প্রথম ফোনালাপের গল্প

নিজের তৈরি টেলিফোন ব্যবহার করে নিউইয়র্ক থেকে শিকাগোতে কল করছেন আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলসূত্র: অ্যালামি

টুংটাং করে বেজে উঠল অদ্ভুত এক যন্ত্র। স্বামীর তৈরি নতুন যন্ত্রের আওয়াজ শুনে স্ত্রী কৌতূহল নিয়ে রিসিভারটা কানে তুললেন। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল চেনা কণ্ঠস্বর আর একটিমাত্র শব্দ, ‘হ্যালো?’

প্রচলিত আছে, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিষ্কার করে প্রথম কলটি করেছিলেন তাঁর স্ত্রীকে। বলা হয়, তাঁর স্ত্রীর নামই নাকি ছিল ‘হ্যালো’। আর সেখান থেকেই ফোনে হ্যালো বলার চল শুরু হয়েছে। যুগে যুগে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে এই মিষ্টি গল্প।

মজার ব্যাপার হলো, এই পুরো গল্পটাই ডাহা মিথ্যে! প্রথমত, গ্রাহাম বেলের স্ত্রীর নাম হ্যালো ছিল না। তাঁর নাম ছিল মেবেল গার্ডিনার হাবার্ড। তিনি কানে শুনতেও পেতেন না। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্কারলেট জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শ্রবণশক্তি হারিয়েছিলেন মেবেল। গ্রাহাম বেলের মা-ও ছিলেন শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তা ছাড়া ফোনে কথা শুরুর আগে ‘হ্যালো’ বলার পক্ষেই ছিলেন না গ্রাহাম বেল। তিনি নাবিকদের মতো ‘আহয়’ (Ahoy) বলে অভিবাদন জানানোর প্রস্তাব করেছিলেন। অন্যদিকে ‘হ্যালো’ শব্দটি আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। টেলিফোনে হ্যালো শব্দের ব্যবহার জনপ্রিয় করেছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী, টমাস আলভা এডিসন।

প্রথম ফোনালাপের এই গল্পটা যে নিছকই গুজব, সেটা তো বোঝা গেল। তাহলে আসল ঘটনাটি কী ছিল? কে কাকে প্রথম ফোন করেছিল, আর কী-ই বা বলেছিল? চলো, আজ সেই সত্যি গল্পটাই জেনে আসি।

আরও পড়ুন

দৌড়ে শুরু

টেলিফোন আবিষ্কারের আগে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল টেলিগ্রাফ। তখন বৈদ্যুতিক তারের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বার্তা পাঠানো যেত। কিন্তু মুশকিল হলো, টেলিগ্রাফের তার দিয়ে একবারে কেবল একটি বার্তাই পাঠানো সম্ভব হতো। তাই তথ্য আদান-প্রদানে অনেক সময় লেগে যেত। এই সমস্যার সমাধান খুঁজছিলেন আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। তিনি এমন একটি ‘ডায়নামিক টেলিগ্রাফ’ তৈরির চেষ্টা করছিলেন, যা দিয়ে একই সঙ্গে একাধিক বার্তা পাঠানো যাবে। ঠিক একই সময়ে আমেরিকান প্রকৌশলী এলিশা গ্রে-ও অবিকল একই রকম একটি যন্ত্র বানানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

১৮৭৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এলিশা গ্রে ও গ্রাহাম বেল দুজনেই তাঁদের যন্ত্রটির পেটেন্ট বা স্বত্ব পাওয়ার আবেদন নিয়ে সরকারের কাছে পৌঁছান। দুজনের আবেদনের মধ্যে পার্থক্য ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার। স্কটল্যান্ড বংশোদ্ভূত গ্রাহাম বেল তখন বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোকাল ফিজিওলজির অধ্যাপক। তিনি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত ওয়াশিংটন ডিসির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একই বছরের ৭ মার্চ পেটেন্টটি নিজের নামে করে নেন বেল। তাঁর পেটেন্ট নম্বর ছিল ইউএস১৭৪৪৬৫এ (US174465A)। অন্যদিকে এলিশা গ্রে হতাশ হয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তবে তাতে কোনো লাভ হয়নি। পেটেন্ট হাতে পেয়ে গ্রাহাম বেল পুরোদমে কাজে নেমে পড়েন।

আরও পড়ুন

যেভাবে স্বপ্ন হলো সত্যি

বৈদ্যুতিক তারে মানুষের গলার স্বর কীভাবে পাঠানো যাবে? এটাই ছিল গ্রাহাম বেলের প্রধান চিন্তা। তাঁর যন্ত্রটিকে মূলত দুটি কাজ করতে হতো। প্রথমত, গলার স্বরের কম্পনকে বৈদ্যুতিক তরঙ্গে রূপান্তর করা। দ্বিতীয়ত, সেই তরঙ্গ নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোর পর আবার আসল শব্দে ফিরিয়ে আনা। এই সমস্যার সমাধানে বেলের মাথায় আসে দারুণ এক বুদ্ধি। আর এই বুদ্ধি খাটিয়েই তিনি পেটেন্ট পেয়েছিলেন। বুদ্ধিটা হলো একটা ‘ড্রাম’।

১৮৭৬ সালে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের নিজের হাতে আঁকা টেলিফোন
সূত্র: লাইব্রেরি অব কংগ্রেস

বেলের সেই ড্রামে এক টুকরা পার্চমেন্ট কাগজ টান টান করে বাঁধা থাকত। কাগজের সঙ্গে যুক্ত থাকত ছোট্ট একটি চুম্বকীয় লোহা। কেউ কথা বললেই ড্রামটি সচল হয়ে উঠত। কথার শব্দে কাগজের পর্দা কেঁপে উঠত। তখন সঙ্গে থাকা লোহাটি নড়ে গিয়ে তৈরি করত বৈদ্যুতিক তরঙ্গ। এরপর সেই তরঙ্গ তারের ভেতর দিয়ে ছুটে যেত অন্য জায়গায়।

১৮৭৬ সালের ১০ মার্চ বেল পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো ফোনালাপ করেন। তবে সেদিন কিন্তু এই ড্রামের বুদ্ধি কাজে লাগানো হয়নি। বার্তা পাঠাতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন একধরনের পরিবাহী, অম্লীয় তরল। এই তরল ব্যবহারের বুদ্ধিটা এলিশা গ্রের প্রস্তাবিত যন্ত্রের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে গিয়েছিল! এ কারণেই টেলিফোনের আসল আবিষ্কারক কে, তা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়ে গেছে।

যদিও এমন তরল ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে যন্ত্র বানানো ছিল বেশ ঝামেলার কাজ। তাই পরে বেলের সেই ড্রাম নকশার তৈরি টেলিফোনই জনপ্রিয় হয়েছিল। সহজে বানানো না গেলে হয়তো টেলিফোন এত দ্রুত মানুষের ঘরে ঘরে ছড়িয়েও পড়ত না।

আরও পড়ুন

প্রথম ৯ শব্দ

‘মিস্টার ওয়াটসন, এদিকে আসুন। আমি আপনাকে দেখতে চাই। (মিস্টার ওয়াটসন, কাম হেয়ার। আই ওয়ান্ট টু সি ইউ।)’ এই ৯টি শব্দই প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক তার দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল বস্টনের একটি গবেষণাগারে। কথাগুলো গ্রাহাম বেল বলেছিলেন তাঁর সহকারী টমাস ওয়াটসনকে। তখন বেলের পাশের ঘরেই ছিলেন ওয়াটসন। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে কথা যাওয়ার এই ঘটনা যে কতটা যুগান্তকারী ছিল, তা আজ আমরা বেশ বুঝতে পারি। কিন্তু তখন ব্যাপারটা ছিল নিছকই এক জাদুর খেলার মতো।

আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের তৈরি টেলিফোনের সেই ড্রাম নকশা। এতে পার্চমেন্ট কাগজ ড্রামের মতো টান টান করে বেঁধে ট্রান্সমিটার তৈরি করা হয়েছিল
সূত্র: শাটারস্টক

গ্রাহাম বেল ছাড়া অন্য কারও কাছে তখন টেলিফোন ছিল না। তাই সবাই মজা করে বেলকে জিজ্ঞেস করত, ‘কলটা কাকে করবে?’ আসলেই তো! টেলিগ্রাফকে টেক্কা দিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে টেলিফোনের তখনো বেশ কিছুটা সময় বাকি।

১৮৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় বসেছিল ‘সেন্টেনিয়াল এক্সপোজিশন’। সেখানে নিজের টেলিফোনটি নিয়ে হাজির হন বেল। তবে উপস্থিত দর্শকেরা যন্ত্রটিকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি। অবশ্য ব্রাজিলের তৎকালীন সম্রাট টেলিফোন দেখে কিছুটা চমকে উঠেছিলেন। তিনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘মাই গড, ইট টকস’ (হায় ঈশ্বর, এটা তো কথা বলে)!

