জাতভেদে আমের মুকুলের গন্ধ আলাদা হয় কেন

ফুটেছে আমের মুকুল। সেই মুকুলের সঙ্গে খেলায় মেতেছে গ্রামের শিশুরা। বালুকচড়া, শিবগঞ্জ, বগুড়া, ২ মার্চছবি: সোয়েল রানা

বসন্তের শুরুর দিক। হালকা রোদ, মৃদু বাতাস—আর সেই বাতাসে ভেসে আসে এক অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ। তুমি বুঝে যাও, কোথাও না কোথাও আমগাছে মুকুল এসেছে। এই গন্ধ এতই পরিচিত আর প্রিয় যে অনেকের কাছে বসন্ত মানেই আমের মুকুলের সুবাস। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছ, এই মনমাতানো গন্ধ আসলে কেন তৈরি হয়?

চলো, সহজভাবে এই রহস্যটা খুলে দেখা যাক।

মুকুল মানে কী

প্রথমেই জানা দরকার, মুকুল আসলে কী। আমগাছে যখন ফুল ধরার সময় আসে, তখন ছোট ছোট অসংখ্য ফুল একসঙ্গে গুচ্ছ আকারে ফুটতে শুরু করে। এই ফুলের গুচ্ছকেই বলা হয় ‘মুকুল’। একটা মুকুলে শত শত ক্ষুদ্র ফুল থাকতে পারে।

এই ছোট ফুলগুলোই পরে আমে পরিণত হয়। তবে সব ফুল থেকে কিন্তু আম হয় না—কিছু ঝরে যায়, কিছু টিকে থাকে।

গন্ধের আসল রহস্য: ভলাটাইল কম্পাউন্ড

এবার আসল প্রশ্ন—এই গন্ধ আসে কোথা থেকে?

আমের মুকুলে থাকে কিছু বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ, যেগুলোকে বলা হয় ভলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ডস (Volatile Organic Compounds বা VOCs)।

‘ভলাটাইল’ মানে হলো যেগুলো খুব সহজেই বাতাসে মিশে যায়।

এই VOCs-গুলোই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং আমাদের নাকে এসে লাগে। তখন আমরা সেই মিষ্টি, হালকা ঝাঁজালো, কখনো একটু মাদকতাময় গন্ধ পাই।

আরও পড়ুন

কেন এই গন্ধ তৈরি হয়

এই গন্ধ শুধু আমাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য নয়। এর পেছনে রয়েছে গাছের নিজের বুদ্ধি!

আমগাছ চায় তার ফুলে মৌমাছি, প্রজাপতি, মাছি—এসব পোকামাকড় আসুক। কারণ, এরা ফুলে বসে পরাগায়ন (pollination) ঘটায়। সহজ করে বললে, এক ফুলের পরাগ অন্য ফুলে পৌঁছে দেয়, যার ফলে ফল (আম) তৈরি হয়।

এই পোকামাকড়দের আকর্ষণ করার জন্যই আমের মুকুল থেকে এই মিষ্টি গন্ধ বের হয়। এটা যেন গাছের একধরনের ডাক—‘এই যে এখানে আসো! আমার ফুলে বসো!’

মাঘ মাসেই মুকুলে ছেয়ে গেছে আমগাছ। প্রকৃতিতে ছড়াচ্ছে আমের মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণ
ছবি: সোয়েল রানা

গন্ধ আর পোকামাকড়ের সম্পর্ক

সব ফুলের গন্ধ কিন্তু একরকম নয়। কিছু ফুলের গন্ধ খুব মিষ্টি, কিছু আবার একটু তীব্র। আমের মুকুলের গন্ধে একটা বিশেষ ধরনের মিশ্র অনুভূতি থাকে—মিষ্টি আবার সামান্য ঝাঁজালো।

এই গন্ধটা বিশেষভাবে এমনভাবে তৈরি, যাতে মৌমাছি আর অন্যান্য পোকামাকড় সহজেই বুঝতে পারে—এখানে খাবার (মধু) আছে।

পোকামাকড়রা যখন ফুলে বসে মধু খায়, তখন তাদের শরীরে লেগে যায় পরাগ। এরপর তারা অন্য ফুলে গেলে সেই পরাগ ছড়িয়ে দেয়। এভাবেই গাছের বংশবিস্তার হয়।

আরও পড়ুন

বাতাসে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে কীভাবে

তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, আমের মুকুলের গন্ধ অনেক দূর থেকেও পাওয়া যায়। এর কারণ হলো—VOCs খুব হালকা, তাই সহজেই বাতাসে উড়ে যায়। বসন্তকালের মৃদু বাতাস এই গন্ধকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়।

গরম বা রোদ থাকলে এই গন্ধ আরও বেশি ছড়ায়। তাই বিকেলের দিকে বা হালকা গরমে এই গন্ধ বেশি টের পাওয়া যায়।

কখনো কখনো অ্যালার্জি অসহনীয় বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়ায়
ছবি: প্রথম আলো

কেন কারও কারও অ্যালার্জি হয়

একটা মজার (কিন্তু একটু বিরক্তিকর) বিষয় হলো—সবাই কিন্তু এই গন্ধ উপভোগ করতে পারে না।

অনেকের ক্ষেত্রে আমের মুকুলের এই VOCs বা পরাগরেণু নাকে গিয়ে অ্যালার্জি তৈরি করে। ফলে হাঁচি আসে, নাক দিয়ে পানি পড়ে, চোখ চুলকায়।

এটা আসলে শরীরের একধরনের প্রতিক্রিয়া। তবে এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই—এটা খুব সাধারণ বিষয়।

আরও পড়ুন
মুকুলে ছেয়ে গেছে আমগাছ
ছবি: মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন

সব আমগাছের গন্ধ কি এক রকম

না। একদমই না!

আমের অনেক জাত আছে। যেমন ক্ষীরশাপাতি, গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, হাঁড়িভাঙা। প্রতিটি জাতের মুকুলের গন্ধ একটু একটু আলাদা হতে পারে।

কিছু গন্ধ বেশি মিষ্টি, কিছু একটু তীব্র, আবার কিছুতে হালকা টক ভাবও থাকে। এটা নির্ভর করে সেই গাছের জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর।

আরও পড়ুন

প্রকৃতির এক চমৎকার খেলা

সব মিলিয়ে, আমের মুকুলের গন্ধ আসলে প্রকৃতির এক অসাধারণ কৌশল। গাছ নিজের প্রয়োজনেই এই গন্ধ তৈরি করে—পোকামাকড় ডাকার জন্য, যাতে ফল হয়, নতুন জীবন জন্ম নেয়।

আর আমরা মানুষেরা? আমরা সেই গন্ধে খুঁজে পাই বসন্তের আগমনী বার্তা, গ্রাম-মফস্‌সলের স্মৃতি কিংবা ছেলেবেলার কোনো বিকেল।

আমের মুকুলের মনমাতানো গন্ধ তাই শুধু একটা সুগন্ধ নয়, এটা প্রকৃতির এক সুন্দর ভাষা। গাছ, পোকামাকড় আর বাতাস—তিনে মিলে তৈরি করে এক মায়াবী অনুভূতি। রচনা করে প্রকৃতির এক চমৎকার গল্প।

তথ্যসূত্র: স্কুলাম ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন