ছবিতে আর্টেমিস ২ মিশনের ঐতিহাসিক সব মুহূর্ত
প্রায় ৫০ বছর পর মানুষ আবার চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছেছে। নাসার আর্টেমিস ২ মিশনের চারজন নভোচারী সম্প্রতি চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। ১০ দিনের এই অভিযানে তাঁরা পৃথিবী থেকে প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরে গিয়েছিলেন। মহাকাশের এত দূরে এর আগে কেউ কখনো যায়নি। এই যাত্রায় তাঁরা যেমন চাঁদের অদেখা পাশ দেখেছেন, তেমনি পরীক্ষা করেছেন মহাকাশযানের আধুনিক সব প্রযুক্তি। তাহলে ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া আর্টেমিস ২ মিশনের সেরা কিছু মুহূর্ত দেখে নেওয়া যাক।
১. আর্টেমিস ২ উৎক্ষেপণ
২০২৬ সালের ১ এপ্রিল কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা যাত্রা শুরু করেন। অ্যাপোলো ১৭-এর পর এটিই প্রথম মানুষের চাঁদে যাওয়ার মিশন। নাসার সবচেয়ে শক্তিশালী স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেটের মাধ্যমে চারজন নভোচারীকে মহাকাশে পাঠানো হয়। তাঁরা ইন্টিগ্রিটি নামের একটি ওরিয়ন ক্যাপসুলে চড়ে ১০ দিনে প্রায় ১১ লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। এটি ছিল এই রকেট ব্যবহার করে মানুষের দ্বিতীয় মহাকাশ যাত্রা।
২. মহাকাশ থেকে দেখা পৃথিবী
নাসার নভোচারী ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী হিসেবে পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের দিকে গিয়েছেন। ২ এপ্রিলের একটি ছবিতে দেখা যায়, তিনি ওরিয়ন মহাকাশযানের জানালা দিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছেন। আর্টেমিস ২ যখন চাঁদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন মহাকাশ থেকে পৃথিবীর মহাদেশ ও মেঘগুলো মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
৩. পৃথিবীর অন্ধকার দিক
২ এপ্রিল ওরিয়ন মহাকাশযান যখন পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন এই ছবি তোলা হয়। সূর্য মহাকাশযানের পেছনে থাকায় পৃথিবী অনেকটা সরু বাঁকা চাঁদের মতো দেখাচ্ছিল। পৃথিবীর যে অংশে রাত ছিল, সেই অন্ধকার অংশটি মহাকাশের কালোর সঙ্গে মিশে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।
৪. মহাকাশ থেকে পৃথিবী ও শুক্র
চাঁদের দিকে যাওয়ার পথে ২ এপ্রিল আরেকটি বিশেষ ছবি তোলা হয়। এই ছবিতে পৃথিবীর দুই মেরুতে উজ্জ্বল অরোরা দেখা গেছে। পৃথিবীর পাশাপাশি ছবির নিচের ডান দিকে উজ্জ্বল শুক্র গ্রহকেও দেখা যাচ্ছিল। এ ছাড়া মহাকাশের ধূলিকণায় প্রতিফলিত সূর্যের আবছা আলোও এই ছবিতে ধরা পড়েছে।
৫. দিন ও রাতের সীমানা
৩ এপ্রিল ওরিয়ন যখন পৃথিবী থেকে আরও দূরে সরে যায়, তখন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান এই ছবি তোলেন। এতে পৃথিবীতে দিন ও রাতের রেখা অর্থাৎ ‘টার্মিনেটর লাইন’ খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আমাদের গ্রহে যেখানে একদিকে দিন এবং অন্যদিকে রাত হচ্ছে, সেই সীমানাটি মহাকাশ থেকে ঠিক কেমন দেখায়, এই ছবিতে তা পরিষ্কার হয়েছে।
৬. চাঁদের গায়ে বিশাল গর্ত
৬ এপ্রিল চাঁদের খুব কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় এই ছবি তোলা হয়। এখানে চাঁদের ওরিয়েন্টাল বেসিন নামের একটি বিশাল এলাকা দেখা যাচ্ছে, যা প্রায় হাজার কিলোমিটার চওড়া। কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশের কোনো বড় বস্তুর সঙ্গে চাঁদের সংঘর্ষের ফলে এই বিশাল গর্তটি তৈরি হয়েছিল। পরে আগ্নেয়গিরির লাভা জমে এলাকাটি এমন রূপ নিয়েছে।
৭. চাঁদের দিন ও রাতের সীমানা
৬ এপ্রিল নভোচারীরা চাঁদের ‘টার্মিনেটর’ বা দিন–রাতের ছবি তোলেন। এই সময় সূর্যের আলো তির্যকভাবে পড়ায় চাঁদের পাহাড় ও গর্তগুলোর ছায়া অনেক লম্বা হয়। ফলে সেগুলোকে আরও স্পষ্ট দেখা যায়। পাইলট ভিক্টর গ্লোভারের জানান, এই গর্তগুলো গভীর অন্ধকারে ঢাকা ছিল।
৮. মহাকাশ থেকে সূর্যগ্রহণ
আর্টেমিস ২–এর নভোচারীরা ৬ এপ্রিল চাঁদের উল্টো পিঠ থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখেন। ওরিয়ন মহাকাশযান থেকে এই গ্রহণ প্রায় ৫৪ মিনিট স্থায়ী ছিল। এই সময় চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলায় সূর্যের বাইরের অংশ, অন্যান্য নক্ষত্র এবং গ্রহগুলোকে খুব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।
৯. মহাকাশে চোখের সুরক্ষা
চাঁদে থাকলেও খালি চোখে সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো বিপজ্জনক। তাই সূর্যগ্রহণের আগে ও পরে চারজন নভোচারী বিশেষ ধরনের সুরক্ষা চশমা ব্যবহার করেন। তাঁরা ঠিক সেই চশমাগুলোই পরেছিলেন, যা সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য সাধারণ মানুষ পরে থাকেন।
১০. পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন
১০ এপ্রিল শুক্রবার রাতে অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় শনিবার সকাল ৬টা ৭ মিনিটে ওরিয়ন ক্যাপসুলটি নিরাপদে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার পর মাত্র ১৩ মিনিটে এটি সাগরে এসে পড়ে। এরপর নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী দল ক্যাপসুলটি খুলে চারজন নভোচারীকে স্বাগত জানায়। এর মাধ্যমেই শেষ হয় ১০ দিনের এই ঐতিহাসিক চন্দ্রাভিযান।
১১. চাঁদের দিগন্তে পৃথিবী
৬ এপ্রিল ওরিয়ন মহাকাশযান যখন চাঁদের খুব কাছ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন এই ছবি তোলা হয়। এতে দেখা যাচ্ছে, গর্তে ভরা চাঁদের দিগন্তের পেছনে পৃথিবী ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে। ছবির সামনের দিকে চাঁদের ওম নামক গর্তটি দেখা যাচ্ছে। এই গর্তের মাঝখানে একটি উঁচু চূড়া রয়েছে।
১২. মহাকাশ থেকে মহাকাশে কথা
৭ এপ্রিল মহাকাশে এক বিশেষ কথোপকথন ঘটে। পৃথিবীতে আসার সময় আর্টেমিস ২ মিশনের চারজন নভোচারী ও আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা এক্সপেডিশন ৭৪–এর নভোচারীরা ভিডিও কলের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন। প্রায় ১৫ মিনিট স্থায়ী এই কলটি সরাসরি দেখা যাচ্ছিল নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের মিশন কন্ট্রোল রুমের বড় পর্দায়। এই প্রথম দুটি ভিন্ন মহাকাশ অভিযানের ক্রুরা সরাসরি মহাকাশ থেকে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করলেন।
১৩. বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি
৭ এপ্রিল আর্টেমিস ২ মিশনের চারজন নভোচারী ওরিয়ন মহাকাশযানের ভেতরে এই গ্রুপ ছবি তোলেন। ছবিতে ক্রিস্টিনা কোচ, জেরেমি হ্যানসেন, রিড ওয়াইজম্যান ও ভিক্টর গ্লোভারকে দেখা যাচ্ছে। তাঁদের সঙ্গে ‘রাইজ’ নামের একটি বিশেষ পুতুল রয়েছে, যা মহাকাশযানে শূন্য মাধ্যাকর্ষণ বোঝার জন্য রাখা হয়েছে। ৬ এপ্রিল চাঁদের উল্টো পাশ ঘুরে তাঁরা ৭ এপ্রিল পৃথিবীর দিকে রওনা দেন।
১৪. চাঁদ দেখার প্রস্তুতি
৬ এপ্রিল চাঁদের খুব কাছ দিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে নভোচারী ভিক্টর গ্লোভার, রিড ওয়াইজম্যান ও জেরেমি হ্যানসেন তাঁদের ক্যামেরাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। চাঁদের উল্টো পিঠের ছবি তোলা এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য তাঁরা এই প্রস্তুতি নেন।
১৫. মহাকাশযানের ডানা থেকে তোলা ছবি
৭ এপ্রিল সকাল ৮টা ৩৩ মিনিটে ওরিয়ন মহাকাশযানের এই ছবি তোলা হয়। মহাকাশযানটির সৌর প্যানেলে লাগানো একটি ক্যামেরা দিয়ে ছবিটি ধারণ করা হয়েছে। এটি ছিল অভিযানের সপ্তম দিন। ছবি তোলার সময় আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা মহাকাশযানের ভেতরে ঘুমাচ্ছিলেন।