কাজী শাহনূর হোসেনের গল্প—অন্য ভুবন
পর্ব ৩
আঢাকা সত্যিই বড় বিদঘুটে শহর!
আমার ডান পাশে প্রকাণ্ড এক বিলবোর্ড। ওতে লেখা: আমরা আঢাকাকে ভালোবাসি! আমরা ঢাকার চাইতে কোনো অংশে কম নই। বরং আমরাই হচ্ছি সত্যিকারের তিলোত্তমা মহানগরী!
আমি অবশ্য মোটেও তা মনে করি না। আমি আমার প্রিয় ভুবনে ফিরতে চাই।
শেষমেশ, ক্লিনার্সের দোকানটি খুঁজে পেলাম। দীপন আর ওর বাবার একগাদা কাপড়চোপড় বুঝে নিলাম। তারপর চোখের পলকে ওখান থেকে হাওয়া হয়ে গেলাম। হনহনিয়ে পা চালাচ্ছি রাস্তা দিয়ে। কিন্তু কোথাও যেন কিছু একটা গোলমেলে ঠেকছে। কারণ, ওই কোনাটায় যখন ফিরলাম, বিলবোর্ডটা আমার বাঁয়ে থাকার কথা। কিন্তু এখন ওটার কোনো চিহ্নমাত্র নেই।
চারপাশে চকিতে চাউনি বোলালাম। কোনো কিছুই পরিচিত ঠেকল না। এবার রাস্তার ওপারে এক আকাশছোঁয়া অ্যাপার্টমেন্ট ভবন দেখলাম। ওটার রংটা আমার পৃথিবীর, আমাদের পাড়ার একটা বাড়ির মতো ‘আমির হোসেন প্লাজা’। ভাবলাম, দারোয়ান চাচা হয়তো আমাকে দীপনের বাসার পথটা বাতলে দিতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ওর ঠিকানাটা তো আমি জানি না ছাই! শুধু এটুকু জানি, ওটা দেখতে সম্ভবত আমাদের বাড়িটার মতোই। অবশ্য একটু হেরফের থাকলেও থাকতে পারে।
একদৌড়ে বাড়ির কাছে গেলাম। কিন্তু কোনো দ্বাররক্ষীর ছায়ামাত্র চোখে পড়ল না। ওখানে আসলে আদৌ কোনো বাড়ির অস্তিত্বই নেই! আমি যেটাকে বাড়ি ভেবেছিলাম, ওটা আদতে একটা নকল সম্মুখভাগ, সিনেমার সেটের মতো।
ওটার সামনে যে ঝোপগুলো রয়েছে, সেগুলো সব সবুজ প্লাস্টিকের। একটা ট্যাগ দেখলাম। ওটায় লিখে রেখেছে, ‘বাস্তবসম্মত ঝোপঝাড়। টেকে বেশি। যত্ন লাগে কম। আসলের চাইতেও সেরা।’
ঢোঁক গিললাম। আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? ওই যে, যেসব দুঃস্বপ্নে তুমি কোথাও একটা পৌঁছাতে চাইছ, অথচ বারবার ভুলোর ছলনায় পড়ে ঘুরে মরছ।
রাস্তার মাঝখানে একটা খোলা ম্যানহোল। ওটার চারপাশে পুলিশের ব্যারিকেড। একটা লেখা টাঙিয়ে রেখেছে, ‘উদ্বোধনী দিনের বিপদ-আপদ সম্পর্কে সতর্কবার্তা! বোকার মতো টুপ করে পড়ে যাবেন না! আঘাত পেতে পারেন! এবং বেআইনি কাজ থেকে বিরত থাকুন!’
আরে! এটা দিয়ে আমি হয়তো আমার জগতে ফিরে যেতে পারব! দীপনের বাসা যদি খুঁজে না পাই, মেডিসিন ক্যাবিনেট দিয়ে যদি গলতে না-ও পারি, এখান দিয়ে হয়তোবা কেটে পড়তে পারব! নর্দমার ভেতর দিয়ে চলাফেরা করা যদিও সুখের কোনো ব্যাপার নয়, কিন্তু পরোয়া করলাম না আমি। অন্তত এখান থেকে বেরোনোর পর নিজের বাসায় তো পৌঁছানো যাবে! নিদেনপক্ষে ঢাকায়!
