বরফের নিচে মহাবিশ্বের রহস্যের খোঁজে

১৯৯৩ সালের ক্রিসমাস ইভ। খাবার টেবিলে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে বসে আছেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন। তাঁর অপেক্ষা দক্ষিণ মেরু থেকে একটা খবরের জন্যে—অ্যান্টার্কটিকায় বরফের গভীরে লাইট সেন্সর বসানো প্রথম কেব্‌লটি ঠিকঠাক নামানো গেছে কি না। দক্ষিণ মেরুর বরফকে বিশাল একটা নিউট্রিনো ডিটেক্টর হিসেবে ব্যবহার করার যে আইডিয়া তিনি কয়েক বছর ধরে এগিয়ে নিচ্ছিলেন, সেটার প্রথম বাস্তব রূপ ছিল আমান্ডা (AMANDA) নামে একটি অবজারভেটরি। সেই রাতের অপেক্ষাটাও ছিল আমান্ডার নির্মাণকাজ নিয়েই। এরপরের কয়েক বছরে এই এক্সপেরিমেন্টটাই দেখিয়ে দিয়েছে, অ্যান্টার্কটিকায় বরফের গভীরে সত্যি সত্যিই নিউট্রিনোর তৈরি ক্ষীণ আলোর সিগন্যাল ধরা সম্ভব। তবে আমান্ডার একটা সীমাবদ্ধতা ছিল—দূর মহাবিশ্ব থেকে আসা অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনো যথেষ্ট সংখ্যায় ধরার জন্য সেটি আকারে খুব ছোট। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পরে তৈরি হয়েছে আরও অনেক বড় আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি। আর তিন দশকের বেশি সময় পরে সেই আইসকিউবের কাজই হ্যালজেনকে এনে দিয়েছে ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার।

২০২৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন

ফ্রান্সিস হ্যালজেনের জন্ম ১৯৪৪ সালে বেলজিয়ামের তিয়েনেনে। ১৯৬৯ সালে কেইউ লিউভেন থেকে পিএইচডি শেষ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং পরে ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন–ম্যাডিসনের অধ্যাপক হন। দক্ষিণ মেরুতে আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি গড়ে তোলার পেছনে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ, আর সেই অবজারভেটরি দিয়ে দূর মহাবিশ্ব থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সফলতা—এই দুটির স্বীকৃতি হিসেবেই তিনি পেয়েছেন ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল। পুরস্কারের সঙ্গে তিনি পাচ্ছেন ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা।

খবরটা হ্যালজেন পেয়েছেন ইতালিতে থাকার সময়। পরে নোবেল সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, কাজটা যখন শুরু করেছিলেন, আইডিয়াটা ভালো বলে অনেকে ভাবলেও শেষ পর্যন্ত এটা আদৌ কাজ করবে কি না, সে ব্যাপারে বিশ্বাসী মানুষ খুব বেশি ছিল না। এমনকি তাঁর নিজেরও সন্দেহ ছিল। তাঁর ভাষায়, পুরো কাজটাই একটা অ্যাডভেঞ্চারের মতো ছিল, যেখানে সফলতার ব্যাপারটা একদমই নিশ্চিত ছিল না।

অধরা নিউট্রিনো

নিউট্রিনো নিয়ে কাজ করা কেন এত কঠিন, সেটা বুঝতে হলে কণাটাকে একটু চিনে নেওয়া দরকার। নিউট্রিনোর কোনো ইলেকট্রিক চার্জ নেই, ভরও অত্যন্ত সামান্য। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, পদার্থের সঙ্গে এরা এত কম ইন্টার‍্যাক্ট করে যে আমাদের শরীর, একটা বাড়ি, একটা পাহাড়—এমনকি পুরো পৃথিবীর ভেতর দিয়েও বেশির ভাগ নিউট্রিনো কোনো বাধা ছাড়াই চলে যেতে পারে। সূর্য থেকে আসা প্রায় ৬৫ বিলিয়ন নিউট্রিনো প্রতি সেকেন্ডে আমাদের সবচেয়ে ছোট আঙুলের নখের সমান জায়গা দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা কিছুই টের পাচ্ছি না।

