চ্যাম্পিয়নস লিগে চমকে দিচ্ছে নতুন দলগুলো
উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বের রাতটা শেষ হয়েছে চমক দিয়ে। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে বেনফিকার গোলরক্ষকের আনাতলি ত্রুবিন গোল করে দলকে তুলেছেন শেষ ২৪-এ। টুর্নামেন্টের ফরম্যাট বদলেছে, বদলেছে দলের সংখ্যা। কিন্তু উত্তেজনার পারদ কমেনি একবিন্দু।
গত মৌসুম থেকে পাল্টে গিয়েছে টুর্নামেন্টের ফরম্যাট। গ্রুপ পর্বের ড্র বাদ দিয়ে তৈরি হয়েছে গ্রুপ পর্ব। আর সেই সঙ্গে দলের সংখ্যাও বেড়েছে ৪টি। ফরম্যাট আর দলের সংখ্যা বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে টুর্নামেন্টের চিত্রও। আগের নিয়মে গ্রুপ পর্বে যেখানে কালেভদ্রে চমকের দেখা মিলত, গত মৌসুম থেকে চমকের দেখা মিলছে নিয়মিত।
জায়গার হিসেবে এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ ছিল সবচেয়ে বড় চ্যাম্পিয়নস লিগ। পশ্চিম থেকে পূর্বে, পর্তুগালের লিসবন থেকে শুরু করে কাজাখস্তানের আলমাতি, চ্যাম্পিয়নস লিগের যাত্রাটা ছিল বিশাল। নরওয়ের বোডো/গ্লিমট থেকে সাইপ্রাসের পাফোস; উত্তর-দক্ষিণের যাত্রাটা কম বড় নয়।
আজকের গল্পটা ইউরোপিয়ান ফুটবলে আভিজাত্য কিংবা জাঁকজমক নিয়ে নয়। বরং প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ ফুটবল খেলা চার দলের গল্প। যারা ফুটবল–বিশ্বকে চমক দেখাতেও বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি।
বোডো/গ্লিমট
শুরুটা করা যায় চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্ব–উত্তরের দল বোডো/গ্লিমটকে নিয়ে। একটা ক্লাবের নামে অবলিক চিহ্ন দেখেই চমকে উঠতে হয়। তবে নরওয়ের ক্লাবটির নাম এরকমই। এর পেছনে জড়িয়ে আছে তাদের ইতিহাস। তাদের ক্লাবের আসল নাম ছিল গ্লিমট। ১৯১৬ সালে নরওয়ের বোডো শহরে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটি। ৫৫ হাজার জনগোষ্ঠীর ছোট্ট শহর বোডো, যা নরওয়েতে পরিচিত মাছ ধরার শহর হিসেবেই। কিন্তু আস্তে আস্তে গ্লিমট যখন জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছতে থাকে, তখন নরওয়ে থেকে নিয়ম করা হয়, ক্লাবের সঙ্গে তাদের শহরের নাম থাকতে হবেই। গ্লিমট কোনো উপায়ান্ত না পেয়ে নিজেদের নামের সঙ্গে শহরের নাম যোগ করে। কিন্তু এটা তো সবাই করে, এর ভেতর নতুনত্ব কী? নতুনত্ব খুঁজতে গিয়েই দুই নামের মধ্যে একটি অবলিক যুক্ত করে দিয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। আর সেই অবলিক দেওয়া ক্লাবটি জন্ম দিয়েছে এবারের আসরের সবচেয়ে বড় আপসেটের।
ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়, আতলেতিকো মাদ্রিদের ২-১ গোলের জয় আর বুরুশিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে ড্র। ইউরোপের হেভিওয়েট দলগুলোও এসব দলের মুখোমুখি হতে চায় না, সেখানে বোডো/গ্লিমট নিজেদের শহরে আতিথ্য গ্রহণ করিয়ে এক এক করে আটকে দিয়েছে এক অদৃশ্য জালে।
২ জয় ৩ ড্র নিয়ে ইউরোমধ্যে সেরা ২৪-এ জায়গা করে নিয়েছে তারা। পথিমিধ্যে নিজেদের মাটিতে দর্শকদের সামনে প্রমাণ করেছে নিজেদের। ম্যানচেস্টার সিটি, আতলেতিকো মাদ্রিদ, বুরুশিয়া ডর্টমুন্ডের মতো হেভিওয়েট দলকে আটকে দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে চ্যাম্পিয়নস লিগ মানে শুধু আভিজাত্য আর সম্মান নয়। নতুন দলগুলোর চমকও বটে।