দর্শকেরা পাত্তা না দিলেও, এই প্রদর্শনীতেই গ্রাহাম বেলকে একটি মেডেল দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। ওই প্রদর্শনীর দুই বিচারক বিজ্ঞানী জোসেফ হেনরি ও উইলিয়াম টমসন (যিনি পরে লর্ড কেলভিন নামে পরিচিত হন) ঠিকই টেলিফোনের আসল চমকটি ধরতে পেরেছিলেন। এরপর সেই মেডেল নিয়ে বেল ফিরে যান যুক্তরাজ্যে। আর নিজের আবিষ্কারকে মানুষের মাঝে জনপ্রিয় করার চেষ্টা শুরু করেন।

আরও পড়ুন

আবিষ্কারের শো

টেলিফোন শুধুই মজার খেলনা নয়, দারুণ কাজের একটা জিনিস। গ্রাহাম বেল এ কথা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি টেলিফোন নিয়ে নানা প্রদর্শনী বা ‘শো’ শুরু করেন। সময়টা ১৮৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি। ম্যাসাচুসেটসের সালেম শহরের এক শো থেকে বেল কল করলেন। তিনি ফোন করেছিলেন নিজের সহকারীকে। এবার অনেক দূরে ছিলেন ওয়াটসন, বস্টন শহরে। টেলিফোনের ওপার থেকে ওয়াটসন বাজিয়ে শোনালেন ‘ওল্ড ল্যাং সাইন’ আর ‘ইয়াংকি ডুডল’–এর মতো কিছু গান। এমন জাদুর মতো কাণ্ড দেখে তো দর্শকেরা অবাক। সবার হাততালি আর উল্লাসে মুখর হয়ে উঠল চারপাশ।

পরবর্তী সময়ে বেল লন্ডনে ‘টেলিফোনিক কনসার্ট’–এর আয়োজন শুরু করেন। এসব কনসার্টে দুটি থিয়েটারের মধ্যে টেলিফোনের সংযোগ দেওয়া হতো। এক ভবনে বসে মানুষ অনায়াসে অন্য ভবনে বাজানো গান উপভোগ করত। এতসব প্রচারণার জন্য বেলের প্রচুর টাকার দরকার ছিল। টাকার বড় একটা জোগান দিয়েছিলেন তাঁর হবু শ্বশুর, গার্ডিনার গ্রিন হাবার্ড। তিনি ছিলেন বিত্তবান উকিল ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা। ওই ১৮৭৭ সালেই তাঁরা একসঙ্গে গড়ে তোলেন ‘বেল টেলিফোন কোম্পানি’। সেখানেই তৈরি হতে থাকে টেলিফোনের নানা যন্ত্রপাতি।

১৮৯৮ সালে কানাডায় ছুটিতে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল ও তাঁর স্ত্রী মেবেল হাবার্ড বেল
সূত্র: শাটারস্টক

১৮৭৯ সালের মধ্যে বেল টেলিফোন কোম্পানি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। আন্তর্জাতিকভাবে এটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। দিন দিন টেলিফোন তুমুল জনপ্রিয় হতে থাকে। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে এর উৎপাদন। দেখতে দেখতে ১৮৮৫ সালে বেলের কোম্পানিটি নতুন রূপ নেয়। এর নাম হয় ‘আমেরিকান টেলিফোন অ্যান্ড টেলিগ্রাফ কোম্পানি’। নামটা চেনা চেনা লাগছে? ঠিক ধরেছ, তোমরা হয়তো এই কোম্পানিকে ‘এটিঅ্যান্ডটি’ (AT&T) নামেই বেশি চেনো।

বিশ শতকের শুরুতেই গ্রাহাম বেল ও তাঁর সহযোগীরা সফলতার মুখ দেখেন। টেলিফোনের পেছনে তাঁদের মেধা আর বিনিয়োগ কোনোটাই বিফলে যায়নি। ধীরে ধীরে সারা বিশ্বের প্রতিটি ঘরে আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে গেছে এই আশ্চর্য যন্ত্র। ফোনালাপের মতো এক সহজ জাদুর হাত ধরেই পৃথিবী পা রেখেছিল যোগাযোগের এক নতুন আঙিনায়।

তথ্যসূত্র: দ্য কনভার্সেশন

আরও পড়ুন