আর সমস্যাটা ঠিক এখানেই। মহাবিশ্বের খবর জানার জন্য নিউট্রিনো অসাধারণ, কিন্তু তাকে ধরার ব্যাপারটা ভয়ানক কঠিন। এ রকম খুবই কম হয়, কিন্তু কখনো কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে ধাক্কা খেলে একটা চার্জযুক্ত কণা তৈরি হতে পারে। সেই কণা মূল নিউট্রিনো যে দিক থেকে এসেছে, মোটামুটি সেই দিকেই ছুটে যায় এবং স্বচ্ছ পানি বা বরফের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় নীলচে আলো তৈরি করে। সেই ক্ষণস্থায়ী আলো সেন্সরে ধরা গেলে নিউট্রিনো কোন দিক থেকে এসেছিল, সেটাও বের করার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু এমন সংঘর্ষ এত কম ঘটে যে ছোট একটা ডিটেক্টর বানিয়ে বসে থাকলে কাজ হবে না। দরকার বিশাল আয়তনের স্বচ্ছ কোনো মাধ্যম, যাতে তার ভেতর দিয়ে অসংখ্য নিউট্রিনো যাওয়ার মধ্যে অন্তত গুটিকয়েকের সংঘর্ষ ধরা পড়ে।

আরও পড়ুন

হ্যালজেনের বুদ্ধিটা ছিল ঠিক এই জিনিসটা নিয়েই। প্রকৃতি দক্ষিণ মেরুতে কয়েক কিলোমিটার পুরু বরফের স্তর তৈরি করেই রেখেছে। সেই বরফ যদি যথেষ্ট স্বচ্ছ হয়, তার গভীরে লাইট সেন্সর নামিয়ে বরফের একটা বিশাল অংশকেই ডিটেক্টর বানিয়ে ফেলা যায়।

হ্যালজেন অবশ্য একেবারে শূন্য থেকে এই ধারণায় পৌঁছাননি। আশির দশকে কসমিক পার্টিকেল নিয়ে কাজ করার সময় তিনি জানতে পারেন, সোভিয়েত গবেষকেরা অ্যান্টার্কটিকার বরফে নিউট্রিনোর সিগন্যাল রেডিও অ্যানটেনা দিয়ে ধরার কথা ভাবছেন। একই সময়ে তাঁর সহকর্মী জন জি লার্নড হাওয়াইয়ের কাছে গভীর সমুদ্রে নিউট্রিনো ধরার ডুমান্ড (DUMAND) প্রজেক্টে কাজ করছিলেন। সেখানে পরিকল্পনা ছিল স্বচ্ছ সমুদ্রের পানিতে সেন্সর বসিয়ে নিউট্রিনোর ইন্টারঅ্যাকশন থেকে তৈরি আলো খোঁজা। হ্যালজেনের ভাবনা ছিল, সমুদ্রের বদলে দক্ষিণ মেরুর গ্লেসিয়ারের বরফকেই যদি নিউট্রিনো ধরার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে আলাদা করে বিশাল ডিটেক্টর তৈরির দরকার পড়বে না। হ্যালজেন ও লার্নড ১৯৮৮ সালে পোল্যান্ডের এক কনফারেন্সে দক্ষিণ মেরুর বরফে নিউট্রিনো অবজারভেটরি তৈরির এই ধারণা প্রথম তুলে ধরেন।

দক্ষিণ মেরু বেছে নেওয়ার পেছনেও বেশ কিছু সুবিধা ছিল। সেখানে আগে থেকেই একটা গবেষণা স্টেশন ছিল, গবেষক ও যন্ত্রপাতি আনা-নেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। গভীর বরফে সব সময় অন্ধকার, সমুদ্রের মতো জীবন্ত প্রাণীর ঝামেলা নেই, তেজস্ক্রিয় পদার্থও খুব কম। বরফও স্থির, আর এলাকাটা ভূতাত্ত্বিকভাবে এতটাই শান্ত যে ভূমিকম্পের ঝুঁকিও নেই বললেই চলে। কিন্তু জায়গাটা অ্যান্টার্কটিকা। বছরের বেশির ভাগ সময় দক্ষিণ মেরুতে যাতায়াত প্রায় বন্ধ থাকে। ড্রিলিং থেকে শুরু করে সেন্সর বসানো—প্র্যাকটিক্যাল কাজের প্রায় সবটাই তাই করতে হবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে। ওই সময় অ্যান্টার্কটিকায় গ্রীষ্মকাল।

