ব্যবহার শেষে পানিতেই গলে যাবে গ্যাজেট, নতুন উদ্ভাবন

আলোচনায় এসেছে ‘অ্যাকুয়াফেড’সিএনএন

তোমার কাছে কতগুলো ইলেকট্রনিক যন্ত্র আছে? নিশ্চয়ই একাধিক। বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে একই। মানুষ এখন ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বা যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। বহু মানুষ এখন কম্পিউটার, স্মার্টফোনসহ নানা ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্র ছাড়া নিজের জীবন কল্পনা করতে পারেন না। কিন্তু এই যন্ত্র যখন জীবন শেষ করে, মানে ব্যবহার শেষ হয়ে যখন বাতিল হয়ে যায়, তখন এগুলো কোখায় যায়? নিশ্চয়ই বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। এখন সব মানুষের ইলেকট্রনিক যন্ত্রগুলো ক্রমাগত বাতিল হতে থাকলে কী ঘটবে? নিশ্চয়ই ই-বর্জ্যের পাহাড় জমে উঠবে। হচ্ছে সেটিই। জাতিসংঘের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ২০২২ সালেই বিশ্বে ৬ কোটি ২০ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য যদি ট্রাকে তোলা হয়, তবে প্রায় ১৫ লাখ ট্রাক লাগবে।

এই বর্জ্যের বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত যায় ল্যান্ডফিল বা চুল্লিতে, যা পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ, ই-বর্জ্যের মধ্যে থাকে পারদের মতো বিষাক্ত উপাদান ও সিসার মতো ভারী ধাতু।

এই বর্জ্যের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ আর্থিক মূল্য। প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য বাতিল হচ্ছে, যেগুলো আবারও ব্যবহার করা সম্ভব হতো। আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্র তৈরিতে এই উপাদানগুলো অত্যন্ত জরুরি। জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে বিশ্বের মোট চাহিদার মাত্র ১ শতাংশ বিরল উপাদান আসে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার থেকে। সমস্যা আরও জটিল হচ্ছে। কারণ, ই-বর্জ্য বাড়ছে পুনর্ব্যবহারের হারের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ দ্রুতগতিতে।

আরও পড়ুন

এই সমস্যার সমাধান করতে পারে নতুন এক আবিষ্কার। আলোচনায় এসেছে ‘অ্যাকুয়াফেড’। এটি একধরনের নতুন প্লাস্টিক, যা পুরোপুরি পানিতে দ্রবণীয়। পানিতে এটি ডুবিয়ে রাখলে প্রায় ছয় ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ গলে যায়। এই উপাদান দিয়ে কম্পিউটার, কিবোর্ড বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রের বাইরের খোলস তৈরি করা যেতে পারে। যন্ত্রটি আর প্রয়োজন না হলে সেই খোলস পানিতে গলিয়ে ফেলা যাবে। ফলে ভেতরের মূল্যবান যন্ত্রাংশ আলাদা করা সহজ হবে। পুনর্ব্যবহার করা যাবে সহজেই। আর ই-বর্জ্যের পরিমাণ কমবে।

অ্যাকুয়াফেডের অন্যতম উদ্ভাবক স্যামুয়েল ওয়াংসাপুত্রা। তিনি বলেন, ইলেকট্রনিক পণ্য রিসাইক্লিংয়ের সবচেয়ে বড় ঝামেলা হলো সেগুলো খুলে ফেলা। এই কাজ বেশ কষ্টকর ও ব্যয়বহুল। তাঁর মতে, অ্যাকুয়াফেডের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, কাজটি বাড়িতেই করা সম্ভব। বিশাল কোনো কারখানায় দরকার হবে না।

এই উদ্ভাবনের পেছনের অনুপ্রেরণা এসেছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে। এক রাতে বাসন ধোয়ার সময় ওয়াংসাপুত্রার চোখ পড়ে ডিশওয়াশার পডের দিকে। তিনি লক্ষ্য করেন, পডটির স্বচ্ছ মোড়ক পানিতে গলে যায়। কৌতূহলবশত তিনি একটি পড পানির গ্লাসে ফেলে দেখেন, সেটি পুরোপুরি মিলিয়ে যায়। তখনই তাঁর মাথায় আসে, এটি নিশ্চয়ই কোনো ধরনের পলিমার; কিন্তু এটি যায় কোথায়?

আরও পড়ুন
রিস্ট-ব্যান্ডে ‘অ্যাকুয়াফেড’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে
সিএনএন

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে স্যামুয়েল ওয়াংসাপুত্রা তাঁর সহ-উদ্ভাবক জুন সাং লির সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ২০১৯ সালে তাঁরা যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্টার্টআপ ‘পেন্টাফর্ম’ প্রতিষ্ঠা করেন। যারা কম খরচের সহজলভ্য কম্পিউটার তৈরি করে। পরে তাঁরা ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের দুই উপাদানবিজ্ঞানী এনরিকো মানফ্রেদি-হেইলক ও মেরিয়েম লামারির সঙ্গে যুক্ত হন।

