ডাইনোসর যেভাবে পৃথিবী জয় করেছিল
বিশাল ফার্নগাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে আছে একটি ছোট্ট প্রাণী। ভয়ে বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে প্রাণীটার। কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করছে ভারী পায়ের আওয়াজটা কোন দিক থেকে আসছে। একটু দূরেই লতাগুল্মের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এক ভয়ংকর দানব। লম্বায় ২০ ফুটের কাছাকাছি। পিঠের ওপর শক্ত বর্ম, চোয়ালে করাতের মতো ধারালো দাঁত। দানবটা একবার জোরে নিশ্বাস ফেলল, যেন বাতাসে শিকারের গন্ধ খুঁজছে। ছোট্ট প্রাণীটি নিশ্বাস বন্ধ করে মাটির সঙ্গে নিজেকে একেবারে মিশিয়ে ফেলল। সে জানে, এই দানবের চোখে পড়লে আর রক্ষা নেই। এক কামড়েই তাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। কিছুক্ষণ পর ভারী পায়ের আওয়াজটা মিলিয়ে গেল দূরে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল ছোট্ট প্রাণীটা!
কী ভাবছ? ওই ভয়ংকর দানবটা নিশ্চয়ই টি-রেক্স বা ওই জাতীয় কোনো ডাইনোসর? আর ভয়ে লুকিয়ে থাকা প্রাণীটা হয়তো অন্য কোনো নিরীহ জীব? একেবারেই না! গল্পটা আসলে উল্টো। ওই যে ২০ ফুট লম্বা বিশাল দানবটা, ওটা কোনো ডাইনোসর নয়। ওটা হলো কুমিরের এক প্রাচীন পূর্বপুরুষ। আর ভয়ে কাঁপতে থাকা ওই ছোট্ট, দুর্বল প্রাণীটা? হ্যাঁ, ওটাই হলো ডাইনোসর!
আজ থেকে প্রায় ২৩ কোটি বছর আগের পৃথিবীর দৃশ্যটা ঠিক এমনই ছিল। ডাইনোসররা তখন মোটেও পৃথিবীর রাজা ছিল না। তারা ছিল দুর্বল, ভিতু ও অবহেলিত একদল প্রাণী। বড় শিকারিদের ভয়ে ওরা সারা দিন লুকিয়ে বেড়াত। তাহলে সেই ভিতু প্রাণীরা কীভাবে পুরো পৃথিবী দখল করে বসল? কীভাবে তারা হয়ে উঠল মেসোজোয়িক যুগের সবচেয়ে বড় শিকারি? চলো, আজ সেই রোমাঞ্চকর গল্পটাই শোনা যাক।
দুই
পৃথিবীর ইতিহাসকে বিজ্ঞানীরা অনেকগুলো যুগে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে ২৫ কোটি বছর আগে থেকে শুরু করে সাড়ে ৬ কোটি বছর আগের সময়টাকে বলা হয় মেসোজোয়িক এরা বা মেসোজোয়িক মহাযুগ। এই বিশাল সময়টাকে আবার তিনটি ছোট ভাগে ভাগ করা হয়েছে—ট্রায়াসিক, জুরাসিক ও ক্রিটেসিয়াস।
মেসোজোয়িক যুগকে আমরা সবাই ডাইনোসরদের যুগ নামেই চিনি। আমাদের ধারণা, ডাইনোসররা তাদের বিশাল আকার, গায়ের জোর এবং ভয়ংকর রূপ দিয়ে পৃথিবীর অন্য সব প্রাণীকে হারিয়ে পৃথিবীতে রাজত্ব কায়েম করেছিল। কিন্তু গত ৫০ বছরের জীবাশ্ম গবেষণা আমাদের এই ধারণাকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন প্রমাণ পেয়েছেন, গায়ের জোর বা বুদ্ধির জোরে নয়, ডাইনোসররা পৃথিবী জয় করেছিল নেহাতই ভাগ্যের জোরে! বলতে পারো, এটা ছিল প্রকৃতির একটা বিশাল কাকতালীয় ব্যাপার।
গল্পটা শুরু করার আগে সে আমলের পৃথিবীর একটা ছবি তোমার চোখের সামনে ভাসিয়ে তোলা দরকার। ট্রায়াসিক যুগে পৃথিবীর মানচিত্রটা আজকের মতো ছিল না। এখনকার মতো আলাদা আলাদা মহাদেশও ছিল না তখন। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, অ্যান্টার্কটিকাসহ সব কটি মহাদেশ একসঙ্গে জোড়া লেগে ছিল। এই বিশাল অখণ্ড মহাদেশের নাম ছিল প্যানজিয়া। এই অখণ্ড মহাদেশের মাঝখানটা ছিল বিশাল এক মরুভূমি। চরম শুষ্ক ও প্রচণ্ড গরম। উপকূলের দিকটায় হতো ভয়ংকর সামুদ্রিক ঝড়। এই রুক্ষ ও কঠিন পৃথিবীতেই চলছিল টিকে থাকার এক নির্দয় লড়াই।
ট্রায়াসিক যুগের ডাইনোসরদের নিয়ে কথা বলার আগে সে সময়কার আসল রাজাদের চিনে নেওয়া যাক। সে যুগে ডাইনোসররা মোটেও একা ছিল না। আর্কোসর নামে এক বিশাল সরীসৃপ গোষ্ঠীর একটা ছোট অংশ ছিল ডাইনোসর। ট্রায়াসিক যুগের শুরুর দিকে আর্কোসররা দুটি প্রধান ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটা ভাগ থেকে জন্ম নেয় ডাইনোসর এবং কালক্রমে আজকের যুগের পাখি। এদের বলা হয় বার্ড-লাইন আর্কোসর। আর অন্য ভাগটা থেকে জন্ম নেয় প্রাচীন কুমির এবং তাদের আত্মীয়স্বজন। এদের বলা হয় ক্রোক-লাইন আর্কোসর।
এই ক্রোক-লাইন আর্কোসররাই ছিল ট্রায়াসিক যুগের আসল রাজা! এদের মধ্যে রাউইসুচিয়ান বা ফাইটোজরের মতো ভয়ংকর সব শিকারি প্রাণী ছিল। এরা লম্বায় ১৬ ফুট বা তার চেয়েও বড় হতো। এদের হাঁটার ধরন ছিল ডাইনোসরদের মতোই সোজা, চার পায়ে পিলারের মতো ভর দিয়ে হাঁটত। এদের চোয়াল ছিল বিশাল, কামড়ের জোর ছিল ভয়ংকর। সে যুগের যেকোনো ডাইনোসরকে একনিমেষেই ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখত এরা। মজার ব্যাপার হলো, ৫ কোটি বছর পর জুরাসিক বা ক্রিটেসিয়াস যুগে ডাইনোসররা দেখতে যেমন ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল, ট্রায়াসিক যুগে কুমিরের এই পূর্বপুরুষেরা ঠিক তেমনই দেখতে ছিল।
অন্যদিকে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পূর্বপুরুষেরাও তখন পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের বলা হতো সিনাপসিড। এদের মধ্যে যেমন লোমশ বা ইঁদুরের মতো ছোট প্রাণী ছিল, তেমনি শূকরের সমান বড়, দাঁতওয়ালা নিরামিষাশী প্রাণীও ছিল। বিংশ শতাব্দীর বেশির ভাগ সময়জুড়ে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, ডাইনোসররা বোধ হয় এই ক্রোক-লাইন আর্কোসর এবং সিনাপসিডদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ছিল। বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, ট্রায়াসিক যুগের বিশাল সমভূমিতে এই প্রাণীদের মধ্যে টিকে থাকার ভয়ংকর যুদ্ধ হয়েছিল। আর সেই যুদ্ধে লম্বা পা, খাড়া হয়ে দৌড়ানোর ক্ষমতা ও ক্ষিপ্রতার জোরে ডাইনোসররা জিতে গিয়েছিল। হেরে গিয়ে কুমিরের পূর্বপুরুষেরা বাধ্য হয়ে ডাঙার রাজত্ব ছেড়ে নদী ও জলাভূমিতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল।
কিন্তু নতুন নতুন জীবাশ্ম আবিষ্কার আমাদের দেখাচ্ছে, এই ধারণাটা একেবারেই ভুল! অন্য আর্কোসর বা সিনাপসিডদের চেয়ে ডাইনোসররা বিশেষ কোনো দিক থেকেই আলাদা বা উন্নত ছিল না।
তিন