আরও পড়ুন

আইসকিউবের আগে আমান্ডা

শুনতে যত সহজ, বাস্তবে বরফের দেড়-দুই কিলোমিটার নিচে সেন্সর বসানো মোটেও সহজ ছিল না। গ্লেসিওলজিস্টদের কাছ থেকে আমান্ডার গবেষকেরা একটা উপায় জানতে পারেন। বিশেষ ধরনের শাওয়ার হেড দিয়ে খুব গরম পানি ছিটিয়ে বরফ গলিয়ে গভীর, সরু গর্ত তৈরি করা যায়। সেই পানিভরা গর্তে এরপর লম্বা কেব্‌লের সঙ্গে একের পর এক লাইট সেন্সর নামানো হলো। সেন্সরগুলোর কাজ বোঝাতে গিয়ে হ্যালজেন বলেছেন, লাইটবাল্বে বিদ্যুৎ দিলে আলো বের হয়, আর এই সেন্সরগুলো কাজ করে ঠিক উল্টোভাবে। এগুলো আলো ধরে সেটাকে বৈদ্যুতিক সিগন্যালে বদলে দেয়।

আমান্ডার প্রথম দিকের পরীক্ষাতেই অবশ্য একটা বড় সমস্যা দেখা দিল। বরফের ওপরের স্তরে অসংখ্য ছোট ছোট বাতাসের বুদ্‌বুদ আটকে ছিল। নিউট্রিনোর ইন্টার‍্যাকশন থেকে আসা আলো সেই বুদ্‌বুদে পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। ফলে কণাটা কোন দিকে চলছে, সেটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছিল না। প্রথম দিককার ফলাফল তাই বেশ হতাশাজনক ছিল। কিন্তু বরফের আরও গভীরে গিয়ে ছবিটা পুরো বদলে গেল। প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটারের নিচে বরফ এত স্বচ্ছ পাওয়া গেল যে আলো শোষিত হওয়ার আগে প্রায় ৩০০ মিটার পর্যন্ত যেতে পারছিল—গবেষকেরা যতটা আশা করেছিলেন, তার চেয়েও অনেক বেশি।

আমান্ডার নির্মাণকাজ চলে ২০০০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। যন্ত্রটা কাজ করছিল ঠিকই, কিন্তু হ্যালজেন যে অত্যন্ত উচ্চশক্তির কসমিক নিউট্রিনো খুঁজছিলেন, সেগুলো ধরার জন্য এটি আকারে যথেষ্ট বড় ছিল না। ডিটেক্টরটা আরও অনেক বড় হওয়া দরকার ছিল।

সেখান থেকেই আইসকিউব অবজারভেটরির জন্ম।

২০১১ সালে আইসকিউবের নির্মাণকাজ শেষ হয়। তখন এতে ৮৬টি লম্বা কেব্‌লে মোট ৫ হাজার ১৬০টি অপটিক্যাল সেন্সর বসানো হয়েছে। সেন্সরগুলো বরফের প্রায় ১ হাজার ৪৫০ থেকে ২ হাজার ৪৫০ মিটার গভীরে। সব মিলিয়ে প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফ এই অবজারভেটরির ডিটেক্টর হিসেবে কাজ করে। বেশির ভাগ নিউট্রিনো সেই পুরো বরফের ভেতর দিয়েই কোনো চিহ্ন না রেখে চলে যায়। যে গুটি কয় নিউট্রিনো কোনো নিউক্লিয়াসের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাক্ট করে, তাদের তৈরি আলো একসঙ্গে অনেকগুলো সেন্সরে ধরা পড়ে। কোন সেন্সরে কখন আলো পৌঁছেছে, আলোর প্যাটার্ন কেমন—এসব তথ্য মিলিয়ে নিউট্রিনোর শক্তি আর কোন দিক থেকে সেটা এসেছে, তা বোঝার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা।

