগুলো গড়ে উঠেছে, তার মধ্যে সবার ওপরে থাকবে সাবালেঙ্কা-রিবাকিনার নাম। ফাইনালের আগপর্যন্ত দুজন মুখোমুখি হয়েছেন ১৪ বার। মজার ব্যাপার হলো, টানা দুবার জিততে পারেন না কেউই। একবার সাবালেঙ্কা জেতেন, তো আরেকবার রিবাকিনা। কমবেশি সব রাইভালরিতেই একটা সময় আসে, যখন একজন ফর্ম কিংবা ফিটনেসে ছাড়িয়ে যান আরেকজনকে। রিবাকিনা-সাবালেঙ্কার ক্ষেত্রে সেটা দেখা যাচ্ছিল না। শেষবারের দেখায় সরাসরি সেটে জয় তুলে নিয়েছিলেন রিবাকিনা, যে কারণেই এবারের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে পাল্লাটা ঝুলে ছিল সাবালেঙ্কার দিকে। কিন্তু তিন বছর আগে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে দেখা হয়েছিল দুজনের। সেখানে জয়টা তুলে নিয়েছিলেন সাবালেঙ্কা। অন্তর্মুখী স্বভাবের রিবাকিনার মনে যে প্রতিশোধের একটা স্পৃহা ছিল, তা ফুটে উঠেছে ম্যাচে।

প্রথম সেট রিবাকিনা জিতে নেন ৬-৪ গেমে। পরের সেটেই খেলায় ফেরেন সাবালেঙ্কা। সেট জিতে নিলেন ৬-৪ গেমে। প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে সেট হারালেন রিবাকিনা। পরের সেটেও লিড নিয়েছিলেন সাবালেঙ্কাই। এগিয়ে গিয়েছিলেন ৩-০ গেমে। অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন তিন বছর আগের দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হবে বোধহয় এবারও। কিন্তু এরপরই রিবাকিনা ফিরলেন নিজের খেলায়। টানা ৫ গেম জিতে ম্যাচ নিয়ে এলেন নিজের আয়ত্তে। ৬-৪ গেমে জিতে সেট, ম্যাচ আর শিরোপা তিনটাই নিজের করে নিলেন তিনি।

আরও পড়ুন
শুধু হাত নেড়েই উদ্‌যাপন সেরেছেন রিবাকিনা।
ছবি: এক্স

এরপরই দেখা মিলল সেই অদ্ভুত দৃশ্যের। রিবাকিনার শেষ শটটি এইস হয়ে যখন পেরিয়ে গেল সাবালেঙ্কাকে, রিবাকিনা শুধু হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে একটু উদ্‌যাপন করলেন। এরপর হাত মেলালেন সাবালেঙ্কার সঙ্গে। এরপর হাত নেড়ে দর্শকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বসে পড়লেন নিজের সিটে। একটা সাধারণ ম্যাচ জিতলেও বোধহয় এর চেয়ে বেশি উদ্‌যাপন করেন খেলোয়াড়েরা। রিবাকিনা সেটাও করেননি। চুপচাপ স্বভাবের রিবাকিনা বরাবরই এরকম। ম্যাচ জিতে কিংবা শিরোপা জিতে তাঁর উদ্‌যাপনের থেকে চুপচাপ বসে থাকাতেই আনন্দ।

রিবাকিনার চুপচাপ স্বভাবের পেছনের গল্পটা বেশ করুণ। মস্কোতে জন্ম নেওয়া রিবাকিনা ছোটবেলা থেকেই পছন্দ করতেন জিমন্যাস্টিক আর আইস স্কেটিং। কিন্তু লম্বা হওয়ায় কোচেরা পরামর্শ দেন অন্য কোনো খেলা বেছে নিতে। রিবাকিনা বাবার পরামর্শে বেছে নেন টেনিস। নিজের স্বপ্নটা বাবা পূরণ করেছেন মেয়ের হাত ধরে। কিন্তু খেলা শুরু করলে কী হবে, কখনোই একা ট্রেনিং করার সুযোগ পাননি তিনি। সব সময়ই আটজন বা চারজনের গ্রুপে অনুশীলন করতে হতো তাঁকে। ভালো খেলার পরও তাঁর দিকে আলাদা করে সেভাবে নজর দিতেন না কোচেরা।

আরও পড়ুন

এর মধ্যেই তাঁকে নাগরিকত্ব পরিবর্তনের সুযোগ দেয় কাজাখাস্তান। ট্রেনিংয়ের সুব্যবস্থা থেকে শুরু করে বড় টুর্নামেন্টের এন্ট্রি ফি–রিবাকিনার জন্য সবকিছুই করেছে কাজাখ টেনিস ফেডারেশন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—যেন রিবাকিনার দেখাদেখি আরও কিছু খেলোয়াড় বেড়িয়ে আসে দেশ থেকে। রিবাকিনা হতাশ করেননি। প্রথম কাজাখ খেলোয়াড় হিসেবে জিতেছেন গ্র্যান্ডস্লাম। রাশিয়ায় জন্ম নিয়েও হয়ে উঠেছেন কাজাখস্তানের সবচেয়ে বড় গর্ব।

সেই খেলোয়াড় যদি একটু উদ্‌যাপন না করতে পারেন, তাতে ক্ষতি কী? চার বছর আগে উইম্বল্ডন জিতেও রিবাকিনার উদ্‌যাপন ছিল এরকমই শান্ত, পরিমিত। সেবার প্রেস কনফারেন্সে বলেছিলেন, ‘আমি আসলে উদ্‌যাপন করতে জানি না। যেদিন শিখব, সেদিন হয়তো আমার উদ্‌যাপন দেখে তাকিয়ে থাকবেন।’ চার বছর পর শিরোপা জিতলেও উদ্‌যাপনটা হয়তো এখনো শেখা হয়ে উঠেনি। শেখার খুব একটা দরকার আছে বলেও মনে হয় না। কারণ, যাঁর র‍্যাকেট কথা বলে, তাঁর উদ্‌যাপন না করলেও চলে।

আরও পড়ুন