গবেষণায় তাঁরা খুঁজে পান, পিভিওএইচ বা পলিভিনাইল অ্যালকোহল নামের একধরনের উপাদান, যা দেখতে অনেকটা গ্লু-স্টিকের মতো। এই উপাদান খাবারের প্যাকেট হিসেবে নিরাপদ। মানে শিশুরা মুখে দিলেও ক্ষতি নেই। এটি বাথরুমে ফেলে দিলেও পুরোপুরি জৈবভাবে ভেঙে যায়। ওয়াংসাপুত্রা বুঝতে পারেন, এই উপাদান ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের একটি বড় বাধা দূর করতে পারে। পরিবহনের সমস্যা দূর করতে পারে। ই-বর্জ্য সংগ্রহ ও বহনের খরচ যেমন বেশি, তেমনি এতে কার্বন নিঃসরণও বাড়ে। তার ওপর বেশির ভাগ ই-বর্জ্য আসলে রিসাইকেল হয় না। যদি মানুষ নিজেরাই বাড়িতে যন্ত্রের খোলস আলাদা করতে পারে, তবে পুরো প্রক্রিয়া সহজ হয়ে যায়।

এই ধারণা যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়ন পেয়েছে। লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব আর্টসে দলটি এখন একের পর এক নকশা ও উপাদান নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এমন একটি বস্তু তৈরি করা, যা একদিকে পানিতে দ্রবণীয়, আবার ব্যবহারকালে পানিরোধী। শেষ পর্যন্ত তাঁরা এমন একটি কোটিং তৈরি করেছেন, যা জৈবভাবে ভাঙে; কিন্তু একই সঙ্গে বেশ শক্তপোক্ত। এই কোটিং শুধু বাইরের খোলসে লাগানো হয়, ফলে পণ্যটি ৩০ মিনিট পর্যন্ত পাঁচ মিটার পানির নিচে থাকলেও ক্ষতি হয় না। হঠাৎ পানিতে পড়ে যাওয়া বা ভেজা আবহাওয়ায় কোনো ক্ষতি হয় না।

আরও পড়ুন

তবে এর কিছু অসুবিধা এখনো আছে। পণ্য থেকে মাত্র একটি স্ক্রু খুললেই সেখানে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। তখন পুরো যন্ত্রটি পানিতে ডুবিয়ে রাখলে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে খোলসটা গলে যায়। শেষে থাকে দুধের মতো ঘোলা পানি এবং যন্ত্রের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ, মানে ইলেকট্রনিক সার্কিট। ওয়াংসাপুত্রা বলেন, এই ঘোলা পানি সরাসরি সিঙ্ক বা টয়লেটে ঢেলে দেওয়া যায়। কারণ, এটি পয়োনিষ্কাশন–ব্যবস্থায় আরও ভেঙে যায়।

অ্যাকুয়াফেডের প্রথম বাণিজ্যিক ব্যবহার হতে পারে কনসার্টে ব্যবহৃত এলইডি রিস্ট–ব্যান্ডে। একবার ব্যবহার করার পরই হাজার হাজার মানুষ এগুলো ফেলে দেন। এগুলো বানানো সহজ। দলটি এরই মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বড় রিস্ট–ব্যান্ড সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলছে। আপাতত তারা একবার ব্যবহারযোগ্য ইলেকট্রনিক পণ্যের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে সব ধরনের যন্ত্রে এই খোলস ব্যবহার করতে চান তাঁরা। এমনকি ইলেকট্রনিক ছাড়াও লাগেজ, গাড়ির ভেতরের অংশ, ঘড়ি, সানগ্লাস, এমনকি আসবাবেও এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে। অন্যদের এই বস্তু ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স দেওয়ার কথাও ভাবছে তারা।

বর্তমানে অ্যাকুয়াফেডের দাম সাধারণ এবিএস প্লাস্টিকের প্রায় দ্বিগুণ। তবে ওয়াংসাপুত্রার মতে, এটি পুরো পণ্যের মোট খরচের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ। বড় আকারে উৎপাদন শুরু হলে খরচ আরও কমে আসবে।

আরও পড়ুন

তবে সব বিজ্ঞানীই এটি নিয়ে আশাবাদী না। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অজৈব রসায়নের ইমেরিটাস অধ্যাপক পিটার এডওয়ার্ডস বলেন, এটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয় উদ্ভাবন, তবে প্রশ্ন থেকে যায়, পানিতে গলে যাওয়া প্লাস্টিক শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়? এটি কি পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়ে রয়ে যাবে? অ্যাকুয়াফেড দল স্বীকার করেছে, এই দ্রবণ কত দিনে পুরোপুরি ডিজলভ বা ক্ষয়ে যায়, তারা এখনো পুরোপুরি পরীক্ষা করে দেখেননি।

ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিমার বিজ্ঞানের অধ্যাপক মাইকেল শেভারও কিছু সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, জৈব ক্ষয়ের প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা ও গতি নিয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা দরকার। তাঁর মতে, ‘আসল জটিলতা লুকিয়ে থাকে খুঁটিনাটিতে। ইলেকট্রনিক পণ্যের প্লাস্টিককে খুব ভালো বৈদ্যুতিক নিরোধক হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে আগুন প্রতিরোধীও হতে হয়। আর দীর্ঘদিন টিকে থাকার মতো আবহাওয়া–সহনশীলতা তো লাগেই। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।’

সূত্র: সিএনএন

আরও পড়ুন