আগের পর্বেই আমরা দেখেছি, দৈর্ঘ্য ও সময় পুরোপুরি আপেক্ষিক।
ধরো, দুটি মহাকাশযান সুষম বেগে একে অপরের পাশ দিয়ে উড়ে গেল। তখন এক যানের নভোচারীরা জানালার কাচ দিয়ে অন্য যানের নভোচারীদের দিকে তাকালে কী দেখবেন? তাঁরা দেখবেন, অন্য যানের নভোচারীরা আগের চেয়ে চিকন বা রোগা হয়ে গেছেন এবং খুব ধীরে ধীরে নড়াচড়া করছেন! যানগুলোর বেগ যদি অনেক বেশি হয়, তবে মনে হবে যেন টিভিতে কোনো ধীরগতির মুভি চলছে! যেকোনো জিনিস, যা একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর কাঁপে বা ঘোরে—যেমন ঘড়ির কাঁটা, মানুষের হার্টবিট, সুরশলাকা, এমনকি পরমাণুর কাঁপন—সবকিছুই ধীর হয়ে যাবে। বিজ্ঞানী এডিংটন একবার মজা করে বলেছিলেন, অন্য যানের নভোচারীর হাতের চুরুটটাও যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে জ্বলবে!
আরেকটা মজার ব্যাপার শোনো। ধরো, একজন ৬ ফুট লম্বা নভোচারী তাঁর যানের ভেতর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যানটি যদি অনুভূমিকভাবে মানে আড়াআড়িভাবে ছোটে, তবে তাঁকে দেখতে ৬ ফুটই মনে হবে; কিন্তু তাঁর শরীরটাকে মনে হবে চ্যাপটা! আর তিনি যদি যানের গতির দিকে মাথা দিয়ে সোজা হয়ে শুয়ে পড়েন, তখন তাঁকে আর চিকন মনে হবে না ঠিকই, কিন্তু মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাঁকে আগের চেয়ে অনেক খাটো মনে হবে!
এখন তুমি হয়তো ভাবছ, সত্যিই কি এমনটা চোখে দেখা সম্ভব? আসলে মহাকাশযানগুলো এত প্রচণ্ড বেগে ছুটলে নানা রকম যান্ত্রিক সমস্যার কারণে নভোচারীদের পক্ষে খালি চোখে এসব পরিবর্তন দেখা প্রায় অসম্ভব। অনেক লেখকই আপেক্ষিকতা বোঝানোর জন্য এ ধরনের মজার ও নাটকীয় উদাহরণ দেন। কিন্তু সত্যি বলতে কী, মানুষের চোখ বা আজকালকার কোনো যন্ত্র দিয়েই চলন্ত অবস্থায় এই পরিবর্তনগুলো সরাসরি দেখা সম্ভব নয়। আমরা যখন কোনো পর্যবেক্ষককের কথা বলি, তখন আসলে এমন একজন কাল্পনিক মানুষের কথা বোঝাই, যিনি নির্দিষ্ট কোনো প্রসঙ্গ কাঠামোতে থেকে নিখুঁত যন্ত্রপাতির সাহায্যে আলোর বেগের হিসাব-নিকাশ করে এই পরিবর্তনগুলো বের করতে পারে।
এখানে ছোট্ট একটা মজার তথ্য দিয়ে রাখি। প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলা কোনো বস্তুর তাৎক্ষণিক ছবি তুললে কেমন দেখাবে, তা নিয়ে ১৯৫৯ সালের পর থেকে বিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা করেছেন। সেখানে দেখা গেছে, সাধারণ দৃষ্টির নিয়মের সঙ্গে বস্তুর ছোট হয়ে যাওয়ার এই সূত্র মিলে দারুণ সব অবাক করা ব্যাপার ঘটে। যেমন একটা গোলককে সব সময় বৃত্তাকার থালার মতোই মনে হবে! আবার নির্দিষ্ট কিছু অবস্থায় একটা চারকোনা বাক্স বা ঘনককে মনে হবে যেন সেটা একটু ঘুরে আছে!
যাহোক, দৈর্ঘ্য ও সময়ের পরিবর্তনের মতো বস্তুর ভরেরও কিন্তু আপেক্ষিক পরিবর্তন হয়।
ভর জিনিসটা আসলে কী? খুব সহজ করে বললে, কোনো বস্তুর ভেতর ঠিক কতটুকু পদার্থ আছে, সেটাই হলো তার ভর। ধরো, একটা সিসার বল ও একটা শোলার বল একদম একই আকারের। কিন্তু সিসার বলটার ভর অনেক বেশি। কারণ, ওর ভেতর পদার্থের পরিমাণ অনেক ঘন বা বেশি।
কোনো বস্তুর ভর মাপা যায় দুটি উপায়ে। এক হলো ওজন মেপে, আর অন্যটি হলো বস্তুটিকে ধাক্কা দিয়ে তার গতি বাড়াতে ঠিক কতটুকু বল বা শক্তি লাগছে, তা মেপে।
প্রথম উপায়টা; অর্থাৎ শুধু ওজন মাপাটা খুব একটা ভালো বুদ্ধি নয়। কেন জানো? কারণ, মহাকর্ষ বল একেক জায়গায় একেক রকম। ফলে ওজনের হিসাবটাও সেই অনুযায়ী বদলে যায়। ধরো, তুমি সেই ভারী সিসার বলটাকে একটা অনেক উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গেলে। সেখানে দেখবে তার ওজন একটু কমে গেছে! অথচ বলটার ভেতরের পদার্থের পরিমাণ বা ভর কিন্তু একদম একই আছে। তুমি যদি বলটাকে চাঁদে নিয়ে যাও, তবে তার ওজন পৃথিবীর চেয়ে অনেক কমে যাবে। আর যদি বিশাল গ্রহ বৃহস্পতিতে নিয়ে যাও? সেখানে বলটার ওজন পৃথিবীর চেয়েও বেশ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে!
কিন্তু ভর মাপার দ্বিতীয় উপায়টিতে তুমি পৃথিবীতে থাকো, চাঁদে থাকো বা বৃহস্পতি গ্রহেই থাকো; ফলাফল সব সময় একই আসবে। তবে এই উপায়ে আবার অন্য রকম একটা অদ্ভুত ঝামেলা আছে!
এই উপায়ে চলন্ত কোনো বস্তুর ভর মাপতে হলে দেখতে হয়, সেটির গতি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বাড়াতে ঠিক কতটুকু ধাক্কা বা বল প্রয়োগ করতে হচ্ছে। খুব সহজেই বুঝতে পারছ, একটা হালকা শোলার বলকে গড়িয়ে দিতে যতটুকু ধাক্কা লাগে, লোহার তৈরি ভারী একটা কামানের গোলাকে গড়াতে তার চেয়ে অনেক বেশি ধাক্কা দিতে হবে। মহাকর্ষের প্রভাব ছাড়া মাপা এ ধরনের ভরকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে জড়তা ভর।
কিন্তু মুশকিল হলো, এই জড়তা ভর মাপতে গেলে তোমাকে অবশ্যই সময় এবং দূরত্বের মাপ নিতে হবে। যেমন কামানের গোলার ভর মাপতে হলে দেখতে হবে, একটা নির্দিষ্ট সময়ে এটি কতটা দূরত্ব পার হলো এবং সেই গতি বাড়াতে কতটুকু বল লাগল। আমরা তো একটু আগেই দেখলাম, কে মাপছে তার গতির ওপর ভিত্তি করে সময় ও দূরত্বের মাপ বদলে যায়! যেহেতু সময় ও দূরত্ব আপেক্ষিক, তাই এই হিসাব করে বের করা বস্তুর জড়তা ভরও শেষ পর্যন্ত আপেক্ষিক হয়ে যায়!
পরের অধ্যায়ে আমরা আবার মহাকর্ষীয় ভর এবং এর সঙ্গে জড়তা ভরের কী সম্পর্ক, তা নিয়ে আলোচনা করব। আপাতত আমরা শুধু কোনো পর্যবেক্ষকের মাপা জড়তা ভর নিয়েই কথা বলব।
ধরো, একটা মহাকাশযানে নভোচারীরা একটা আস্ত হাতি নিয়ে যাচ্ছে! নভোচারীরা যেহেতু হাতির সাপেক্ষে স্থির; অর্থাৎ হাতিটাও যানের ভেতর তাদের সঙ্গেই বসে আছে, তাই যানটি যতই জোরে ছুটুক না কেন, নভোচারীদের মাপা হাতির জড়তা ভরের কোনো পরিবর্তন হবে না। নভোচারীদের মাপা হাতির এই ভরকে বলা হয় নিজস্ব ভর বা স্থির ভর। কিন্তু ওই একই হাতির জড়তা ভর যদি এমন কেউ মাপে, যে হাতির সাপেক্ষে গতিশীল (যেমন, পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো পর্যবেক্ষক), তবে তার মাপা ভরকে বলা হবে হাতির আপেক্ষিক ভর। মনে রেখো, কোনো বস্তুর স্থির ভর কখনোই বদলায় না, কিন্তু আপেক্ষিক ভর বদলায়। দুটিই কিন্তু জড়তা ভর মাপারই দুই রকম উপায়। এই অধ্যায়ে আমরা শুধু জড়তা ভর নিয়েই কথা বলছি; তাই যখনই আমি ভর শব্দটি ব্যবহার করব, ধরে নেবে আমি জড়তা ভরের কথাই বলছি।
এর আগে দ্বিতীয় অধ্যায়ে লরেন্টজ সংকোচনের যে সমীকরণটার কথা বলেছিলাম, সেটা দিয়েই কিন্তু দৈর্ঘ্য, সময় ও ভর মাপা যায়। দৈর্ঘ্য ও ঘড়ির কাঁটার চলার হার একই সমানুপাতে বদলায়, তাই তাদের জন্য সমীকরণটাও একই। কিন্তু ভর এবং সময়ের ব্যবধান বদলায় ব্যস্তানুপাতে। মানে ভরের জন্য সমীকরণটি লিখতে হবে ঠিক এভাবে:
কোনো বস্তুর সাপেক্ষে সুষম গতিতে চলা কোনো পর্যবেক্ষক যদি বস্তুটির ভর মাপতে চায়, তবে বস্তুটির স্থির ভরকে ওপরের এই সমীকরণ দিয়ে গুণ করলেই উত্তর পাওয়া যাবে। এখানে v হলো বস্তুটির আপেক্ষিক বেগ এবং c আলোর বেগ।
উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরো, দুটি মহাকাশযানের আপেক্ষিক বেগ সেকেন্ডে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৩৫ কিলোমিটারের কাছাকাছি। তখন যেকোনো যানের নভোচারীরা অন্য যানটির দিকে তাকালে দেখবে, সেই যান লম্বায় অর্ধেক হয়ে গেছে। তার ঘড়িগুলোও অর্ধেক গতিতে চলছে; অর্থাৎ এক ঘণ্টা সময় পার হতে দ্বিগুণ সময় লাগছে এবং তার ভর আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে!
অবশ্য নভোচারীরা নিজেদের যানের ভেতরে সবকিছু একদম স্বাভাবিকই দেখবেন। যান দুটি যদি সত্যিই আলোর বেগে ছুটতে পারত, তবে এক যানের নভোচারীরা ভাবতেন অন্য যানটি ছোট হতে হতে শূন্য হয়ে গেছে, তার ভর অসীম হয়ে গেছে এবং ওই যানের সময় পুরোপুরি থেমে গেছে!
জড়তা ভর যদি এভাবে না বদলাত, তবে রকেটের ইঞ্জিন দিয়ে অনবরত ধাক্কা দিয়ে একটা মহাকাশযানের গতি বাড়াতেই থাকা যেত, যতক্ষণ না তা আলোর বেগকে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে এমনটা ঘটা সম্ভব নয়। কারণ, যানটি যত জোরে ছুটবে (ধরো, পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে থাকা কারও সাপেক্ষে), ঠিক যে হারে এর দৈর্ঘ্য ও সময় কমতে থাকবে, একই হারে এর আপেক্ষিক ভরও বাড়তে থাকবে।
যানটি যখন ছোট হতে হতে তার আসল দৈর্ঘ্যের ১০ ভাগের এক ভাগে পৌঁছাবে, তখন তার আপেক্ষিক ভর বেড়ে আসল ভরের ১০ গুণ হয়ে যাবে! ফলে রকেটের ইঞ্জিনকে যানটিকে সামনে ঠেলতে ১০ গুণ বেশি বাধা পার হতে হবে। অর্থাৎ যানটি স্থির থাকলে গতি বাড়াতে যতটুকু বল লাগত, এখন তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি বল লাগবে। তাই আলোর বেগে পৌঁছানো কখনোই সম্ভব নয়। যদি পৌঁছানো যেতও, তবে বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে মনে হতো যানটির দৈর্ঘ্য শূন্য হয়ে গেছে, ভর অসীম হয়ে গেছে এবং ইঞ্জিনগুলো অসীম শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। অন্যদিকে, যানের ভেতরের নভোচারীরা নিজেদের মধ্যে কোনো পরিবর্তনই দেখতেন না। কিন্তু তাঁরা দেখতেন পুরো মহাবিশ্ব আলোর বেগে পেছনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। মহাবিশ্বের সময় একদম থমকে গেছে এবং প্রতিটি নক্ষত্র চ্যাপটা থালার মতো হয়ে অসীম ভরের হয়ে গেছে!
আলোর চেয়েও বেশি বেগে ছুটে চলা কোনো মহাকাশযান থেকে নভোচারীরা কী দেখতে পাবেন, তা নিয়ে শুধু কল্পবিজ্ঞানের লেখকেরাই কল্পনা করার সাহস দেখাতে পারেন! হয়তো মনে হবে পুরো মহাবিশ্ব উল্টে গেছে এবং আয়নার প্রতিবিম্বের মতো হয়ে গেছে, নক্ষত্রগুলোর ভর ঋণাত্মক হয়ে গেছে এবং মহাবিশ্বের সময় চলছে পেছনের দিকে!
তবে আমি আগেই বলে রাখি, আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের সমীকরণগুলো থেকে এমন কোনো উপসংহার কিন্তু টানা যায় না। আলোর বেগকে যদি ছাড়িয়ে যাওয়া যায়, তবে ওই সমীকরণগুলো দৈর্ঘ্য, সময় ও ভরের এমন মান দেবে, যেগুলো তোমাদের কাছে অপরিচিত মনে হবে। গণিতবিদেরা এই সংখ্যাকে বলেন কাল্পনিক সংখ্যা। এই সংখ্যাগুলোয় মাইনাস ১-এর বর্গমূল বা রুট থাকে। কে বলতে পারে! হয়তো আলোর বেগের দেয়াল ভাঙতে পারলে মহাকাশযানটি সোজা রূপকথার ল্যান্ড অব ওজের মতো কোনো কল্পনার দেশে গিয়েই হাজির হবে!
নতুন ছাত্ররা যখন জানতে পারে, কোনো কিছুই আলোর চেয়ে জোরে ছুটতে পারে না, তখন আপেক্ষিকতা পড়তে গিয়ে ‘আলোর চেয়েও বেশি বেগ’ কথাটা শুনলে তারা বেশ ঘাবড়ে যায়! এই বিষয়ে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আসলে কী বলে, সেটা বুঝতে হলে আমাদের একটা নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। শব্দটা হলো জড়তা কাঠামো। আগের দিনের লেখকেরা একে গ্যালিলিয়ান সিস্টেম বলতেন। আমরা জড়তা কাঠামো শব্দটাই ব্যবহার করব।
ধরো, একটা মহাকাশযান সুষম বেগে সোজা ছুটে যাচ্ছে। তখন ওই যানটি এবং এর সঙ্গে একই দিকে ও একই বেগে চলা অন্য সব জিনিসকে বলা হয়, তারা একই জড়তা কাঠামোর অংশ। বিজ্ঞানের ভাষায় বললে, এই জড়তা কাঠামো হলো একটা কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা, যার সঙ্গে যানটি যুক্ত। এই নির্দিষ্ট জড়তা কাঠামোর বাইরে গেলে আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব আর কাজ করে না। তখন আলোর চেয়েও বেশি বেগে কোনো কিছু ঘটছে, এমনটা নানাভাবেই দেখা যেতে পারে।
খুব সহজ একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরো, আলোর বেগের চার ভাগের তিন ভাগ (৩/৪) বেগে একটা মহাকাশযান তোমার মাথার ওপর দিয়ে সোজা পূর্ব দিকে ছুটে গেল। ঠিক একই মুহূর্তে, অন্য একটা মহাকাশযান একই বেগে তোমার মাথার ওপর দিয়ে সোজা পশ্চিম দিকে ছুটে গেল। তুমি যেহেতু পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছ, তাই তোমার সাপেক্ষে মনে হবে যান দুটি একে অপরের পাশ দিয়ে আলোর বেগের দেড় গুণ বেগে পার হয়ে যাচ্ছে! তারা ওই প্রচণ্ড বেগেই একে অপরের কাছে আসছে এবং দূরে সরে যাচ্ছে। আপেক্ষিকতা তত্ত্বে এই ব্যাপারটাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু বিশেষ তত্ত্ব জোর দিয়ে একটা কথা বলে, তুমি যদি ওই দুটি যানের যেকোনো একটির ভেতরে বসে থাকতে, তবে হিসাব কষে দেখতে যে যান দুটির আপেক্ষিক বেগ আলোর বেগের চেয়ে কম!
এই আলোচনায় আমরা আপেক্ষিকতার কঠিন অঙ্কগুলো যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছি। কিন্তু লরেন্টজ সংকোচনের মতো নিচের এই সমীকরণটা এতই সহজ যে এটা না দিলেই নয়! ধরো, পৃথিবীর সাপেক্ষে প্রথম যানের বেগ হলো x, আর দ্বিতীয় যানের বেগ হলো y। তাহলে পৃথিবী থেকে দেখলে যান দুটির একে অপরের সাপেক্ষে বেগ হবে x ও y-এর যোগফল। অর্থাৎ x + y। কিন্তু যান দুটির যেকোনো একটির ভেতরে থাকা কোনো পর্যবেক্ষক যদি বেগ মাপেন, তবে তাদের বেগ যোগ করতে হবে এই সমীকরণটি দিয়ে:
এই সমীকরণে c মানে আলোর বেগ। একটু খেয়াল করলেই দেখবে, যান দুটির বেগ যখন আলোর বেগের তুলনায় অনেক কম হয়, তখন এই সমীকরণ থেকে পাওয়া ফলাফল আর আমাদের সাধারণ যোগফলের ফলাফল প্রায় একই হয়। কিন্তু যান দুটির বেগ যদি খুব বেশি হয়, তখন সমীকরণটি একদম ভিন্ন একটা ফলাফল দেয়।
একদম চরম একটা অবস্থার কথা ভাবো! ধরো, মহাকাশযানের বদলে দুটো আলোর রশ্মি তোমার মাথার ওপর দিয়ে উল্টো দিকে ছুটে গেল। পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন দেখবে, আলো দুটো আলোর বেগের দ্বিগুণ (2c) বেগে একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু সে যদি ওই আলোর একটা রশ্মির ওপর চড়ে বসত, তবে এই সমীকরণ অনুযায়ী হিসাব করলে সে পেত শুধুই c! অন্যভাবে বললে, তার কাছে মনে হতো অন্য আলোর রশ্মিটি তার কাছ থেকে ঠিক আলোর বেগেই দূরে সরে যাচ্ছে।
এবার ধরো, তোমার মাথার ওপর দিয়ে একটা আলোর রশ্মি ছুটে গেল, আর ঠিক একই সময়ে উল্টো দিক দিয়ে x বেগে একটা মহাকাশযান ছুটে গেল। পৃথিবীর জড়তা কাঠামো থেকে মনে হবে, আলো ও যানটি একে অপরকে c + x বেগে পার হয়ে যাচ্ছে। তুমি চাইলে ওপরের সমীকরণটি ব্যবহার করে নিজেই হিসাব করে দেখতে পারো, মহাকাশযানের ভেতর থেকে মাপলে আলোর বেগ কত হবে। মজার ব্যাপার হলো, হিসাবের শেষে উত্তর সেই c বা আলোর বেগই আসবে!
আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব তো শুধু জড়তা কাঠামো নিয়ে কাজ করে। এর বাইরেও আলোর বেগকে একটি পরম সীমা হিসেবে ভাবা যায়। তবে তখন কথাটা একটু ঘুরিয়ে বলতে হবে। বলতে হবে, কোনো একটা বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে আলোর চেয়ে বেশি বেগে কোনো সংকেত বা সিগন্যাল পাঠানো একেবারেই অসম্ভব।
এখানে সংকেত বলতে বিশাল অর্থে যেকোনো কিছু বোঝানো হচ্ছে, যা দিয়ে কোনো বার্তা পাঠানো যায়। যেমন, সরাসরি কোনো বস্তু পাঠানো কিংবা শব্দ তরঙ্গ, তড়িৎ–চৌম্বকীয় তরঙ্গ বা কঠিন পদার্থের ভেতর দিয়ে যাওয়া কোনো শক্তির তরঙ্গ পাঠানো। তুমি চাইলেও মঙ্গল গ্রহে আলোর বেগের চেয়ে বেশি বেগে কোনো বার্তা পাঠাতে পারবে না। একটা চিঠি লিখে রকেটে করে পাঠিয়েও লাভ নেই; কারণ, আমরা তো আগেই দেখেছি রকেটের বেগ কখনোই আলোর বেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। তুমি যদি রেডিও বা রাডারে কোড করে বার্তা পাঠাও, তবে তা ঠিক আলোর বেগেই যাবে। এমন কোনো শক্তিই নেই, যা ওই কোডটাকে আলোর চেয়ে বেশি বেগে পাঠাতে পারে।
যদিও আলোর চেয়ে বেশি বেগে কোনো সংকেত পাঠানো যায় না, তবে এমন কিছু গতি আছে যা পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে আলোর বেগের চেয়েও বেশি হতে পারে!
এটা বোঝার জন্য একটা বিশাল কাঁচির কথা কল্পনা করি। কাঁচির ব্লেড দুটি এত লম্বা যে পৃথিবী থেকে নেপচুন গ্রহ পর্যন্ত চলে গেছে! এবার কাঁচিটা সুষম বেগে বন্ধ হতে শুরু করল। তখন কী হবে? কাঁচির দুই ব্লেড যে জায়গাটায় একে অপরকে ছেদ করে, অর্থাৎ কাটার পয়েন্টটা, সেই বিন্দুটা প্রচণ্ড বেগে কাঁচির ডগার দিকে ছুটতে থাকবে। ধরো, তুমি কাঁচির মাঝখানের সেই স্থির পিনটার ওপর বসে আছো। তোমার সাপেক্ষে ওই ছেদবিন্দুটা এত জোরে ছুটবে যে, খুব জলদিই সেটা আলোর বেগকে ছাড়িয়ে যাবে! তবে মনে রেখো, এখানে কিন্তু সত্যি সত্যি পদার্থের তৈরি কোনো বস্তু ছুটছে না, ছুটছে জ্যামিতিক একটা বিন্দু।
তোমার মাথায় হয়তো এখন দারুণ একটা বুদ্ধি এসেছে। হয়তো ভাবছ, ‘আচ্ছা, কাঁচির হাতল দুটি যদি পৃথিবীতে থাকে আর ছেদবিন্দুটা নেপচুনে থাকে, তাহলে আমি হাতলটা একটুখানি নাড়ালেই তো নেপচুনের বিন্দুটাও নড়ে উঠবে! তাহলে কি আমি চোখের পলকেই নেপচুনে সংকেত পাঠাতে পারব না?’
এর উত্তর হলো, না, পারবে না! কারণ, তুমি যখন কাঁচির হাতলে ধাক্কা দেবে, সেই ধাক্কাটা পদার্থের এক অণু থেকে আরেক অণুতে পার হয়ে কাঁচির ডগা পর্যন্ত যেতে হবে। আর অণু থেকে অণুতে এই ধাক্কা যাওয়ার বেগ সব সময়ই আলোর বেগের চেয়ে কম হয়। বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে একেবারে শক্ত বা নমনীয় নয়—এমন কোনো বস্তু হতেই পারে না। এমন কিছু যদি থাকত, তবে তুমি পৃথিবী থেকে নেপচুন পর্যন্ত একটা বিশাল শক্ত লাঠি বাড়িয়ে দিয়ে এর এক প্রান্ত নাড়লেই সঙ্গে সঙ্গে অন্য প্রান্তে বার্তা পৌঁছে যেত! তাই ওই বিশাল কাঁচি বা কোনো শক্ত বস্তু দিয়েই আলোর চেয়ে বেশি বেগে সংকেত পাঠানো সম্ভব নয়।
আরও একটা মজার উদাহরণ দিই। অনেক দূরে থাকা বিশাল বড় একটা পর্দার ওপর যদি একটা শক্তিশালী সার্চলাইট ফেলা হয়, আর তুমি যদি লাইটটা এদিক-ওদিক ঘোরাও, তবে পর্দার ওপর আলোর গোল স্পটটা কিন্তু আলোর চেয়েও বেশি বেগে ছুটে বেড়াবে! এখানেও কিন্তু কোনো বাস্তব বস্তু ছুটছে না, এই গতিটা আসলে আমাদের চোখের একটা ভুল। তুমি যদি সার্চলাইটটা মহাকাশের দিকে তাক করে ঘোরাতে থাকো, তবে আলোকরশ্মির একদম দূরের অংশটা মহাকাশের ভেতর দিয়ে আলোর বেগের চেয়েও বহুগুণ বেশি বেগে ছুটে যাবে। এমনকি এমন অসিলোস্কোপ যন্ত্র তৈরি করা যায়, যার পর্দায় একটা আলোর রশ্মি আলোর চেয়েও বেশি বেগে কোনো কিছু লিখতে পারে।
এর পরের আলোচনায় আমরা দেখব, পৃথিবীকে একটি স্থির কাঠামো হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তখন পৃথিবীর সাপেক্ষে আকাশের তারাগুলোর ঘোরার বেগ আলোর বেগের চেয়ে অনেক বেশি মনে হবে! মাত্র দশ আলোকবর্ষ দূরে থাকা কোনো নক্ষত্রের পৃথিবীর চারদিকে ঘোরার বেগ হবে আলোর বেগের প্রায় বিশ হাজার গুণ! আলোর দেয়াল ভাঙার এই জ্যামিতিক উপায় দেখার জন্য অবশ্য আকাশের তারার দিকে তাকানোরও দরকার নেই। একটা ছোট্ট শিশু যখন একটা লাটিম ঘোরায়, তখন ওই লাটিমের সাপেক্ষে চাঁদের ঘোরার বেগ আলোর বেগকে অনেক পেছনে ফেলে দেয়। আরও পরে আমরা পড়ব, মহাবিশ্ব নিয়ে একসময়ের খুব জনপ্রিয় একটা তত্ত্ব অনুযায়ী, দূরের গ্যালাক্সিগুলো হয়তো পৃথিবী থেকে আলোর চেয়েও বেশি বেগে দূরে সরে যাচ্ছে। তবে এই উদাহরণগুলোর কোনোটিই কিন্তু আমাদের সেই আসল কথার বিরোধিতা করে না। মানে কোনো অবস্থাতেই এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে আলোর চেয়ে বেশি বেগে সংকেত পাঠানো সম্ভব নয়।
বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ফল হলো, কিছু নির্দিষ্ট অবস্থায় শক্তি ভরে রূপান্তরিত হতে পারে, আবার কিছু অবস্থায় ভরও শক্তিতে পরিণত হতে পারে। আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, এই মহাবিশ্বে মোট ভরের পরিমাণ কখনোই বদলায় না, এবং মোট শক্তির পরিমাণও কখনো বদলায় না। এই নিয়মগুলোকে তাঁরা ভরের নিত্যতা সূত্র এবং শক্তির নিত্যতা সূত্র বলতেন। কিন্তু এখন এই দুটি সূত্র মিলে একটা মাত্র সূত্র তৈরি হয়েছে, যার নাম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্র।
রকেটের ইঞ্জিন যখন একটা মহাকাশযানের গতি বাড়ায়, তখন সেই ইঞ্জিনের শক্তির একটা অংশ মহাকাশযানের আপেক্ষিক ভর বাড়াতে খরচ হয়। আবার ধরো, তুমি চুলায় একটা কফির পট গরম করছ। তাপ দিলে পটটির ভেতরের অণুগুলোর গতি বেড়ে যায় এবং একই সঙ্গে কফির পটের ভর বা ওজন আগের চেয়ে সামান্য একটু বেড়ে যায়! আবার কফি যখন ঠান্ডা হতে থাকে, তখন এর ভরও একটু কমে যায়। যখন একটা ঘড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন তার ভর খুব সামান্য পরিমাণে বেড়ে যায়। আবার ঘড়িটা চলতে থাকলে সেই ভর আবার কমে যায়। ভর কমা-বাড়ার এই পরিমাণ এতই সামান্য যে সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের হিসেবে একে পাত্তাই দেওয়া হয় না।
কিন্তু ভর যখন শক্তিতে রূপ নেয়, তখন সেই পরিবর্তনটা কিন্তু মোটেও সামান্য নয়; বিশেষ করে যখন একটা হাইড্রোজেন বোমা ফাটে!
বোমা বিস্ফোরণ হলো বোমার ভেতরের পদার্থের ভরের একটা অংশের হঠাৎ করে প্রচণ্ড শক্তিতে পরিণত হওয়া। আমাদের সূর্য থেকে যে বিপুল শক্তি ছড়িয়ে পড়ে, তার পেছনের ঘটনাটাও ঠিক একই। সূর্যের প্রচণ্ড মহাকর্ষ বল এর ভেতরের হাইড্রোজেন গ্যাসকে এত বেশি চাপে আর এত বেশি তাপমাত্রায় রাখে যে, হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো জোড়া লেগে হিলিয়াম গ্যাসে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় কিছু ভর সরাসরি শক্তিতে বদলে যায়। ভর ও শক্তির এই সম্পর্কটা যে সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করা হয়, তা এখন প্রায় সবাই জানে।
e = mc²
এখানে e হলো শক্তি, m ভর এবং c² আলোর বেগের বর্গ; মানে আলোর বেগকে আলোর বেগ দিয়ে গুণ করলে যা হয়। আইনস্টাইন তাঁর বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকেই এই সমীকরণটি আবিষ্কার করেছিলেন। এই সমীকরণটা দেখলেই তুমি খুব সহজে বুঝতে পারবে, অতি সামান্য একটু ভর থেকে কী ভয়ংকর বিশাল পরিমাণ শক্তি বের হতে পারে! সূর্যের এই বিপুল শক্তি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো প্রাণেরই জন্ম হতো না। তাই এক অর্থে বলা যায়, আমাদের পুরো জীবনটাই এই ছোট্ট একটা সমীকরণের ওপর নির্ভরশীল। আবার এখন মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সব প্রাণের শেষ বা ধ্বংসের উপায়ও যেন এই সমীকরণের ভেতরেই লুকিয়ে আছে! এই সহজ সমীকরণটার ভেতরে যে ভয়ংকর সত্যটা লুকিয়ে আছে, তার সঙ্গে আমরা কীভাবে মানিয়ে চলব, তা শেখাই এখন মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এটা মোটেও বাড়িয়ে বলা কথা নয়!
তবে বোমার বিস্ফোরণ হলো বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের অনেকগুলো প্রমাণের মধ্যে একটা উদাহরণ মাত্র। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের গবেষণাপত্রটি প্রকাশ হওয়ার পর এর কালির দাগ শুকানোর আগেই যেন এই তত্ত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণগুলো বিজ্ঞানীদের হাতে আসতে শুরু করেছিল। সত্যি বলতে, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে নিখুঁতভাবে প্রমাণিত তত্ত্বগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
পরমাণু বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে প্রতিদিন এই তত্ত্বের প্রমাণ পাচ্ছেন। তাঁরা এমন সব অতি ক্ষুদ্র কণা নিয়ে কাজ করেন, যেগুলো প্রায় আলোর বেগে ছুটে চলে। এই কণাগুলো যত জোরে ছোটে, এদের গতি আরও একটু বাড়াতে তত বেশি শক্তির দরকার হয়। অন্য কথায়, এদের গতি যত বাড়ে, এদের আপেক্ষিক ভরও তত বেড়ে যায়!
ঠিক এই কারণেই বিজ্ঞানীরা কণাগুলোর গতি বাড়ানোর জন্য আরও বড় বড় যন্ত্র তৈরি করে চলেছেন। কণাগুলো যখন আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন এদের ভর এত বেড়ে যায় যে সেই ভারী কণাকে আরও জোরে ধাক্কা দেওয়ার জন্য বিজ্ঞানীদের আরও বেশি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের দরকার হয়। তুমি শুনলে অবাক হবে, এখন ল্যাবরেটরিতে ইলেকট্রনকে আলোর বেগের ০.৯৯৯৯৯৯৯৯৯ গুণের চেয়েও বেশি বেগে ছোটানো সম্ভব! এত প্রচণ্ড বেগে ছোটার কারণে প্রতিটি ইলেকট্রনের ভর এর স্থির ভরের চেয়ে প্রায় চল্লিশ হাজার গুণ বেড়ে যায়!
শুধু ভর নয়, সময়ের আপেক্ষিক পরিবর্তনও ল্যাবরেটরিতে মাপা যায়। উদাহরণ হিসেবে মেসন কণার কথা বলা যায়। খুব দ্রুত ছুটে চলা একটি মেসন কণার আয়ু, ধীরে চলা একটি মেসনের চেয়ে অনেক বেশি হয়। কারণ মেসন কণাটি যত জোরে ছোটে, তার ভেতরের নিজস্ব সময় তত ধীর হয়ে যায়।
মহাবিশ্বে প্রতিটি কণারই একটা বিপরীত কণা থাকে, যাদের গঠন এক, কিন্তু বৈদ্যুতিক চার্জ উল্টো। যখন কোনো কণা তার বিপরীত কণার সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন তারা দুজনেই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। আর তাদের দুজনের ভেতরের পুরো ভরটাই আলো বা বিকিরণ শক্তি হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে শুধু খুব অল্প আয়ুর একটা-দুটি কণা নিয়েই এই পরীক্ষাটা করতে পেরেছেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যদি কখনো সত্যি সত্যিই অ্যান্টিম্যাটার বা বিপরীত বস্তু (যা বিপরীত কণা দিয়ে তৈরি) বানাতে পারেন, তবে তাঁরা পরমাণু শক্তির সবচেয়ে চরম রূপটি হাতে পেয়ে যাবেন।
ধরো, একটা মহাকাশযানে খুব সামান্য একটু অ্যান্টিম্যাটার চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে শূন্যে ভাসিয়ে রাখা হলো। এরপর সেটাকে যদি খুব ধীরে ধীরে সাধারণ বস্তুর সঙ্গে মেশানো হয়, তবে সেখান থেকে এত বিশাল শক্তি তৈরি হবে, যা ওই যানটিকে অনায়াসেই দূরের নক্ষত্রদের কাছে নিয়ে যেতে পারবে!
বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব পরীক্ষাগারে এত নিখুঁতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, আজকাল এমন একজন পদার্থবিজ্ঞানীও খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি এই তত্ত্বের সত্যতা নিয়ে একবিন্দুও সন্দেহ করেন।
এতক্ষণে আমরা জেনে গেছি, সুষম গতি হলো আপেক্ষিক। কিন্তু মহাবিশ্বের সব রকম গতিই আপেক্ষিক—এই চূড়ান্ত কথাটা বলার আগে আমাদের শেষ একটা বাধা পার হতে হবে। সেই বাধা হলো জড়তা। এই জড়তার বাধাটা আসলে কী এবং আইনস্টাইন কীভাবে সেই কঠিন বাধা পার হয়েছিলেন, সেটাই আমরা পরের দিন আলোচনা করব!