ডাইনোসরদের এই শুরুর দিকের ইতিহাস জানাটা বিজ্ঞানীদের জন্য কখনোই সহজ ছিল না। ১৮০০-এর দশক থেকেই বিজ্ঞানীরা মেসোজোয়িক যুগের শুরুর দিককার অনেক প্রাণীর জীবাশ্ম পাচ্ছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে সিলোফাইসিস নামে দুই পায়ে হাঁটা শিকারি ডাইনোসর কিংবা লম্বা গলাওয়ালা নিরামিষাশী প্লাটিওসরাসের যেসব ফসিল পাওয়া যেত, সেগুলো মূলত ট্রায়াসিক যুগের একেবারে শেষভাগের। এদের বয়স প্রায় ২১ কোটি বছর। এই প্রাণীগুলো বেশ বড়সড় ছিল, লম্বায় ৩ মিটার বা তার চেয়েও বেশি। এদের মাথার খুলির গঠন এতটাই উন্নত ছিল যে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারতেন, এরা ডাইনোসর পরিবারের বেশ পরের দিকের সদস্য। কিন্তু এদের চেয়েও পুরোনো, আরও আদিম ডাইনোসরদের জীবাশ্ম না পাওয়ায় ডাইনোসরদের বিবর্তনের শুরুর গল্পটা অজানাই থেকে যাচ্ছিল।
অবশেষে ১৯৬৩ সালে একটা যুগান্তকারী আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন এক দরজা খুলে দিল। আর্জেন্টিনার উত্তর-পশ্চিমে ইসচিগুয়ালাস্তো নামের এক রুক্ষ উপত্যকা আছে। এই জায়গাকে স্থানীয়রা বলে ভ্যালি অব দ্য মুন। বাংলায় আমরা একে চাঁদের উপত্যকা বলতে পারি। এখানকার পাথরগুলো দেখতে সত্যিই চাঁদের মাটির মতো। এই উপত্যকায় আর্জেন্টিনার বিখ্যাত জীবাশ্মবিদ ওসভালদো রেইগ এবং তাঁর দল একটি আশ্চর্য পুরোনো ডাইনোসরের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেলেন।
ভিক্টোরিনো হেরেরা নামের এক স্থানীয় কৃষক সবার আগে এই ফসিলগুলো দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর নামানুসারেই ড. রেইগ এই ডাইনোসরটির নাম রাখলেন হেরেরাসরাস। এই জীবাশ্মগুলোর বয়স ছিল প্রায় ২৩ কোটি বছর! অর্থাৎ এগুলো ট্রায়াসিক যুগের একেবারে শুরুর দিকের। ড. রেইগ ফসিলের দাঁত ও হাড় দেখে বুঝতে পেরেছিলেন, হেরেরাসরাস একধরনের শিকারি প্রাণী ছিল। কিন্তু ফসিলগুলো এতটাই ভাঙাচোরা ছিল যে প্রাণীটি দেখতে ঠিক কেমন ছিল বা তার জীবনযাপন কেমন ছিল, সে সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না।
এই রহস্যের জট খোলে আরও ২৫ বছর পর। ১৯৮৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর বিজ্ঞানী পল সেরেনো এবং তাঁর দল ওই একই জায়গায় নতুন করে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেন। তাঁরা আরও উন্নত এবং প্রায় আস্ত কিছু হেরেরাসরাসের ফসিল খুঁজে পান।
এই নতুন ফসিলগুলোর কল্যাণে আমরা জানতে পারি, হেরেরাসরাস দুই পায়ে হাঁটত। এদের মুখের সামনের দিকটা ছিল সরু। দাঁতগুলো ছিল লম্বা এবং ভেতরের দিকে বাঁকানো। এই বাঁকানো দাঁতের কারণে শিকার একবার মুখে পড়লে আর কোনোভাবেই ফসকে যেতে পারত না। এদের সামনের হাত দুটিতে পাঁচটি করে আঙুল থাকলেও ভেতরের তিনটি আঙুলে বড় ও ধারালো নখ ছিল। এই নখের সাহায্যে ওরা শিকারকে আঁচড়ে ফালা ফালা করে দিতে পারত।
হেরেরাসরাস লম্বায় ছিল প্রায় ১৫ ফুট। মানে একটা বড়সড় প্রাইভেট কারের সমান! এদের ওজন ছিল প্রায় ২০০ কেজি। এখন পর্যন্ত জানামতে, হেরেরাসরাসই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন বড় ডাইনোসর। জুরাসিক বা ক্রিটেসিয়াস যুগের বিশাল সব ডাইনোসরের তুলনায় ১৫ ফুটের ডাইনোসর হয়তো তেমন কিছুই নয়। কিন্তু ট্রায়াসিক যুগের শুরুর দিকের অন্য ডাইনোসরদের তুলনায় এটি ছিল রীতিমতো এক দৈত্য!
