যেসব মহাজাগতিক ঘটনা এই শতাব্দীতেই ঘটবে
মহাকাশপ্রেমীরা বছরের শুরুতে সাধারণত খুঁজে দেখেন, এই বছর কী কী মহাজাগতিক ঘটনা আছে। হয়তো একটি সূর্যগ্রহণ, কয়েকটি উল্কাবৃষ্টি, কিংবা হঠাৎ উদয় হওয়া কোনো ধূমকেতুর খবর জানা যায়। কিন্তু আজ আমরা একটু অন্য পথে হাঁটব। এক বছরের জন্য নয়, এসো পুরো একটা শতাব্দীর ক্যালেন্ডার খুলে বসি!
আজ আমরা বেটেলজিউস নক্ষত্রের বিস্ফোরণের কথা বলব না। কারণ, ওটা হতে এখনো প্রায় এক লাখ বছর লাগতে পারে। তত দিন তো আর আমরা বেঁচে থাকব না! তাই এমন কিছু ঘটনা নিয়ে কথা বলা যাক, যেগুলো এই শতাব্দীতেই ঘটবে। অর্থাৎ তোমরা যারা এখন এই লেখাটা পড়ছ, তোমাদের জীবদ্দশাতেই এই মহাজাগতিক খেলা দেখার সৌভাগ্য হতে পারে।
১. অ্যাপোফিসের হানা
প্রথম ধামাকাদার ঘটনাটির জন্য তোমাকে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। ক্যালেন্ডারে এখনই দাগ দিয়ে রাখতে পারো ২০২৯ সালের ১৩ এপ্রিল।
সেদিন ‘৯৯৯৪২ অ্যাপোফিস’ নামে এক বিশাল গ্রহাণু পৃথিবীর খুব কাছ দিয়ে উড়ে যাবে। কতটা কাছে জানো? পৃথিবী থেকে মাত্র ৩২ হাজার কিলোমিটার দূর দিয়ে! এটা চাঁদের দূরত্বের দশ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। এটা প্রথম আবিষ্কার হলে বিজ্ঞানীরা ভয় পেয়েছিলেন। পৃথিবীর বুকে আবার আছড়ে পড়বে না তো? ৩৭০ মিটার চওড়া এই পাথরটি পৃথিবীতে পড়লে ডাইনোসরদের মতো অবস্থা না হলেও বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ হতো। তবে স্বস্তির খবর হলো, বিজ্ঞানীরা অঙ্ক কষে নিশ্চিত করেছেন, এই শতাব্দীতে অন্তত এর ধাক্কা লাগার কোনো ভয় নেই।
মহাকাশপ্রেমীদের জন্য সুখবর হলো, এটি দেখার জন্য তোমার কোনো টেলিস্কোপ লাগবে না। শহরের আলো থেকে একটু দূরে গেলে খালি চোখে এই মহাজাগতিক পাথরটিকে দেখা যাবে। এমন ঘটনা নাকি ৮০০ বছরে একবার ঘটে!
২. হ্যালির ধূমকেতুর রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
তোমার বাবা বা চাচাদের জিজ্ঞাসা করলে হয়তো শুনবে, ১৯৮৬ সালে হ্যালির ধূমকেতু আসার পর তাঁরা বেশ হতাশ হয়েছিলেন। কারণ, সেবার পৃথিবী থেকে ধূমকেতুটিকে খুব স্পষ্ট দেখা যায়নি। অনেক মিডিয়া হাইপ তুললেও বাস্তবে সেটা ছিল একটা ফ্লপ শো।
কিন্তু ২০৬১ সালে হ্যালির ধূমকেতু যখন আবার ফিরবে, তখন গল্পটা হবে অন্য রকম। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এবার এটি গতবারের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি উজ্জ্বল হয়ে দেখা দেবে! শুধু তা–ই নয়, ধূমকেতুটি শুক্র গ্রহের খুব কাছ দিয়ে যাবে বলে আকাশে এক মায়াবী দৃশ্যের অবতারণা হবে। ফেসবুকে এখনই অনেকে ইভেন্ট খুলে বসে আছে, ‘২০৬১ সালে হ্যালির ধূমকেতু দেখব’। ব্যাপারটা ফাজলামি মনে হলেও অনেকেই ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দিন গুনছেন। তুমিও কি আছ সেই দলে?
৩. ভি স্যাজিটা: আকাশে নতুন তারার জন্ম
মহাকাশে তারার বিস্ফোরণ বা সুপারনোভা দেখার জন্য আমরা চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকি। তবে বেটেলজিউস ফাটতে অনেক দেরি। তার আগেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ‘ভি স্যাজিটা’।
এটি স্যাজিটা নক্ষত্রমণ্ডলীতে অবস্থিত একটি অদ্ভুত তারার সিস্টেম। এখানে একটি সাধারণ নক্ষত্র ও একটি শ্বেত বামন একে অপরকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই শতাব্দীর শেষের দিকে, সম্ভবত ২০৮৩ সালের আশেপাশে এই দুটো তারা মিশে গিয়ে এক প্রলয়ংকরী কাণ্ড ঘটাবে।
এরা একে অপরের এত কাছে চলে আসছে যে বিস্ফোরণ ঘটলে আকাশে মনে হবে নতুন এক তারার জন্ম হয়েছে। লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ব্র্যাডলি শেফারের মতে, এটি তখন আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা লুব্ধকের মতোই জ্বলজ্বল করবে। কয়েক সপ্তাহ বা মাসজুড়ে আকাশে এই নতুন অতিথিকে দেখা যাবে!
৪. মহাজাগতিক কোলাকুলি
আকাশের দুটি গ্রহ যখন একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে আসে, তখন তাকে বলে ‘কনজাংশন’। সেই দুটি গ্রহ যদি হয় সৌরজগতের দুই দানব শনি ও বৃহস্পতি, তবে তাকে বলে ‘গ্রেট কনজাংশন’।
২০২০ সালে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু সেবার গ্রহ দুটো সূর্যের খুব কাছাকাছি ছিল বলে বেশিক্ষণ দেখা যায়নি। অনেকে তো মিসই করেছেন। কিন্তু মন খারাপের কিছু নেই। ২০৮০ সালের মার্চ মাসে যে গ্রেট কনজাংশন হতে যাচ্ছে, তা হবে দেখার মতো! সেবার শনি ও বৃহস্পতি একে অপরের এতটাই কাছে আসবে যে টেলিস্কোপে চোখ রাখলে একই ফ্রেমে দুটি গ্রহকে দেখা যাবে। যেহেতু সূর্য থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকবে, তাই পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকেই এই মহাজাগতিক কোলাকুলি দেখা যাবে। তার আগে ২০৪০ সালেও এরা কাছে আসবে, সঙ্গে যোগ দেবে অন্য গ্রহরা। আকাশে তখন রীতিমতো তারার মেলা বসবে!
৫. আরও সারপ্রাইজ
এগুলো তো গেল জানা ঘটনার তালিকা। কিন্তু মহাকাশ মানেই অনিশ্চয়তা। হয়তো এমন কোনো ধূমকেতু আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে, যার খবর আমরা এখনো জানি না। কিংবা হঠাৎ করেই কোনো উল্কাবৃষ্টি আকাশকে আলোর ঝরনায় ভাসিয়ে দিতে পারে। এমনকি ২০৩২ সালে ‘২০২৪ ওয়াইআর৪’ নামের একটি গ্রহাণু চাঁদে আঘাত হানতে পারে বলেও গুঞ্জন আছে। অবশ্য সম্ভাবনা খুব কম।
সব মিলিয়ে, আগামী কয়েক দশক মহাকাশপ্রেমীদের জন্য দারুণ রোমাঞ্চকর হতে যাচ্ছে। তাই চোখ খোলা রেখো। হতে পারে আজ রাতেই অদ্ভুত সুন্দর কিছু তোমার নজরে পড়বে!
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স