কী হচ্ছে হুলিয়ান আলভারেজকে নিয়ে
বিশ্বকাপে তখনো গ্রুপ পর্বের ম্যাচ চলছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন হুলিয়ান আলভারেজ। এমনিতেই টুর্নামেন্টে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন, সেই সময়েই করে বসলেন এক বেফাঁস মন্তব্য। সরাসরি নিজের ক্লাবকে জানিয়ে দিলেন, ‘সবার জন্য যেটা ভালো হয়, সেটাই করা হোক। স্বপ্ন পূরণের পথে যাতে কেউ বাধা না হয়ে ওঠে।’ বিশ্বকাপের মধ্যে নড়েচড়ে বসল সবাই। এমনভাবে নিজ ক্লাবকে ইঙ্গিত দেওয়ার ঘটনা, তা-ও বিশ্বকাপের মঞ্চে। আগে কখনো দেখা যায়নি। সেই ঘটনার দুই মাস পেরিয়ে গেছে, হুলিয়ান আলভারেজ এখনো স্বপ্নের ক্লাবে যেতে পারেননি। আছেন আতলেতিকো মাদ্রিদে ‘বন্দী’ হয়ে।
আলভারেজ কেন ম্যানচেস্টার সিটি ছাড়লেন
হুলিয়ান আলভারেজ লাইমলাইটে এসেছিলেন ২০২২ বিশ্বকাপ দিয়ে। চার গোল করে সারা ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। সবাই ধরেই নিয়েছিলেন ভবিষ্যৎ আর্জেন্টিনার চাবিকাঠি উঠতে যাচ্ছে তাঁর হাতে। সেই স্বপ্ন নিয়ে আলভারেজ যোগ দিয়েছিলেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। কিন্তু পেপ গার্দিওলার অধীনে আলভারেজ যত ভালোই খেলুন না কেন, আর্লিং হলান্ডের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ম্লান করে দিত সবকিছু। বেঞ্চে বসেই কাটত মৌসুমের বড় একটা সময়। তাই তো আতলেতিকো মাদ্রিদ যখন নিজেদের বিশাল ৯৫ মিলিয়ন ইউরোর অফার নিয়ে এল, সিটি আর আলভারেজ রাজি হয়ে গিয়েছিলেন সঙ্গে সঙ্গে। ইউরোপের বড় দলে যেমন থাকছেন, তেমনই বড় অঙ্কের বেতনের সঙ্গে নিয়মিত খেলার সুযোগও পাচ্ছেন। খাপে খাপ মিলতে এর থেকে বেশি আর কী লাগে?
কেন মুখ থুবড়ে পড়ল আতলেতিকোর পরিকল্পনা
আলভারেজকে বিশাল স্বপ্ন নিয়ে দলে ভিড়িয়েছিলেন ডিয়েগো সিমিওনে। নিজ দেশের খেলোয়াড়, দেশ আর ক্লাবের মূল ভরসার পাত্র। তাঁকে কেন্দ্র করে পুরোনো ট্যাকটিকসকে নতুন করে সাজানোর চিন্তা ছিল সিমিওনের। সেটা যে কাজে দেয়নি তা কিন্তু নয়। অভিষেক মৌসুমেই ৫৭ ম্যাচে ২৯ গোল। পরের মৌসুমে ৪৯ ম্যাচে ২০ গোল। পরিসংখ্যান দিয়ে মাপলে খুব একটা খারাপ পারফরম্যান্স না। অন্তত আতলেতিকো মাদ্রিদ যেভাবে খেলে, ‘ডিফেন্স ধরে রেখে আক্রমণ; গোল পেতেই আবার ডিফেন্স’; সেই নকশায় এর থেকে ভালো করা সম্ভব ছিল না। সম্পর্ক তত দিন পর্যন্ত ঠিকঠাকই ছিল, যত দিন না বাগড়া বাধাল বার্সেলোনা।
আলভারেজের দিকে বার্সেলোনার নজর
মৌসুমের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে বার্সেলোনা থেকে জানতে চাওয়া হয় আলভারেজের ব্যাপারে। রবার্ট লেফানডফস্কির রেখে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণের জন্য আলভারেজের দিকে নজর ছিল বার্সেলোনার। সেটা জেনেই যেন চক্ষু চড়কগাছ হয়ে উঠল আতলেতিকোর। এই তো সুযোগ, নিজেদের সেরা খেলোয়াড়ের জন্য টাকা আয় করে নেওয়ার। তাদের সাফ কথা, বার্সেলোনার কাছে তার খেলোয়াড় বিক্রি করতে রাজি নন। তাঁকে যদি কিনতেই হয়, তাহলে তাঁর রিলিজ ক্লজ পরিশোধ করে কিনে নিক তারা। বলা বাহুল্য, ২০২৪ সালে কেনার সময় আলভারেজের নামের পাশে ৫০০ মিলিয়ন ইউরোর রিলিজ ক্লজ যুক্ত করে দিয়েছিল তারা।
বার্সেলোনা ভেবেছিল চুক্তির টেবিলে বসলে হয়তো কিছু কমবেশি করা যাবে। কিন্তু না, আতলেতিকোর সাফ কথা একটাই, টাকা দিতে হলে পুরোটা দিয়েই আলভারেজকে নিয়ে যাও। ৮০ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে অ্যান্থনি গর্ডন, ৬০ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে রদেইকে কিনতে পারলে আলভারেজের জন্যও পুরো দাম দিতে পারবে বার্সা, এমনটাই আশা ছিল আতলেতিকোর।
এর মধ্যেই আবার উল্টো দান চেলেছে রিয়াল মাদ্রিদ। আলভারেজের জন্য সরাসরি ঘোষণা দিয়ে ১৫০ মিলিয়ন ইউরোর প্রস্তাব দিয়েছিল তারা। আতলেতিকো সেটাও ফিরিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ কিনতে হলে যা দাম চাইছে, তা-ই লাগবে। কিন্তু বার্সেলোনা তাদের ১০০ মিলিয়নের বিড থেকে নড়বে না তো না-ই।
বিপাকে আলভারেজ
এখন আলভারেজ পড়েছেন বিপাকে। বার্সায় আসার জন্য তাঁর মন আনচান করছে, কিন্তু দলকে ছেড়ে চলে আসার তো উপায় নেই। এত দিন ট্রেনিং করবেন না বলেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরতে হয়েছে আতলেতিকোতেই। সিমিওনেও কম যান না। প্রথম ম্যাচে দলে রাখেননি, দ্বিতীয় ম্যাচে ঘরের মাঠে দলে যেমন রেখেছেন, তেমনই মাঠেও নামিয়েছেন শেষ ২৫ মিনিটের জন্য। মাঠে নামার পর থেকে দর্শকদের দুয়োতে কান পাতা দায় হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচ শেষ করে পালিয়ে বেঁচেছেন যেন তিনি। অন্যদিকে বার্সেলোনায় তাঁর মতো করে উদ্যাপন করছেন রাফিনহা, তাঁকে আনার জন্য বার্সেলোনার খেলোয়াড়েরা স্পাইডার-ম্যানের লোগো গায়ে চড়িয়ে ঘুরছেন। ওহ্ বলতে তো ভুলেই গিয়েছি, আলভারেজের প্রিয় সুপারহিরো কিন্তু স্পাইডার-ম্যান। মাস্ক পরে, উদ্যাপন করে যখনই পারেন স্পাইডার-ম্যান হয়ে যান তিনি। সেই স্পাইডার-ম্যানকে রীতিমতো আটকে রেখেছে আতলেতিকো।
আলভারেজ একা নন
এমন ঘটনা যে শুধু আলভারেজের সঙ্গেই করছে আতলেতিকো, তা কিন্তু নয়। সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা বা রিয়ালে বিক্রি করতে একেবারেই নারাজ তারা। রাদামেল ফ্যালকাও, সার্জিও আগুয়েরো, দিয়েগো ফোরলানের মতো খেলোয়াড়কে কিনতে চাইলেও সরাসরি রিয়ালের কাছে বিক্রি করেনি তারা। বরং অন্য কোনো দলে পাঠিয়ে দিয়েছে ইচ্ছার বিরুদ্ধে। এমনকি আঁতোয়ান গ্রিজমানকে কিনতেও বার্সেলোনাকে পরিশোধ করতে হয়েছিল পুরো রিলিজ ক্লজ। সেখানে আলভারেজকে এত সহজে যেতে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। উল্টো তাঁর ক্লাব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, ‘খেলোয়াড়কে ভুক্তভোগী হিসেবে সাজানো হচ্ছে। অথচ এই হুলিয়ান–কাণ্ডে আসল ভুক্তভোগী একমাত্র আমরাই। বার্সেলোনার কাছে তাঁকে বিক্রির সম্ভাবনা জিরো পার্সেন্ট।’
কিন্তু জোর করে তো আর একজনকে দলে রাখা যায় না। আলভারেজকে খেলানো প্রায় অসম্ভবই। ফলে বার্সা-রিয়াল বাদে অন্য কোনো দল যদি তার জন্য ১৫০ মিলিয়ন ইউরোর প্রস্তাব পাঠায়, তাহলে আতলেতিকো ভেবে দেখবে। সেই দৌড়ে অবশ্য আর্সেনালের নামটাই জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। দেখা যাক, এখন দলবদলের মৌসুমের শেষ দিকে এসে আলভারেজের ভাগ্যে কী লেখা আছে?