আরও পড়ুন

তিন ধরনের নিউট্রিনো

নিউট্রিনো কিন্তু এক ধরনের নয়। পার্টিকেল ফিজিকসে তিনটি ‘ফ্লেভার’-এর নিউট্রিনোর কথা বলা হয়—ইলেকট্রন নিউট্রিনো, মিউয়ন নিউট্রিনো আর টাউ নিউট্রিনো। নামগুলো এসেছে ইলেকট্রন, মিউয়ন আর টাউ নামের তিন ধরনের চার্জযুক্ত কণার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থেকে। সূর্যের ভেতরের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকশনে মূলত ইলেকট্রন নিউট্রিনো তৈরি হয়। আবার কসমিক রে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত করলে পায়ন ও মিউয়নের মতো অস্থায়ী কণা তৈরি হয়। সেগুলো ক্ষয় হওয়ার সময় প্রচুর মিউয়ন নিউট্রিনো তৈরি হয়। টাউ নিউট্রিনো সাধারণত আরও বেশি শক্তির কণার সংঘর্ষে তৈরি হয়। কোনো সংঘর্ষে টাউ কণা তৈরি হলে সেটি ক্ষয় হওয়ার সময় টাউ নিউট্রিনোও তৈরি হতে পারে। তবে টাউ নিউট্রিনো সরাসরি শনাক্ত করা অন্য দুই ধরনের নিউট্রিনোর তুলনায় কঠিন।

আইসকিউবে তিন ধরনের নিউট্রিনোর সিগন্যালও এক রকম হয় না। ইলেকট্রন বা টাউ নিউট্রিনো কোনো নিউক্লিয়াসের সঙ্গে ধাক্কা খেলে সংঘর্ষের জায়গার আশপাশে অনেকগুলো কণা তৈরি হয়। সেগুলো থেকে চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়ে। মিউয়ন নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা। সংঘর্ষে একটি মিউয়ন কণা তৈরি হয়, যেটা বরফের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় লম্বা আলোর রেখা রেখে যায়। এই আলোর ধরন দেখে বিজ্ঞানীরা শুধু নিউট্রিনো ধরা পড়েছে কি না, তা-ই নয়; সেটি কোন ধরনের এবং কোন দিক থেকে এসেছে, সে সম্পর্কেও ধারণা করতে পারেন।

তবে নিউট্রিনো যে ধরন বা ফ্লেভারে তৈরি হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেটাই থাকবে—এমন নয়। চলার পথে এক ফ্লেভারের নিউট্রিনো অন্য ফ্লেভারে বদলে যেতে পারে। এই ঘটনাকে বলা হয় নিউট্রিনো অসিলেশন। ১৯৯৮ সালে জাপানের সুপার-কামিওকান্দে অবজারভেটরিতে তাকাকি কাজিতার দল বায়ুমণ্ডল থেকে আসা মিউয়ন নিউট্রিনোর মধ্যে এই বদলের প্রমাণ পান। কয়েক বছর পর কানাডার সাডবেরি নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে আর্থার বি ম্যাকডোনাল্ডের দল দেখায়, সূর্য থেকে আসা ইলেকট্রন নিউট্রিনোর একটা অংশ পথে অন্য ফ্লেভারে বদলে যাচ্ছে। এই কাজের জন্য কাজিতা ও ম্যাকডোনাল্ড ২০১৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান।

আরও পড়ুন

কসমিক নিউট্রিনোর খোঁজে

আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি।
ছবি: আইসকিউব/এনএসএফ

আইসকিউব অবজারভেটরি তো তৈরি হলো, এবার কাজ দূর মহাবিশ্ব থেকে আসা নিউট্রিনোগুলোকে আলাদা করে খুঁজে বের করা। কাজটা মোটেও সহজ নয়। কারণ, আইসকিউবের সেন্সরে শুধু কসমিক নিউট্রিনো ধরা পড়ে না। কসমিক রে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত করলে বিপুল পরিমাণ কণা তৈরি হয়, আর সেগুলোর মধ্যে ১০ কোটির বেশি কণা প্রতিদিন বরফের গভীরে আইসকিউবের সেন্সর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একই প্রক্রিয়ায় বায়ুমণ্ডলে নিউট্রিনোও তৈরি হয়। সেগুলোর কয়েক শটি প্রতিদিন পুরো পৃথিবী ভেদ করে দক্ষিণ মেরুর আইসকিউবে এসে পৌঁছায়।

এই বিপুল পরিমাণ সিগন্যালের মধ্যে কোন নিউট্রিনোগুলো দূর মহাবিশ্ব থেকে এসেছে, সেটাই আলাদা করতে হয় গবেষকদের। একটা নিউট্রিনো দেখেই এর উৎস নিশ্চিত করা সব সময় সম্ভব নয়। তাই অনেকগুলো নিউট্রিনোর শক্তি ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়। এখানে পৃথিবীও একরকম ফিল্টারের কাজ করে। নিউট্রিনো পুরো পৃথিবী ভেদ করে আসতে পারে, কিন্তু অন্য বেশির ভাগ কণা পারে না। ফলে উত্তর গোলার্ধ থেকে পৃথিবী ভেদ করে আসা নিউট্রিনোগুলো খুঁজলে অনেক অপ্রয়োজনীয় সিগন্যাল এমনিতেই বাদ পড়ে যায়।

২০১৩ সালে আইসকিউব দল প্রথম প্রমাণ পায় যে তাদের ধরা কিছু উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো বায়ুমণ্ডলে তৈরি হয়নি, এসেছে দূর মহাবিশ্ব থেকে। আরও কয়েক বছরের ডেটা বিশ্লেষণের পর এ নিয়ে গবেষকেরা নিশ্চিত হন। আমান্ডা দিয়ে শুরু হওয়া দীর্ঘ চেষ্টাটা শেষ পর্যন্ত সফল হলো।

কিন্তু নিউট্রিনো ধরা ছিল কেবল শুরু। এবার জানতে হবে, সেগুলো আসছে কোথা থেকে।

আরও পড়ুন

মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর

মহাকাশ থেকে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের উচ্চশক্তির কণা পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। এগুলোকেই একসঙ্গে কসমিক রে বলা হয়। এদের বড় একটা অংশ প্রোটন। কোনো কোনো কসমিক রে এত বেশি শক্তি নিয়ে আসে যে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটরেও একটা কণাকে এত শক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ মহাবিশ্বের কোথাও এমন প্রাকৃতিক পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর আছে, যেগুলো আমাদের তৈরি যন্ত্রের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু সেগুলো ঠিক কোথায়, সেটাই বহুদিনের রহস্য।

যেভাবে কাজ করে আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি।
ছবি: রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস

সমস্যা হচ্ছে কসমিক রে দেখে সেটা কোথা থেকে এসেছে, তা সরাসরি বোঝা যায় না। প্রোটনের ইলেকট্রিক চার্জ আছে বলে মহাকাশের ম্যাগনেটিক ফিল্ড তার চলার পথ বাঁকিয়ে দেয়। ফলে পৃথিবীতে একটা প্রোটন যে দিক থেকে এসে পৌঁছেছে, সেই পথ ধরে উল্টো দিকে গেলেই এর উৎস পাওয়া যাবে—ব্যাপারটা মোটেও সে রকম নয়।

নিউট্রিনোর সুবিধা ঠিক এখানেই। মহাবিশ্বে যে প্রক্রিয়ায় প্রোটন এত বেশি শক্তি পায়, সেই একই প্রক্রিয়ায় উচ্চশক্তির নিউট্রিনোও তৈরি হওয়ার কথা। আর নিউট্রিনোর কোনো ইলেকট্রিক চার্জ নেই বলে ম্যাগনেটিক ফিল্ড এর পথ বাঁকিয়ে দিতে পারে না। তাই এমন উচ্চশক্তির নিউট্রিনো কোন দিক থেকে এসেছে, সেটা বের করতে পারলে সেই প্রাকৃতিক পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটরগুলোর অবস্থানও খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

গামা রে থেকেও মহাবিশ্বের খুব শক্তিশালী ঘটনাগুলো সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু উৎসের চারপাশে অনেক পদার্থ বা ধুলা থাকলে গামা রে বেরিয়ে আসার আগেই আটকে যেতে পারে। আবার অনেক দূর পথ পাড়ি দেওয়ার সময় অন্য আলো বা পদার্থের সঙ্গে ইন্টার‍্যাক্ট করে শক্তিও হারাতে পারে। নিউট্রিনো এসব বাধা সহজেই পেরিয়ে আসতে পারে। ধুলার মেঘ বা বিপুল পরিমাণ পদার্থের আড়ালে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে তাই এমন তথ্যও নিউট্রিনো দিতে পারে, যা অন্যভাবে জানা কঠিন।

আরও পড়ুন

নিউট্রিনো দিয়ে মহাকাশ দেখা

নিউট্রিনো দিয়ে মহাকাশ দেখার ইতিহাস অবশ্য হ্যালজেন থেকে শুরু হয়নি। ষাটের দশকে রেমন্ড ডেভিস জুনিয়র সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করেছিলেন। পরে মাসাতোশি কোশিবার নেতৃত্বে জাপানের কামিওকান্দে অবজারভেটরির গবেষকেরা নিউট্রিনোর চলার দিকও বের করতে সক্ষম হন। ১৯৮৭ সালে লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউডে একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর সেখান থেকে আসা নিউট্রিনোর ঝাঁকও ধরা পড়ে। এই গবেষণাগুলোই প্রথম দেখিয়ে দেয়, নিউট্রিনো দিয়ে মহাকাশের ঘটনা সম্পর্কে জানা সম্ভব। এই কাজের জন্যে ডেভিস ও কোশিবা ২০০২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান।

হ্যালজেনের আইসকিউব সেই ইতিহাসে নতুন একটা ধাপ যোগ করেছে। সূর্য বা আমাদের কাছাকাছি কোনো সুপারনোভা থেকে নিউট্রিনো দেখা এক ব্যাপার; মহাবিশ্বের অনেক দূরের, অত্যন্ত শক্তিশালী উৎস থেকে আসা নিউট্রিনো নিয়মিত ধরে তাদের উৎস খোঁজা আরেক ব্যাপার। আইসকিউবের পর নিউট্রিনো শুধু পার্টিকেল ফিজিকসের বিষয় হয়ে থাকেনি। দূর মহাবিশ্বে কী ঘটছে, সেটা জানার নতুন একটা মাধ্যমও হয়ে উঠেছে।

আইসকিউবের সাফল্যের পর এখন লক্ষ্য আর শুধু দূর মহাবিশ্বের নিউট্রিনো ধরা নয়; সেগুলো ঠিক কোথা থেকে আসছে, সেটাও খুঁজে বের করা। এর মধ্যে কয়েকটি সম্ভাব্য উৎসের কথাও জানা গেছে। যেমন NGC 1068 (এটি M77 নামেও পরিচিত)। এটি একটি অ্যাকটিভ গ্যালাক্সি—অর্থাৎ এর কেন্দ্রের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের আশপাশে পদার্থ জমতে জমতে প্রচণ্ড শক্তি বের হয়। আইসকিউবে ধরা নিউট্রিনোগুলোর মধ্যে ৭৯টি এই গ্যালাক্সির দিক থেকে এসেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তবে এটুকু দিয়েই NGC 1068 কে নিশ্চিত উৎস বলা যাচ্ছে না। আরও নিউট্রিনো ধরা পড়লে বিষয়টা পরিষ্কার হবে।

শুধু দূরের গ্যালাক্সি নয়, আমাদের নিজেদের মিল্কিওয়ে থেকেও উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আসতে দেখা গেছে। গবেষকদের ধারণা, নক্ষত্রগুলোর মাঝখানে খুব কম ঘনত্বের গ্যাস ছড়িয়ে আছে। কসমিক রে সেই গ্যাসের পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খেলে এসব নিউট্রিনো তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর উৎস শুধু দূরের অ্যাকটিভ গ্যালাক্সি নয়। আমাদের মিল্কিওয়ের ভেতরেও কসমিক রে আর গ্যাসের সংঘর্ষ থেকে এগুলো তৈরি হতে পারে। এখন যত বেশি নিউট্রিনো ধরা পড়বে, তত ভালোভাবে বোঝা যাবে কোন নিউট্রিনোগুলো কোথা থেকে আসছে।

আরও পড়ুন

আইসকিউবের গল্প এখানেই শেষ নয়। পৃথিবীর অন্য জায়গাতেও নতুন নিউট্রিনো টেলিস্কোপ তৈরির কাজ চলছে, যদিও সেগুলোর অনেকগুলো বরফের বদলে গভীর পানি ব্যবহার করবে। আর দক্ষিণ মেরুতে আইসকিউবকেও আরও বড় করার পরিকল্পনা আছে। আইসকিউব-জেন২ তৈরি হলে প্রায় আট ঘনকিলোমিটার বরফজুড়ে নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণ করা হবে। যত বড় ডিটেক্টর, উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো ধরার সুযোগও তত বেশি। আর যত বেশি নিউট্রিনো ধরা পড়বে, মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটরগুলো কোথায় লুকিয়ে আছে, সেটা বোঝার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

১৯৯৩ সালের সেই ক্রিসমাস ইভে অবশ্য এত দূরের গল্প হ্যালজেনের জানা ছিল না। তিনি তখন অপেক্ষা করছিলেন আমান্ডার প্রথম কেব্‌লটি বরফের গভীরে বসানোর খবরের জন্য। পরে দেখা গেল, আমান্ডা কাজ করলেও উচ্চ-শক্তির কসমিক নিউট্রিনো ধরার জন্য সেটি যথেষ্ট বড় নয়। সেখান থেকেই এল এক ঘনকিলোমিটারের আইসকিউব। ২০১৩ সালে সেই আইসকিউবই প্রথম শক্ত প্রমাণ দিল দূর মহাবিশ্ব থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর। আর এখন নোবেল।

পুরস্কারটা নিজের নামে এলেও হ্যালজেনের প্রতিক্রিয়ায় শুরু থেকেই ফিরে এসেছে সেই মানুষগুলোর কথা, যারা যথেষ্ট অনিশ্চয়তার মধ্যেও তাঁর সঙ্গে কাজ শুরু করেছিলেন। বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার আর টেকনিশিয়ানদের একটা আন্তর্জাতিক দলকে নিয়ে আমান্ডা থেকে আইসকিউব পর্যন্ত এই প্রকল্প টেনে নেওয়ার কাজটা চলেছে কয়েক দশক ধরে। নোবেল কমিটিও হ্যালজেনের বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টির পাশাপাশি তাঁর লেগে থাকার ক্ষমতার কথা আলাদা করে উল্লেখ করেছে। একটা আইডিয়াকে কাগজ থেকে দক্ষিণ মেরুর বরফের নিচে নামানো, তারপর সেই যন্ত্র দিয়ে সত্যি সত্যি দূর মহাবিশ্বের নিউট্রিনো ধরা—হ্যালজেনের নোবেলের গল্পটা আসলে এই দীর্ঘ পথটারই গল্প।

দক্ষিণ মেরুর বরফের নিচে বসানো সেই লাইট সেন্সরগুলো শুধু কয়েকটা অদ্ভুত কণার হিসাব রাখছে না। মহাবিশ্বের এমন সব জায়গার খবর আমাদের কাছে নিয়ে আসছে, যেগুলো হয়তো অন্য কোনোভাবে দেখা সম্ভবই হতো না। একসময় দক্ষিণ মেরুর বরফের ভেতরে নিউট্রিনো অবজারভেটরি বানানোর চিন্তাটাই ছিল দুঃসাহসিক।

এখন সেই বরফ দিয়েই আমরা মহাবিশ্বকে নতুনভাবে দেখতে শিখছি।

আরও পড়ুন