ইসাককে নিয়ে কেন কাড়াকাড়ি
গত মৌসুমে ইংলিশ লিগের সারপ্রাইজ প্যাকেজের নাম ছিলেন অ্যালেকজেন্দার ইসাক। সারপ্রাইজ বললে অবশ্য ভুলই হবে, বেশ কয়েক বছর ধরেই তার নাম ঘুরপাক খাচ্ছে ফুটবল দুনিয়ায়। কিন্তু গত মৌসুমে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিলেন। প্রায় ৭ দশকেরও বেশি সময় ধরে ট্রফিশূন্য থাকা দলকে দিয়েছিলেন শিরোপার স্বাদ। লিভারপুলকে হারিয়ে কারাবাও কাপের শিরোপা উপহার দিয়েছেন নিউক্যাসল সমর্থকরা। ৭০ বছর ধরে যে দিনটার অপেক্ষায় ছিল নিউক্যাসলের ভক্তরা, ইংল্যান্ডের সেরা ক্লাবকে হারিয়ে সেটা নিশ্চিত করেছিলেন ইসাক। অ্যালেকজেন্দার ইসাক হয়ে উঠেছিলেন নিউক্যাসলের প্রিয় ‘অ্যালেকজেন্ডার দ্য গ্রেট’!
কিন্তু সেই গ্রেটের আসনে ঠিকঠাক বসতে না বসতেই তাঁকে ছুড়ে ফেলেছে নিউক্যাসল। ইসাক আর তাদের কাছে দেবতা নন, বরং বয়ে আসা উটকো এক ঝামেলা। ঘটনার সূত্রপাত দলবদলের মৌসুমের শুরু থেকে। ইসাকের জনপ্রিয়তা চোখে লেগেছিল অনেকের, বড় বড় দলগুলো তাকে নিয়ে টানা-হেঁচড়া শুরু করেছিল। কিন্তু কেউই মন যোগাতে পারছিল না ইসাক কিংবা নিউক্যাসলের। ফলে কাড়াকাড়ি সত্ত্বেও ইসাক ছিলেন নিউক্যাসলে।
কিন্তু বিপত্তি বাধে মৌসুম শুরুর কিছুদিন আগে। লিভারপুলের দেওয়া শেষ অফার মনঃপূত হয় ইসাকের। এতদিন ধরে নিউক্যাসলের প্রাণভোমরা হয়ে উঠলেন লিভারপুলের পাণিপ্রার্থী। ইসাকের এই হঠাৎ পরিবর্তন দেখে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল নিউক্যাসল বোর্ড। হওয়ারই কথা। এতদিন ধরে যার ভরসায় আক্রমণভাগের দিকে মনোযোগই দেয়নি নিউক্যাসল, সে যখন বলে বসে না আর হচ্ছে না, তখন তো কর্মকর্তাদেরও মাথায় হাত।
ইসাকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলারও সুযোগ হয়নি কারো। প্রি-সিজনে ছিলেন না, এমনকি লিগের দুই ম্যাচ শেষ, নিউক্যাসলের আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না তাকে। শুধু কি তাই? গত মৌসুমের সেরা একাদশে জায়গা করে নিয়েছিলেন পারফরম্যান্স দিয়ে। সেখান গিয়ে নিউক্যাসলের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে বলে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও করেননি। ঘটা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্টও দিয়েছেন, লিখেছেন ‘যখন প্রতিশ্রুতি ভাঙা হয় তখন বিশ্বাসটা আর থাকে না। সেই সম্পর্ক টেনে নেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।’ একটি স্টোরিতেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, নিউক্যাসলের সঙ্গে আর সম্পর্কটা ঠিক হতে যাচ্ছে না ইসাকের।
ইসাককে নিয়ে নিউক্যাসলের সামনে পথ খোলা ছিল দুইটি। হয় লিভারপুলের সঙ্গে সমঝোতায় এসে তাকে চড়া মূল্যে বিক্রি করা। নইলে জোর করে তাকে নিউক্যাসলে রেখে দেওয়া। দ্বিতীয়টা করতে মাসের পর মাস শুধু বেতনই দিয়ে যেতে হবে, কারণ তার সঙ্গে চুক্তিটা ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তড়িঘড়ি করে নিউক্যাসল তাই খোঁজা শুরু করেছিল ইসাকের রিপ্লেসমেন্ট। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। কারণ নিউক্যাসল যার দিকেই নজর দিচ্ছে, তাঁকেই কেড়ে নিচ্ছে অন্য কেউ। বেঞ্জামিন সেসকোকে কেড়ে নিয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, হুগো একিতেকে যোগ দিয়েছেন লিভারপুলে। এখন পর্যন্ত যোগ্য কোনো স্ট্রাইকার খুঁজে পায়নি নিউক্যাসল, যার ওপর ভরসা করে ইসাককে ছাড়তে পারে তারা। বর্তমানে তাদের রাডারে ঘুরপাক খাচ্ছে দুইটি নাম, উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সের স্ট্রাইকার জর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেন অথবা পিএসজির স্ট্রাইকার গনসালো রামোস। দুইজনের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কথাবার্তা শেষ তাদের। কিন্তু ক্লাবেদের সঙ্গে চুক্তি করা এখনও বাকি। এছাড়াও রাডারে নাম আছে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হুলিয়ান আলভারেজ, চেলসির নিকলাস জনসন ও অ্যাস্টন ভিলার ওলি ওয়াটকিনসের। ইসাককে ছেড়ে না দিলেও এদের কেউ নিউক্যাসলে যোগ দিচ্ছেন সেটা নিশ্চিত।
বাকি থাকলো লিভারপুলের সঙ্গে চুক্তিতে আসা। কিন্তু সেখানেও সমঝোতায় পৌঁছতে পারছেন না তারা। নিউক্যাসলের চাওয়া ১৫০ মিলিয়ন। ইতোমধ্যে দলবদলের মৌসুমে কাড়ি কাড়ি অর্থ ঢালা লিভারপুল ইসাকের পেছনে এত অর্থ ঢালবে কি না, সে প্রশ্ন ছিল অনেকের। লিভারপুল বেঁকে বসেছে সেখানেই। খেলোয়াড় যেখানে রাজি, সেখানে এত টাকা দেওয়ার কোন অর্থই হয় না। ১০০ মিলিয়ন ইউরোর কাছাকাছি হলেই দলবদলে রাজি হয়ে যাবে লিভারপুল। কারণ এজেন্ট ফি, বোনাস ও সবকিছু মিলিয়ে আরও ১০০ মিলিয়ন ইউরোর কাছাকাছি আলাদা করে খরচ করতে হবে লিভারপুলকে।
দুই একদিনের মধ্যেই সমঝোতায় না পৌঁছালে ক্ষতি যতটা না লিভারপুল বা নিউক্যাসলের, তার থেকে বেশি ইসাকের। কারণ নতুন দলে যাওয়ার জন্য পুরোনো দলের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন ইসাক ও তার এজেন্ট। তাদের দুইজনের ব্যবহার ও কর্মকাণ্ডে নিউক্যাসলে ফেরত যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। ক্যারিয়ারের শুরুতে রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার সুযোগ ছিল ইসাকের। সেই সুযোগ ফেলে দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন বুরুশিয়ায়, কারণ ধীরে ধীরে ক্যারিয়ারে আগাতে চান। সেখান থেকে সোসিয়েদাদ হয়ে নিউক্যাসল। লিভারপুল হতে যাচ্ছে ২৬ বছর বয়সী ইসাকের জন্য ফাইনাল ‘স্টেপিং স্টোন’। সেটা যদি না হয়, তাহলে ক্ষতিটা হতে যাচ্ছে তারই। নিউক্যাসলের ‘অ্যালেকজেন্দার দ্য গ্রেট’ এখন কী করেন সেই অপেক্ষাতে ফুটবল বিশ্ব।