ডিউক জনের চার মূর্তি সিরিজের গল্প—দুঃসহ দুপুরে

অলংকরণ: তনি সুভংকর

‘বাপরে, গরম কী!’ লেখার প্যাড দিয়ে নিজেকে বাতাস করতে করতে বলল একহারা শরীরের পাতলা-সাতলা দীপ্র চৌধুরী, ‘তো, আজ দুপুরে কী করছি আমরা?’ ফরসা মুখভরা লাল লাল ফুটকি ওর। খাড়া মইয়ের মতো শরীরটায় প্রথমেই চোখে পড়ে স্পষ্টভাবে বেরিয়ে থাকা কণ্ঠার হাড়। বাঁকানো নাকটা যেন বাজপাখির ঠোঁটের মতো তীক্ষ্ণ।

‘কিচ্ছু না!’ জবাব দিতে একমুহূর্তও দেরি হলো না আদনান রেজার, ‘এত্ত গরম পড়েছে যে মনে হচ্ছে গলে যাচ্ছি আইসক্রিমের মতো! সাঁতার কাটতে যেতেও ইচ্ছে করছে না এখন।’ ওর কপালের ওপর ঝুলে পড়া কয়েক গোছা কোঁকড়া চুল জন্ম থেকেই ধবধবে সাদা। শ্যামলা ছেলেটির চোখের মণি দুটো যেন দুফোঁটা গাঢ় বাদামি কফি। রাজ্যের মায়া খেলা করছে ডাগর চোখের তারায়। বুদ্ধির দীপ্ত ঝিলিকও রয়েছে তাতে।

‘বেশ তো, অলস দুপুরই কাটালাম নাহয় আজকের দিনটা।’ সায় জানাল সুঠামদেহী পাভেল রোজারিও, ‘এই গরমে বাইরে ঘোরাঘুরি কিংবা সাইকেল চালানোর কথা চিন্তা করলেই চক্কর দিয়ে উঠতে চায় মাথাটা!’

‘হুফ!’ কুটুস যেন দ্বিমত করল কথাটায়।

‘ও তো মনে হয় হাঁটতে যাওয়ারই প্রস্তাব দিচ্ছে, পাভেল।’ হেসে বন্ধুর পোষা কুকুরের সোনালি মাথাটা চাপড়ে দিল ছোটখাটো গড়নের মুকিত ইকবাল। পুরু ফ্রেমের কালো চশমাটা খুলে ভুরু নাচিয়ে জানতে চাইল, ‘এবার?’ স্বাস্থ্য ভালোর দিকে ওর, তবে মোটা বলা যাবে না মোটেই। গোলগাল মুখটার ওপর চুলগুলো খাটো করে ছাঁটা।

‘তবে আর কী!’ হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল পাভেল, ‘ঠান্ডা, ছায়া আছে—এ রকম কোনো জায়গা খুঁজে বের করিগে, চলো। গল্পের বইটই খুলে বসি, অথবা ঘুম দিই লাঞ্চের সময় হওয়ার আগপর্যন্ত। আশা করি, মন্দ কাটবে না সময়টা।’

‘হুফ! হুফ!’ আবার ডেকে উঠল গোল্ডেন স্প্যানিয়েল প্রজাতির কুকুরটা। এটাতেও রাজি নয় যেন।

‘হ্যাঁ, এটা অন্তত করতে পারি আমরা।’ উঠে দাঁড়াল দীপ্র।

‘যাওয়া যাক তাহলে।’ দেখাদেখি উঠে পড়েছে আদনানও, ‘গাছ খুঁজতে হবে বড় বড় পাতাওয়ালা। আর ধারেকাছে ঝরনাটরনা থাকলে তো কথাই নেই।’

বাড়ি থেকে বেরিয়ে ধীর কদমে হাঁটতে লাগল চার বন্ধু। ভ্যাপসা গরমের কারণে তাল মেলাতে পারছে না উৎসাহী, চঞ্চল চারপেয়েটার সঙ্গে।

আরও পড়ুন

ক্যালিফোর্নিয়ার নিষ্ঠুর সূর্যটা অবিরাম আগুন ঢালছে মাথার ওপর। নিচের মানুষগুলোকে একচুলও ছাড় দেবে না—এমন একগুঁয়ে জেদ যেন ওটার। এক টুকরো মেঘ নেই আকাশে। গাছগাছালির ছায়াও নেই আশপাশে। প্রচণ্ড গরমে অশরীরী প্রেতাত্মার মতো তাপতরঙ্গ নেচে চলেছে চোখের সামনে। একটুও বাতাস নেই কোত্থাও।