কারাবাগ
এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগে দ্বিতীয় বড় চমকের নাম ছিল কারাবাগ। আজারবাইজানের এই ক্লাব প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগে এসেই পৌঁছে গিয়েছে দ্বিতীয় পর্বে, সেটাও আবার বড় কোন হিসেবের মারপ্যাঁচ ছাড়াই। বাকি দলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়নি তাদের, বরং ১০ পয়েন্ট নিয়ে অনায়াসে জায়গা করে নিয়েছে নক আউট পর্বে। শুধু কি তা–ই? দ্বিতীয়বারের মতো খেলতে এসে প্রথম ম্যাচেই তারা দেখিয়েছে চমক। বেনফিকার মাটিতে বেনফিকাকে হারিয়ে প্রথম দিনেই তাক লাগিয়ে দিয়েছিল কারাবাগ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। চেলসির সঙ্গে করেছে ২-২ ড্র। জার্মান ক্লাব আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টকে হারিয়ে জায়গা করে নিয়েছে নক আউট পর্বে। প্রথমবারের মতো আজারবাইজানের কোনো ক্লাব খেলবে চ্যাম্পিয়নস লিগের দ্বিতীয় পর্ব।
পাফোস এফসি
পাফোস এফসি নাম কামানো শুরু করেছে চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজেদের যাত্রা শুরু করার আগেই। চ্যাম্পিয়ন লিগে সুযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দলে ফিরিয়েছে দাভিদ লুইসকে। ব্রাজিলের সেই ঝাকড়া চুলের ডিফেন্ডার দাভিদ লুইস ব্রাজিলিয়ান লিগ ছেড়ে ইউরোপে এসেছেন শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলতে। ৩৮ বছর বয়সেও যে একেবারে ফুরিয়ে যাননি, তা প্রমাণ করেছেন পাফোসে যোগ দিয়ে। না, সাইপ্রাসের দলটি পরবর্তী পর্বের টিকিট কাটতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু চমক দেখানোর কোনো কমতি রাখেননি। প্রথমবারের মতো খেলতে এসেই হারিয়ে দিয়েছে স্প্যানিশ ক্লাব ভিয়ারিয়ালকে, মোনাকোর সঙ্গে ড্র আর জুভেন্টাস চেলসির বিপক্ষে লড়াই করেও হারতে হয়েছে তাদের। বায়ার্নের বিপক্ষে বিশাল ব্যবধানে না হারলে আর ভাগ্য একটু সহায় থাকলে হয়তো দ্বিতীয় পর্বের টিকিট পেয়েই যেত সাইপ্রাসের দলটি। ৯ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে ২৬তম হয়ে যাত্রা শেষ করেছে তারা।
কাইরাত আলমাতি
৩৬ দলের পয়েন্ট তালিকায় সবচেয়ে নিচে থাকা দলটির নাম কাইরাত আলমাতি। আলমাতি শহরকে যতটা না ইউরোপের বলা যায়, তার থেকেও বেশি এশিয়ার। কারণ, এশিয়া মহাদেশ থেকে তাদের শহরটার দূরত্ব মাত্র ৫০ কিলোমিটার। ইউরোপের শেষপ্রান্তে থাকা শহরের আতিথ্য গ্রহণ করেছিল রিয়াল মাদ্রিদ, আর্সেনাল ও ইন্টারের মতো দল। যে মাঠে যাওয়ার জন্য রিয়াল মাদ্রিদকে পারি দিতে হয়েছিল ৮০০০ কিলোমিটার! সিল্ক রোডের পাশে গড়ে ওঠা শহর ও তার ক্লাব সাক্ষী হয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। জয়–পরাজয়ের হিসাব দিয়ে তাদের মাপলে ভুলই হবে। রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে খেলা পরার পর তাদের যে উদ্যাপন আর আনন্দ ছিল, তাই তাদের চ্যাম্পিয়নস লিগের অর্জনটা তাদের খেলার মধ্যেই। এর মধ্যেও পাফোস এফসির সঙ্গে ড্র করে এক পয়েন্ট পেয়েছে তারা। গোল পেয়েছে ইন্টার আর আর্সেনালের বিপক্ষে। ছোট্ট এই দলের জন্য এর থেকে বড় আর কীই–বা হতে পারে?