ট্রাফিক বাতির রং পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছি আমি। আবারও অনন্তকাল লেগে গেল। এবার ঊর্ধ্বগতিতে ছুটে ম্যানহোলটার কাছে পৌঁছালাম। যা আছে কপালে। কিন্তু যেই না নিচের দিকে ঝুঁকেছি, অমনি কাঁধের ওপর একটা ভারী থাবা এসে পড়ল।
ঘাড় ফিরিয়ে চাইলাম। আমার ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে এক বিশালদেহী পুলিশ। লোকটাকে দেখে জান উড়ে গেল। তার বুকে, প্লাস্টিকের ব্যাজে ‘মাহমুদ’ নামটি লেখা।
‘অত কাছে যেয়ো না, ঢাকায় পড়ে যাবে তো,’ সতর্ক করল সে। ‘বুঝতে পেরেছ, বাবু?’
‘বুঝেছি, স্যার। কিন্তু ম্যানহোলটা তো ঢাকা নয়, আঢাকা,’ বললাম। ‘তবে আমি এর ভেতরে ভুলেও পড়তে যাব না।’
এবার দুজনই আমরা হেসে উঠলাম। পুলিশটি ভাব দেখাল সে আশ্বস্ত হয়েছে আমি ঢাকায় পড়ার মতো আহাম্মকি করব না।
‘তাহলে সরে থাকো, কেমন?’ বলল সে।
সুবোধ বালকের মতো তার নির্দেশটি মানলাম। ম্যানহোলের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। বুঝলাম আমার কথা তার বিশ্বাস হয়নি। তবে পুলিশটিকে এখন আর আমার অত ভয় লাগছে না। ঠিক করলাম, তার সাহায্য চাইব।
‘উম, আঙ্কেল,’ বললাম, ‘আমি না হারিয়ে গেছি। বাসায় ফিরছিলাম। বোধ হয় রাস্তা ভুল করেছি।’
‘তোমার বাসার ঠিকানাটা বলো, বাবু।’
‘আমার ঠিকানা?’
‘হ্যাঁ।’
‘আ-আমি আ-আসলে ঠিক জানি না,’ কোনোমতে তো-তো করে বললাম। ‘ঠিকানাটা মনে করতে পারছি না।’
‘ঠিকানা ভুলে গেছ?’
‘কিছুক্ষণ আগেও মনে ছিল।’
বিচিত্র দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইল সে। কিন্তু দীপনদের বাড়িটার বর্ণনা যখন দিলাম, মন দিয়ে শুনল।
‘ও, বুঝেছি,’ বলল। ‘চলো, তোমাকে ওখানে নিয়ে যাই।’
আমার একটা হাত ধরল সে। এবার হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে একটা কোনা ঘুরল।
ওই যে, দীপনদের বাড়ি! পরোপকারী পুলিশ সদস্যটিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে, ঝেড়ে দৌড় দিলাম। আমার হাত থেকে নিস্তার পেয়ে বোধ হয় বাঁচল বেচারা।
দীপনদের ভবনের ঠিক বাইরেই একটা পত্রিকার দোকান। আমাদের বাড়ির বাইরেও ঠিক যেমনটা রয়েছে। সব কটা সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বড় বড় শিরোনাম,
‘বিপদ! আজ উদ্বোধনী দিন! নাগরিকদের সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে!’
বিপদ? কিসের বিপদ? একটা পত্রিকা তুলে নিয়ে পড়তে লাগলাম।
‘আজ, সকালের প্রথম ভাগে, আঢাকার নাগরিকেরা আরেকবার সুযোগ পাবেন, কিছু ফাটল আর ফাঁকফোকরের মধ্য দিয়ে উঁকি মেরে, আমাদের সমান্তরাল পৃথিবীর জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণের। তবে বিকল্প জগৎটিতে কেউ ভুলেও পা রাখার কোনো রকম চেষ্টা করবেন না! “আঢাকা সমান্তরাল পৃথিবী ইনস্টিটিউট”-এর প্রফেসর সদরুদ্দীন ভূঁইয়া আঢাকার বাসিন্দাদের বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ভোর ছটা নাগাদ এই ফাটলগুলো উন্মুক্ত হতে পারে এবং এর ব্যাপ্তিকাল থাকবে প্রায় দুঘণ্টা। তারপর এগুলো কঠোরভাবে বন্ধ হয়ে যাবে এবং পরবর্তী ৩০ বছরের মধ্যে আর খুলবে না। সুদীর্ঘ ৩০টি বছর অচেনা অন্য আরেকটি পৃথিবীতে বসবাস করা কারও জন্যই নিশ্চয় সুখকর নয়, যতই কিনা গুজব রটানো হোক ওটা আমাদের মাতৃগ্রহটির চাইতে সব দিক দিয়ে সেরা, কিন্তু আসলে তা নয়।’
হাতঘড়ি দেখলাম। সেরেছে! পৌনে আটটা! আমার হাতে আর মাত্র ১৫ মিনিট আছে। তারপরই উবার এসে পড়বে এবং আমার বাবার সঙ্গে, পিপন সেজে সাভার চলে যাবে দীপন বিচ্ছুটা। আর আমার নিজের পৃথিবীতে ফেরার সব কটা দরজা বন্ধ হয়ে যাবে ৩০ বছরের জন্য! ওহ্, কী ঝকমারি!
প্রাণপণে দৌড় লাগালাম দীপনদের বাড়ির উদ্দেশে।
ছয়
দস্তুরমতো হাঁপাতে হাঁপাতে দীপনদের অ্যাপার্টমেন্টটিতে ফিরলাম। ড্রয়িংরুমের সোফার ওপর ধোয়া কাপড়গুলো ধপ করে ফেলে দিলাম। এবার ধেয়ে গিয়ে ঢুকলাম বাথরুমে।
মেডিসিন ক্যাবিনেটের পেছন দিকটায় সজোরে চাপ দিলাম। কিন্তু অভিশপ্ত জিনিসটা এতটুকু কাঁপল না পর্যন্ত। দীপন নিঃসন্দেহে এক পৃথিবী থেকে আরেক পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়টি আমার চাইতে ঢের ভালো জানে!
এ সময় পেছনে কারও পায়ের আওয়াজ পেলাম। চরকির মতো ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি দীপনের বাবা অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছেন আমার দিকে।
‘দীপন,’ বললেন তিনি, ‘তুই এখানে কী করছিস বল তো?’
তাঁকে কি সত্যি কথাটা বলে দেব? নাকি তিনি আসলে আমার শত্রু? এখনো সেটা জানি না তো। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বুঝতে পারছি, না বলে আমার কোনো উপায়ও নেই।
‘গল্পটা,’ বললাম, ‘একদমই বিশ্বাস করার মতো নয়। কিন্তু ঘটনা নির্জলা সত্য। তাই আমার এখন সাহায্য দরকার।’
‘বেশ তো,’ বললেন তিনি। ‘কী বলবি ঝটপট বলে ফেল। উবার আসতে ১৫ মিনিটও দেরি নেই।’
‘বলছি,’ বললাম। ‘প্রথম কথা হচ্ছে, আমি আপনার ছেলে, দীপন নই। আমি হুবহু ওর মতো দেখতে অন্য আরেকজন। আর আমার নাম পিপন। আমি সমান্তরাল জগতে থাকি। আমি বাবার সাথে সাভারে আবাহনীর খেলা দেখতে যাচ্ছিলাম। ঠিক যেমন আপনি আর দীপন টাভারে আগমনীর খেলা দেখতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। সব ঝামেলার শুরু হলো আমার রিটেইনারটা যখন মেডিসিন ক্যাবিনেটের ভেতর দিয়ে পড়ে যায়। আমি ওটা হারিয়ে ফেলি, আর খুঁজে পাইনি, ঠিক যেভাবে দীপন ওরটা হারিয়েছে আরকি।’
হাঁ হয়ে গেল দীপনের বাবার চোয়াল। কপাল চাপড়ালেন তিনি।
‘অ্যাঁ!! আ-আমার তো বি-বিশ্বাসই হচ্ছে না!’ বলে উঠলেন।
‘এটাই সত্যি, আঙ্কেল,’ বললাম। ‘বিশ্বাস করুন।’
‘দীপন ওর রিটেইনারটা হারিয়ে ফেলেছে?’ হতবিহ্বল স্বরে বললেন তিনি। ‘এ বছর এটা নিয়ে দশটা হলো!’
বাহ্! দীপন তার মানে আমাকেও ফেল মেরেছে!
‘তুমি জানো ওগুলোর একেকটার দাম কত?’ প্রশ্ন করলেন তিনি।
‘বেশ দামি, তবে আমি কিছুতেই মনে রাখতে পারি না,’ ঝটিতি বললাম। ‘কিন্তু আঙ্কেল, আপনি আমার বাদবাকি কথাগুলো শোনেননি?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুনেছি তো,’ বললেন তিনি। ‘তোমার নাম পিপন। তুমি মেডিসিন ক্যাবিনেটের ওপারে যে সমান্তরাল পৃথিবী আছে, সেখানকার বাসিন্দা, ইত্যাদি ইত্যাদি...।’
‘আপনি আমার কথা বিশ্বাস করেননি, তাই না?’ বললাম।
‘বিশ্বাস করব না কেন?’ পাল্টা বললেন তিনি। ‘আঢাকার সবাই তোমাদের জগৎটার কথা জানে। আর এটা মহা গোপনীয় কোনো বিষয়ও নয়। আর তোমাদের ঢাকা আমাদের আঢাকার চাইতে কোনো অংশেই ভালো নয়, বুঝলে?’
ওহ্, এঁরা সবাই দেখি এ ব্যাপারটিতে ভয়ানক স্পর্শকাতর!
‘আঙ্কেল, আমি তো একবারও তা বলিনি,’ বললাম। ‘দেখুন, বুঝতে পারছি আপনি সমান্তরাল দুনিয়া নিয়ে অনেক কিছু জানেন। তাই আপনি হয়তো বাতলে দিতে পারবেন মেডিসিন ক্যাবিনেটের ভেতর দিয়ে আমি কীভাবে আমার পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারি। খানিক আগেই দীপন যেমনটা করেছে আরকি।’
‘অ্যাঁ! দীপন?’ সবিস্ময়ে বলে উঠলেন তিনি। ‘ও ওপারে চলে গেছে নাকি?’
হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকালাম। যাক, অবশেষে দীপনের বাবার মনোযোগ টানা গেছে।
‘কিন্তু এখন তো প্রায় ৭:৪৯!’ আবারও কপালে করাঘাত করলেন তিনি। ‘আটটায় সব দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে!’
‘আমিও তো ঠিক সে কথাই বলছি, আঙ্কেল,’ বললাম। ‘ঘটনাটা ঘটে গেলে কারোরই আর দুঃখের শেষ থাকবে না। আমি আমার বাবাকে হারাব আর আপনি হারাবেন দীপনকে পাক্কা ৩০ বছরের জন্য! আমি বলছি না এখানে থাকতে আমার খারাপ লাগবে। কারণ, আপনাদের গ্রহটাও আমাদেরটার মতোই সুন্দর। এমনকি তার চেয়েও বেশি সুন্দর। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমি আমার বাবাকে ছাড়া থাকব কীভাবে?’ শেষ দিকে কাঁদো কাঁদো হয়ে এল আমার কণ্ঠস্বর।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে,’ বললেন দীপনের বাবা। ‘তুমি মেডিসিন ক্যাবিনেটের পেছনের দেয়ালে হাত রাখো।’
রাখলাম।
‘চোখ বন্ধ করো। লম্বা শ্বাস নাও। এবার কল্পনা করো, পেছনের অংশটা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। কিছু টের পেলে আমাকে জানাবে।’
তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মানলাম। কাজ হচ্ছে।