এর কয়েক বছর পর, ১৯৯১ সালে ড. সেরেনো এবং তাঁর দল ইসচিগুয়ালাস্তো উপত্যকায় আরেকটি নতুন ডাইনোসর আবিষ্কার করেন। এর নাম দেওয়া হয় ইওর্যাপ্টর। এরা ছিল ট্রায়াসিক যুগের সাধারণ ডাইনোসর। লম্বায় এটি ৬ ফুটের কম ছিল। এর শরীরের গড়ন ছিল খুব হালকা-পাতলা। এর দাঁতগুলো পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এটি শুধু মাংস নয়, লতাপাতাও খেত। অর্থাৎ এরা ছিল সর্বভুক।
ইওর্যাপ্টরের মতো আরও বেশ কয়েকটি সমসাময়িক ছোট ডাইনোসরের ফসিল এখন বিজ্ঞানীদের হাতে আছে। এদের সবার বৈশিষ্ট্যই প্রায় এক। এরা সবাই খুব ছোট, হালকা-পাতলা এবং লাজুক স্বভাবের প্রাণী ছিল। এরা বিশাল আর্কোসরদের ভয়ে জঙ্গলের ঝোপঝাড়ের নিচে লুকিয়ে খাবার খুঁজত এবং লোকচক্ষুর আড়ালেই জীবন কাটাত। বিজ্ঞানীরা এখন নিশ্চিত, বিশাল কোনো বীরযোদ্ধা নয় বরং ছোট, নিরীহ এবং আত্মগোপনে থাকাই ছিল প্রথম দিককার বেশির ভাগ ডাইনোসরের জীবনযাপনের ধরন।
চার
যেমনটা আগে বলেছিলাম, বিজ্ঞানীদের একটা দীর্ঘস্থায়ী ধারণা ছিল যে ডাইনোসররা তাদের প্রতিযোগীদের হারিয়ে দিয়ে পৃথিবী দখল করেছিল। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে কম্পিটিটিভ রিপ্লেসমেন্ট। অর্থাৎ প্রতিযোগিতামূলক প্রতিস্থাপন। কিন্তু ২০০৩ সালের পর থেকে ডাইনোসোরোমরফ নামে একদল প্রাণীর প্রচুর ফসিল আবিষ্কার হতে শুরু করে। এই ডাইনোসোরোমরফরাই হলো ডাইনোসরদের পূর্বপুরুষ। ট্রায়াসিক যুগে তারা ডাইনোসরদের পাশাপাশিই লাখ লাখ বছর বেঁচে ছিল।
এই নতুন ফসিলগুলো দেখে বিজ্ঞানীরা চমকে উঠলেন! তাঁরা দেখলেন, ডাইনোসররা তাদের এই পূর্বপুরুষদের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। এরাও দুই পায়ে হাঁটতে পারত। এরাও ক্ষিপ্র ছিল। তার মানে, ডাইনোসররা হঠাৎ করে জাদুর মতো এমন কোনো সুপারপাওয়ার বা শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে আসেনি, যা দিয়ে তারা রাতারাতি অন্য প্রাণীদের হারিয়ে দিতে পারে।
ডাইনোসরদের উত্থান ঘটেছিল খুব নীরবে, লোকচক্ষুর আড়ালে। ছোট ছোট শিকারি বা সর্বভুক প্রাণীদের ওই দলটির মধ্যে হঠাৎ করে শরীরের আকার বড় হয়ে যাওয়ার বা জীবনযাপনে বিশাল কোনো পরিবর্তন আসার কোনো প্রমাণই ফসিল রেকর্ডে নেই। নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করলে, জীবাশ্মের রেকর্ড ঘেঁটে এমন কিছুই পাওয়া যায় না, যা দেখে মনে হতে পারে ডাইনোসরদের পৃথিবীর রাজা হওয়াটা অবধারিত ছিল। সত্যি বলতে, ট্রায়াসিক যুগের পৃথিবীটা পুরোপুরি ক্রোক-লাইন আর্কোসরদের দখলেই ছিল।
তাহলে হঠাৎ কী এমন ঘটল? কীভাবে পেছনের সারিতে লুকিয়ে থাকা ছোট, লাজুক ডাইনোসররা রাতারাতি সারা পৃথিবীর সম্রাট হয়ে উঠল?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক ভয়ংকর খেয়ালের মধ্যে। ট্রায়াসিক যুগের শেষভাগে পৃথিবীতে একটি নয়, বরং পরপর দুটি বিশাল গণবিলুপ্তি ঘটেছিল। এই দুটি বিপর্যয় পৃথিবী থেকে বিশাল আকারের সিনাপসিড এবং ক্রোক-লাইন আর্কোসরদের চিরতরে মুছে দিয়েছিল। আর ফাঁকা হয়ে যাওয়া সেই পৃথিবীতে রাজত্ব করার সুযোগ পেয়েছিল ডাইনোসররা।
প্রথম গণবিলুপ্তিটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ২২ কোটি বছর আগে। এ সময়ে বড় আকারের সিনাপসিডরা, অর্থাৎ অনেক আদিম সরীসৃপ এবং সমুদ্রের অসংখ্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়।
কিন্তু কেন? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর পেছনে দায়ী ছিল ভয়ংকর জলবায়ু পরিবর্তন। প্যানজিয়া নামে সেই অখণ্ড মহাদেশের কথা মনে আছে? এ সময়ে প্যানজিয়া মহাদেশ মাঝখান থেকে ফাটতে শুরু করে। মহাদেশীয় প্লেটগুলোর এই নড়াচড়ার কারণে পৃথিবীর অনেক এলাকায় চরম শুষ্কতা দেখা দেয়। আবার বিজ্ঞানীদের আরেকটি দল মনে করেন, ২৩ কোটি ২০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে কার্নিয়ান প্লুভিয়াল এপিসোড নামে একটি ঘটনা ঘটেছিল। এ সময়ে টানা প্রায় ২০ লাখ বছর ধরে পৃথিবীতে অবিরাম বৃষ্টিপাত হয়! চরম শুষ্ক পৃথিবী হঠাৎ করে চরম আর্দ্র হয়ে ওঠে। বৃষ্টি থামার পর আবার চরম শুষ্ক হয়ে যায় পৃথিবী।
জলবায়ুর এই পাগলাটে আচরণের কারণে পৃথিবীর গাছপালা ও উদ্ভিদের ধরনে বিশাল পরিবর্তন আসে। নরম লতাপাতার বদলে শক্ত ও রুক্ষ গাছপালা জন্মাতে শুরু করে। বড় আকারের সিনাপসিড ও আর্কোসর, যারা নরম পাতা খেয়ে অভ্যস্ত ছিল, তারা না খেতে পেয়ে মারা যেতে শুরু করে। তৃণভোজীরা মারা যাওয়ায় বড় শিকারিরাও খাদ্যের অভাবে বিলুপ্ত হতে থাকে।
খাদ্যশৃঙ্খলের এই পতনে বড় প্রাণীরা মারা পড়লেও ডাইনোসররা বেঁচে গিয়েছিল। কারণ, তারা ছিল ছোট, তাদের খাবার লাগত কম। তা ছাড়া তারা ছিল সর্বভুক; পোকা থেকে শুরু করে লতাপাতা, যখন যা পেত তা-ই খেয়ে বেঁচে থাকতে পারত। এই প্রথম বিপর্যয়টি ডাইনোসরদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটা ছোট সুযোগ তৈরি করে দেয়।
তবে আসল চমকটা অপেক্ষা করছিল আরও ২ কোটি বছর পর।
আজ থেকে প্রায় ২০ কোটি বছর আগে, ট্রায়াসিক যুগের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে ঘটল দ্বিতীয় গণবিলুপ্তি। এটিকে বলা হয় এন্ড-ট্রায়াসিক মাস এক্সটিংশন। এটি পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর পাঁচটি গণবিলুপ্তির একটি। এই বিপর্যয় পৃথিবীর উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতে চোখের পলকে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে।
কী কারণে ঘটেছিল এই মহাপ্রলয়? বিজ্ঞানীরা এর পেছনে দুটি সম্ভাব্য কারণ খুঁজে পেয়েছেন।
প্রথম কারণটি হলো গ্রহাণুর আঘাত। সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে যেমন বিশাল গ্রহাণু আছড়ে পড়ে ডাইনোসরদের পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল, ট্রায়াসিক যুগের শেষেও ঠিক তেমনই একটি ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো কানাডার কুইবেক প্রদেশে অবস্থিত বিশাল ম্যানিকুয়াগান ক্রেটার। প্রায় ৫ কিলোমিটার চওড়া একটি গ্রহাণু আছড়ে পড়ার ফলে এই বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছিল। এত বড় একটি গ্রহাণুর আঘাত পুরো পৃথিবীর ইকোসিস্টেম ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। পশ্চিম কানাডা, ফ্রান্স, ইউক্রেন এবং উত্তর ডাকোটাতেও প্রায় একই সময়ের গর্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। তাই বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, সে সময় হয়তো একের পর এক গ্রহাণু পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছিল।
ম্যানিকুয়াগান ক্রেটারের বয়স পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটি হয়তো ২১ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু প্রমাণ বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে, ঠিক ২০ কোটি বছর আগেও আরেকটি বড় গ্রহাণু আঘাত হেনেছিল। এর একটি বড় প্রমাণ হলো ফসিল রেকর্ডে ফার্নগাছের হঠাৎ বৃদ্ধি। বিজ্ঞানীরা জানেন, যখন কোনো বিশাল বিপর্যয়ে পৃথিবীর অন্য সব গাছপালা ও বনভূমি ধ্বংস হয়ে যায়, তখন সেই পোড়া বা ধ্বংসপ্রাপ্ত মাটিতে সবার আগে জন্ম নেয় ফার্নগাছ। ট্রায়াসিক যুগের শেষের দিকের পাথরের স্তরে হঠাৎ করে ফার্নগাছের রেণুর আধিক্য প্রমাণ করে, তখন পৃথিবীর সব বনভূমি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় এবং আরও বেশি গ্রহণযোগ্য কারণটি হলো ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। এ সময়ে প্যানজিয়া মহাদেশের উত্তর অংশে, যাকে এখন সেন্ট্রাল আটলান্টিক ম্যাগমেটিক প্রভিন্স বা ক্যাম্প বলা হয়, সেখানে মাটি ফেটে লাখ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে লাভা বেরিয়ে আসতে শুরু করে। এই লাভা স্রোত কয়েক হাজার বছর ধরে চলেছিল। ফলে বাতাসে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং সালফার ডাই-অক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে।
শুরুতে বায়ুমণ্ডলে ধূলিকণা ও ছাইয়ের কারণে সূর্য ঢাকা পড়ে যায়। ফলে পৃথিবীতে নেমে আসে ভয়ংকর শীত। একে বলা হয় ইমপ্যাক্ট উইন্টার। এরপর ধোঁয়া সরে গেলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের কারণে তৈরি হয় চরম গ্রিনহাউস ইফেক্ট। পৃথিবী যেন একটা জ্বলন্ত চুল্লিতে পরিণত হয়। সমুদ্রের পানি হয়ে যায় অ্যাসিডিক।
এই চরম বিপর্যয়ে পৃথিবীর প্রায় ৭৬ শতাংশ প্রাণী চিরতরে হারিয়ে যায়। বিশাল আকারের সেই দাপুটে ক্রোক-লাইন আর্কোসররা, যারা ট্রায়াসিক যুগে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, তারা এই দুর্যোগের ধাক্কা সামলাতে পারল না। বড় শরীর টিকিয়ে রাখার মতো খাবার বা আশ্রয় কোনোটিই তারা পেল না।
পাঁচ
ধোঁয়া ও ধুলোর মেঘ যখন কেটে গেল, তখন পৃথিবী অদ্ভুত শান্ত। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। বড় প্রাণীদের কোনো অস্তিত্ব নেই। যারা এত দিন দাপটের সঙ্গে পৃথিবী শাসন করেছিল, তারা সবাই ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে গেছে।
কিন্তু পাথরের ফাটল, মাটির গর্ত ও ঝোপঝাড়ের নিচ থেকে উঁকি দিল কিছু ছোট ছোট মাথা। হ্যাঁ, আমাদের সেই লাজুক এবং ভিতু ডাইনোসররা!
ছোট আকারের কারণে প্রতিকূল পরিবেশেও তারা কোনোমতে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। তাদের বেঁচে থাকার জন্য খুব সামান্য খাবার ও অক্সিজেনের প্রয়োজন হতো। তা ছাড়া তারা দ্রুত দৌড়াতে পারত এবং যেকোনো পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারত। যখন তারা গর্ত থেকে বেরিয়ে দেখল, তাদের শিকার করার মতো আর কোনো বিশাল আর্কোসর পৃথিবীতে নেই, তখন তাদের আনন্দের আর সীমা রইল না!
ট্রায়াসিক যুগ শেষ হয়ে শুরু হলো জুরাসিক যুগ। ডাইনোসরদের সামনে এখন পুরো পৃথিবীটা ফাঁকা পড়ে আছে। খাবারের কোনো অভাব নেই, প্রতিযোগিতায় জেতার কোনো তাগিদ নেই। এই সুযোগে তারা দ্রুত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
ফসিল রেকর্ড বা পাথরের বুকে রেখে যাওয়া পায়ের ছাপগুলো এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ট্রায়াসিক যুগের শেষের দিককার পাথরের স্তরে ডাইনোসরদের পায়ের ছাপ যতটুকু পাওয়া যায়, বিপর্যয়ের ঠিক পরেই জুরাসিক যুগের শুরুর দিকের পাথরের স্তরে ডাইনোসরদের পায়ের ছাপের পরিমাণ অর্ধেকের বেশি বেড়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, এই ছাপগুলোর আকারও আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে!
এর মানে, প্রতিযোগী–শূন্য পৃথিবীতে ডাইনোসররা শুধু সংখ্যায়ই বাড়েনি, তারা শারীরিক আকার ও আকৃতিতেও বিশাল হতে শুরু করেছিল। খাদ্যশৃঙ্খলের একেবারে চূড়ায় বসে থাকা আর্কোসররা বিলুপ্ত হওয়ার পর ডাইনোসররা সেই জায়গাটি দখল করে নেয়। যে প্রাণীগুলো একসময় লম্বায় মাত্র ২ মিটার ছিল, তারাই ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে ব্র্যাকিওসরাস, স্টেগোসরাস কিংবা অ্যালোসরাসের মতো বিশাল ও রাজকীয় ডাইনোসরে পরিণত হয়।
সুতরাং, ডাইনোসরদের পৃথিবী জয়ের গল্পটা কোনো বীরত্বের গল্প নয়। এটা হলো টিকে থাকার গল্প, মানিয়ে নেওয়ার গল্প এবং সর্বোপরি অসাধারণ এক ভাগ্যের গল্প। ওই দুটি মহাবিলুপ্তির ঘটনা যদি না ঘটত, যদি জলবায়ু পরিবর্তন এবং গ্রহাণুর আঘাত পৃথিবীর ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস না করত, তবে হয়তো মেসোজোয়িক যুগটা ডাইনোসরদের না হয়ে কুমিরদের যুগ হতো!
হেরেরাসরাস আবিষ্কারের অর্ধশতাব্দী পর আজ আমরা এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, শুরুর দিকে ডাইনোসররা মোটেও অজেয় ছিল না। এদের ভয়ংকর কোনো শক্তিও ছিল না। তারা ছিল প্রকৃতির খেয়ালে বেঁচে যাওয়া একদল সৌভাগ্যবান প্রাণী।
তবে প্রকৃতির নিয়ম বড়ই অদ্ভুত। যে গ্রহাণুর আঘাত ও আগ্নেয়গিরির লাভা তাদের হাতে পৃথিবীর রাজত্ব তুলে দিয়েছিল, প্রায় ১৫ কোটি বছর রাজত্ব করার পর ঠিক একই রকম আরেকটি গ্রহাণুর আঘাতেই তাদের সেই রাজত্বের চিরস্থায়ী পতন ঘটেছিল। সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে মেক্সিকোর চিকসুলুবে আছড়ে পড়া সেই গ্রহাণুটি ডাইনোসরদের বিলুপ্ত করে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পৃথিবীর রাজা হওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছিল। প্রকৃতির এই উত্থান-পতনের বিশাল নাট্যমঞ্চে কেউ চিরস্থায়ী নয়!