শহরের কোলাহল থেকে দূরে, আধা গ্রাম, আধা শহরের এক নিরিবিলি এলাকায় গড়ে উঠেছে এই বাঙালিপল্লি। বাড়িঘরগুলো দূরে দূরে ছড়ানো হলেও মানুষের মনগুলো কিন্তু কাছাকাছি। সবার সঙ্গে সবার আন্তরিক সম্পর্ক। আপদে-বিপদে একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ানোটা যেন এখানকার অলিখিত নিয়ম। এ পাড়াতেই থাকে মুকিত, দীপ্র, আদনান আর পাভেল। হরিহর আত্মা যেন চার কিশোর।

‘ওর দিকে তাকালেই তো গরম লাগছে আমার!’ অনুযোগ করল মুকিত, ‘কীভাবে হাঁপাচ্ছে ও, দেখো! এক্কেবারে আদ্যিকালের স্টিম ইঞ্জিনের মতো! ওরে, জিবটা ভেতরে ঢোকা রে, কুটুস সোনা! পোকা ঢুকে যাবে তো মুখ দিয়ে!’

অলংকরণ: তনি সুভংকর

উৎফুল্ল কুটুস দৌড়ে যাচ্ছিল আগে আগে; মনে করেছিল যে পায়চারি করতেই বেরিয়েছে ওর মানববন্ধুরা। যখন দেখল, ক্ষীণ এক স্রোতস্বিনীর কাছাকাছি বিশাল এক গাছের ছায়ায় যাত্রাবিরতি নিল ওরা, যারপরনাই হতাশ হলো কুকুরটা। বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বন্ধুদের দিকে।

‘সরি, কুটুস, আজ আর হাঁটা নয়।’ প্রাণীটার মনোভাব বুঝতে পেরে বলল পাভেল, ‘আয়, তুইও বোস আমাদের সাথে। গরমের মধ্যে আর খরগোশের পেছনে ছোটাছুটি করিস না।’

‘হ্যাঁ রে...সময়ই নষ্ট হবে শুধু।’ বন্ধুর কথায় সমর্থন জানাল আদনান, ‘বুদ্ধিমান খরগোশগুলো নিশ্চয়ই গর্তের মধ্যে ভাতঘুম দিচ্ছে এতক্ষণে, গরমটা কমলে পরে বেরোবে।’

‘খরগোশ কি ভাত খায় নাকি?’ ফিচেল হেসে কথাটা ধরল ভোজনরসিক মুকিত।

‘আরে, ওই আরকি...।’

‘হউফ!’ গাছপালা আর ঝোপের ছায়ায় চারজনকে জুত হয়ে বসতে দেখে অননুমোদনের সুরে ডেকে উঠল কুকুরটা। পাতা আর ডালের ঠাসবুনটের কারণে সূর্যের আলো একেবারেই পৌঁছাচ্ছে না গাছের নিচে। ফলে সবুজ ছায়ার আদরমাখা প্রশান্তি বিরাজ করছে নিচটায়।

‘হুম, এটাই সবচেয়ে ভালো জায়গা।’ মন্তব্য করল আদনান, ‘সবচেয়ে ঠান্ডাও বোধ হয় এই জায়গাই। পাথরে বাধা পেয়ে ঝিরির পানি কী রকম আওয়াজ তুলছে, শুনছ না?’

‘হ্যাঁ, শুনেই তো ঘুম এসে যাচ্ছে!’ আসলেই ঢুলুঢুলু হয়ে এসেছে মুকিতের চোখ দুটো। চারপেয়ে প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝলি, কুটুস, আমরা কিন্তু বিশ্রাম নেব এখন। বেশি যদি লাফালাফি করিস, কান ধরে বাসায় রেখে আসব তোকে!’

শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কুকুরটা। লেজটা ঝুলে পড়েছে নিচের দিকে। বনজঙ্গলে এসে কিচ্ছুটি না করে এভাবে শুয়ে-বসে থাকার মানেটা কী, মাথায়ই ধরছে না ওটার। ঠিক করল, যে যা-ই বলুক ওরা, খরগোশই খুঁজতে বেরোবে সে!

ঘুরে দাঁড়াল জানোয়ারটা, অচিরেই অদৃশ্য হয়ে গেল ঝোপের ওপাশে।

আধশোয়া বন্ধুরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল ওটার চলে যাওয়া।

‘খরগোশই খুঁজতে গেল, তাই না?’ বলে উঠল দীপ্র ।

‘থাকগে, যেতে দাও।’ হাত নাড়ল পাভেল, ‘দেখবে, ঠিকই ফিরে আসবে আবার জায়গা চিনে।’

‘উফ, এত বকবক কোরো না তো!’ আস্তে করে বন্ধুর পায়ে লাথি মারল মুকিত, ‘এখানকার বাতাসে মনে হয় ঘুমের ওষুধ আছে...কিছুতেই চোখ খুলে রাখতে পারছি না আমি!’

সত্যিই তা-ই। মিনিট কয়েক পরই দেখা গেল, চোখ খোলা নেই একজনেরও। পেপারব্যাক বইগুলো সঙ্গে আনাই সার, পড়া হয়নি একটা পৃষ্ঠাও। ছোট্ট একটা নীল রঙের পোকা মুকিতের অনাবৃত পায়ের ওপর দিয়ে হেঁটে গেল, টেরই পেল না ও। একটা রবিন পাখি এসে বসল ওপরকার ডালে, জানতেও পারল না চার মূর্তি।

আরও পড়ুন

তপ্ত একটা দুপুর। কেউ নেই ওদের চারপাশে। জলের মৃদু কলতান আর পাখপাখালির ক্লান্ত ডাক ছাড়া চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ। এমনভাবে ঘুমে বিভোর হয়ে আছে চার বন্ধু, যেন শুয়ে ওরা যে যার বিছানায়।

হঠাৎ দূরের রাস্তা দিয়ে জোরাল আওয়াজ তুলে চলে গেল একটা সাইডকারওয়ালা মোটরবাইক, কিছুই শুনতে পেল না ছেলেরা। জানলও না যে স্পিড কমিয়ে একপর্যায়ে বনের ভেতর ঢুকে পড়েছে মোটরসাইকেলটা।

তৃণাবৃত রাস্তা ধরে ধীরগতিতে চলতে লাগল মোটরবাইক, এখন আর আওয়াজ হচ্ছে না তেমন। ঝোপটার কাছাকাছি এসে পৌঁছাল ওটা, যেটার আড়ালে সুখনিদ্রা দিচ্ছে চার বন্ধু।

আচমকা ইঞ্জিনটা একটু কাশির মতো শব্দ করে উঠতেই চমকে জেগে গেল আদনান।

কিসের আওয়াজ?

উৎকর্ণ হয়ে শোনার চেষ্টা করল কিছু, তবে ততক্ষণে থেমে গেছে মোটরবাইক।

ফের চোখ লেগে এল আদনানের।

কিন্তু তক্ষুনি আবার নিচু কণ্ঠের আওয়াজ কানে আসতেই ঝট করে খুলে গেল চোখজোড়া।

মনে হলো, কাছেপিঠেই কথা বলছে একাধিক কণ্ঠ। কিন্তু ঠিক কোন জায়গায়?

উঠে বসল আদনান। সন্তর্পণে ঝোপ ফাঁক করে উঁকি দিল। অনতিদূরে দেখতে পেল ও বাইক, সাইডকার আর গাড়ি দুটোর দুই আরোহীকে।

বাহন ছেড়ে নেমে এল যাত্রীরা। লোক দুটোকে মোটেই ভালো লাগল না আদনানের।

‘কী অদ্ভুত লোকগুলো!’ ভাবল ও। ‘গরমের এই দুপুরবেলায় ওরা কী করছে এখানে?’

নিচু স্বরে কথা বলছিল দুজনে, এরপর তর্কাতর্কি শুরু হলো ওদের। একজন বলল, ‘গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, কেউ অনুসরণ করছিল আমাদের! সে জন্যই জিনিসটা লুকানোর জন্য এখানে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।’

একটা ব্যাগ নামানো হলো সাইডকার থেকে। চরম বিরক্তিতে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করছে অপরজন। সঙ্গীর ইচ্ছার সঙ্গে একমত নয় যেন।

‘আমার মনে হয়, এই গাছটায় লুকালে ব্যাগটা খুঁজে পাবে না কেউ,’ আবার বলল প্রথমজন, ‘কী হলো, এমন হাঁড়ির মতো করে রেখেছ কেন মুখটা? বললাম না, ফলো করা হচ্ছিল আমাদের! এটা এখন সাথে রাখলে বমাল ধরা খাওয়ার ঝুঁকি আছে। খোদার কাছে শুকরিয়া করো যে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করাতেই কেবল পালাতে পেরেছি আমরা।’

সাবধানে বন্ধুদের ঘুম থেকে জাগাল আদনান। ফিসফিস করে বলল, অদ্ভুত কিছু ঘটছে এখানে।

পাতার ফাঁক দিয়ে চেয়ে দেখল ওরা মোটরবাইকের পাশে পড়ে থাকা মেইলব্যাগটা।

‘হচ্ছেটা কী, বলো তো!’ ফিসফিসিয়ে জানতে চাইল মুকিত। এত আরামের ঘুমটা নষ্ট হওয়ায় মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে আছে ওর, ‘চিল্লাব নাকি ওদের উদ্দেশে?’

‘খবরদার, না!’ চট করে ঠোঁটের ওপর আঙুল চলে এসেছে আদনানের, ‘কথাবার্তা শুনে তো মনে হচ্ছে বদমাশ লোক। সাথে পিস্তলটিস্তল থাকলে?’

‘ইশ্‌, কুটুসটা যদি এখানে থাকত এখন!’ আফসোস করল দীপ্র, ‘খরগোশের পেছনে পেছনে ব্যাটা বোধ হয় এক মাইল দূরে চলে গেছে এরই মধ্যে!’

‘হ্যাঁ। সংখ্যায় ওরা মাত্র দুজন হলেও অনেক বেশি শক্ত-সমর্থ আমাদের চারজনের চেয়ে।’ পাভেলের মন্তব্য, ‘অতএব, লুকিয়ে-চুরিয়ে নজর রাখা ছাড়া আপাতত কিছুই করার নেই আমাদের।’

‘কোথায় লুকাচ্ছে ব্যাগটা, সেটা অন্তত দেখতে পাব আশা করি।’ স্বগতোক্তি করল আদনান, ‘কে জানে, কী আছে ওতে!’

‘নিশ্চয়ই চুরির মাল...।’ অনুমান করল পাভেল।

‘ওই যে দেখো, নিয়ে যাচ্ছে ব্যাগটা!’ উত্তেজনার সঞ্চার ঘটেছে মুকিতের মাঝে। ঘুমটুম সব উধাও।

‘হুম...গাছে উঠছে ব্যাটারা!’ একটু জোরেই কথাটা বলে ফেলল দীপ্র। যদিও তা কানে গেল না রহস্যময় লোক দুটোর।

প্রথমে একজন উঠে পড়ল গাছের মাথায়। অন্যজন কিছুটা উঠে ব্যাগটা তুলে দিল তার হাতে।

ভীষণভাবে কুটুসের অভাব অনুভব করছে ছেলেরা এ মুহূর্তে।

এবার দেখা গেল, প্রথমজনের ডাকে দ্বিতীয় লোকটিও চেষ্টা করছে গাছ বাওয়ার। নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে, ধারণা করল চার বন্ধু। সম্ভবত কোথাও আটকে–টাটকে গেছে ব্যাগটা।

একটু পর দেখল ওরা, গাছের ওপরের ফাঁপা কোনো জায়গার মধ্যে ব্যাগ ঢোকানোর চেষ্টা করছে আগন্তুকেরা। শেষমেশ ‘ধুপ’ করে একটা আওয়াজের সঙ্গে ভেতরে পড়ে গেল জিনিসটা।

‘দূরো!’ উসখুস করে উঠল পাভেল, ‘এভাবে চুপচাপ বসে থাকার মানে হয় কোনো!’

বলে শেষ করতে পারল না, সহসা ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ এসে ঢুকল ওদের কানে। সঙ্গে একটা পরিচিত হাঁকডাক : ‘হুফ! হুফ! হউফ!’

‘কুটুস!’ একসঙ্গেই চেঁচিয়ে উঠল দীপ্র আর আদনান।

তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ইনক্রেডিবল হাল্কের মতো ঝোপের আড়াল ভেদ করল মুকিত। ‘গাছটা পাহারা দিতে বলো ওকে, পাভেল! জলদি!’ বলল ও চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে।

‘কুটুস—গার্ড!’ চিৎকার করে নির্দেশ দিল পাভেল। আঙুল তাক করেছে গাছটার দিকে।

ছুট লাগাল করিতকর্মা কুকুর। আতঙ্কিত দৃষ্টিতে গাছের ওপর থেকে তাকিয়ে রইল বদমাশ দুটো।

নির্দিষ্ট গাছটার নিচে এসে রক্ত হিম করা গর্জন ছাড়ল সোনালি স্প্যানিয়েল। লাফ দিয়ে নামার উদ্যোগ করছিল একজন, কুঁকড়ে গেল ভয়ে।

‘কুকুর সরাও!’ বলল সে চিৎকার করে, ‘কুত্তা লেলিয়ে দিয়েছ কেন আমাদের ওপর?’

‘আগে বলুন, কারা আপনারা!’ পাল্টা বলল পাভেল, ‘আর, কী লুকিয়েছেন ওই ব্যাগের মধ্যে?’

‘কিসের ব্যাগ? কিসের কথা বলছ!’ আকাশ থেকে পড়েছে যেন লোকগুলো, ‘পাগল নাকি তোমরা? কুত্তা সরাও! নইলে কিন্তু বাধ্য হব পুলিশ ডাকতে!’

‘বেশ তো, ডাকুন না!’ বুকের ওপর দুহাত বাঁধল আদনান, ‘আমরাও চাই যে পুলিশ আসুক।...এই, যাও তো একজন, পুলিশ নিয়ে এসো এখানে!’ চাইল ও বন্ধুদের দিকে। এরপর আবার ওপরে তাকিয়ে বলল, ‘ততক্ষণ পর্যন্ত ওখানেই থাকুন আপনারা। খবরদার, ভুলেও নামার চেষ্টা করবেন না যেন! তাহলে কিন্তু মাংস একদম তুলে নেবে কুটুস মিয়া! কী, মিয়াভাই, ঠিক বলেছি না?’

এমনই রাগা রেগেছে যে কথাই বলতে পারছে না লোক দুজন। ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খাচ্ছে শুধু। জোরে জোরে ঘেউ ঘেউ করতে করতে বারবার লাফঝাঁপ দিচ্ছে কুকুরটা, নাগাল ধরার চেষ্টা করছে ওদের।

দীপ্রর দিকে ফিরে বলল আদনান, ‘পাভেলকে নিয়ে চলে যাও তুমি হাইওয়ের দিকে। একটা গাড়ি থামিয়ে লিফট নাও থানা পর্যন্ত। ওরা যেন শিগগিরই লোক পাঠায় এখানে। তাড়াতাড়ি করো!’

তবে রওনা হওয়ার আগেই শোনা গেল আরেকটা মোটরসাইকেলের শব্দ। এরপর আরেকটা। জঙ্গলের এবড়োখেবড়ো, আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে ঝাঁকি খেতে খেতে।

নিশ্চুপ হয়ে গেছে বন্ধুরা। আরও গুন্ডা-বদমাশ এসে হাজির হয়েছে নাকি?

ঝটপট গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল ওরা। ঘাড় উঁচু করে দেখতে লাগল, কারা আসছে মোটরবাইকে।

‘ইয়াহু! পুলিশ!’ পরিচিত ইউনিফর্ম নজরে আসতেই বাতাসে মুঠো ছুড়ে উল্লাস ছাড়ল মুকিত, ‘নিশ্চয়ই ধাওয়াকারীরা! নির্ঘাত কেউ জঙ্গলে ঢুকতে দেখেছে ওদের! এই যে, এদিকে!’ গাছের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এসে হাত নাড়ল ও, ‘কিছু খুঁজছেন নাকি আপনারা?’

বাহন থামাল বিস্মিত দুই পুলিশ অফিসার। সাইডকারসহ মোটরসাইকেলটা চোখে পড়েছে ওদের। চেঁচিয়ে জানতে চাইল একজন, ‘তোমরা কি দুজন লোককে দেখেছ, একটা ব্যাগসহ?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখেছি তো!’ বলতে বলতে এগিয়ে গেল আদনান, ‘ওই গাছটার ওপরে আছে ওরা। ব্যাগটাও লুকিয়ে রেখেছে গাছের ফাঁকে!’

‘চিন্তা করবেন না,’ একগাল হেসে আশ্বস্ত করল দীপ্র, ‘আমাদের লক্ষ্মী কুকুর পাহারা দিচ্ছে ব্যাটাদের। একদম সময়মতো চলে এসেছেন আপনারা!’

‘খুব ভালো! খুব ভালো!’ ভয়ার্ত অপরাধী আর লম্ফঝম্ফ করতে থাকা কুকুরটাকে দেখে আন্তরিক খুশি পুলিশের লোকেরা, ‘ব্যাগটা ওপরে আছে, বলছ?’

আরও পড়ুন

‘কাণ্ডের ফাঁকে,’ ব্যাখ্যা করল আদনান, ‘কী আছে ওতে?’

‘টাকা।...অনেক ধন্যবাদ তোমাদের। কাজ অনেক সহজ হয়ে গেল আমাদের।’ হুইসেল বাজাল পুলিশম্যান, ‘আমাদের লোক আছে রাস্তায়। বাঁশির আওয়াজ শুনেই চলে আসবে ওরা।’ গাছটার দিকে ঘাড় তুলল পুলিশটা, ‘জিম মিয়া...হার্ডি মিয়া...কী ভেবেছিলে, অ্যাঁ? আমাদের ফাঁকি দিতে পেরেছ, তাই না? ভালোয় ভালোয় নেমে আসবে এখন, নাকি কুকুরটার সাহায্য নিতে হবে?’

হার্ডি আর জিম দাঁতমুখ খিঁচানো কুটুসের দিকে একবার তাকিয়েই বলে উঠল, ‘আচ্ছা! আচ্ছা! নামছি! নামছি!’

আরও তিন পুলিশম্যান চলে এল অল্পক্ষণের মধ্যেই। কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই ধরা দিল দুই কালপ্রিট। হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ওদের, শেষবারের মতো হিংস্র গরগরানি বেরিয়ে এল সোনালি কুকুরের গলা থেকে।

মোটরবাইকসমেত লোকগুলোকে বড় রাস্তার দিকে মিলিয়ে যেতে দেখল চার মূর্তি।

‘আরেহ!’ বিস্ময় ধরছে না যেন মুকিতের, ‘গরমটা হঠাৎ কমে গেছে মনে হচ্ছে না?’

‘আরেহ, তাই তো!’ দীপ্রও অবাক।

এতক্ষণে ঝিরিঝিরি বাতাস আসছে প্রশান্ত মহাসাগরের দিক থেকে, শীতল পরশ বোলাচ্ছে চার কিশোর আর কুকুরটার ওপর। জুড়িয়ে দিচ্ছে ঘামে ভেজা শরীরগুলো।

‘হউফ! হউফ!’ ডাক শুনে মনে হলো ছেলেদের, একমত হতে পারছে না পাভেলের পোষা কুকুর। হাঁপাচ্ছে জিব বের করে।

‘এতক্ষণ ধরে লাফালাফি করেছিস বলেই গরম লাগছে তোর।’ বিশেষজ্ঞ মত দিল আদনান।

‘দারুণ একটা দুপুর কাটল আজকে!’ হাসি এ কান-ও কান হয়েছে পাভেলের, ‘অথচ ভেবেছিলাম, মাঠেই মারা যাবে সময়টা।’

‘ভাগ্যিস, খরগোশ ধরতে বেরিয়ে পড়েছিল কুটুস মিয়া!’ দীপ্রও হাসছে দাঁত বের করে, ‘এখানে থাকলে তো চিল্লাচিল্লি করত আর ব্যাটারা বুঝে যেত তাতে—মানুষ আছে এখানে। সে ক্ষেত্রে দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে লুকাত হয়তো ব্যাগটা। সেটা হলে কিছু দেখতামও না, কিছু জানতামও না আমরা। মানে, না-ও ধরা পড়তে পারত ডাকাত দুটো।’

‘ঠিকই বলেছ,’ সহমত হলো পাভেল। নিচু হয়ে হাত বুলিয়ে দিল রেশমি কুকুরটার শরীরে। হেসে যোগ করল, ‘ওকে, বয়! আর কোনো দিন বারণ করব না তোকে খরগোশ ধরার ব্যাপারে। ওটা তো তোর জৈবিক অধিকার। কী বলো তোমরা?’

‘ঠিক! ঠিক!’ সমস্বরে বলে উঠল অন্যরা।

‘খাওয়ার সময় হয়ে গেছে কিন্তু!’ হাতঘড়ি থেকে চোখ তুলে বলল মুকিত।

‘চলো! চলো!’ আবারও শোরগোল উঠল চার বন্ধু...থুড়ি, পাঁচ বন্ধুর মাঝে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন