অবশেষে নতুন দলের দেখা পেলেন এমি মার্তিনেজ
একজন ভালো গোলরক্ষক পারেন পুরো দলের চিত্র বদলে দিতে। কথাটা আর্জেন্টাইন ভক্তদের মতো ভালো আর কেউ জানেন না। বছরের পর বছর ধরে অদক্ষ গোলরক্ষকদের কারণে ভুগতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। সেখানে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ হাজির হয়েছিলেন আশীর্বাদ হিসেবে। তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর থেকে যেন বদলে গিয়েছে আর্জেন্টিনা। দুটি কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ, আরেকবার ফাইনাল খেলা—সবকিছুর পেছনের ‘হিরো’ এমি। এমনকি ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালেও ১১টি সেভ করেছেন গোলবারের নিচে। জাতীয় দলের হয়ে দুর্দান্ত খেলা গোলরক্ষক প্রায় দুই মৌসুম ক্লাব বদলাতে চাইছিলেন। দ্বারে দ্বারে ঘুরে অবশেষে পেলেন একটি দল। কিন্তু এত দিন তাঁকে কেউ নিতে চাচ্ছিল না কেন?
আর্সেনাল থেকে অ্যাস্টন ভিলা
ঘটনা বুঝতে ফেরত যেতে হবে ২০২০ সালে, এমি মার্তিনেজ তখনো ফুটবলজগতে একেবারেই অপরিচিত নাম। আর্সেনালের দ্বিতীয় গোলরক্ষক হিসেবে আছেন অনেক দিন। কিন্তু খেলার সুযোগ পান না বললেই চলে। এমন সময় ব্র্যান্ড লেনোর চোটে ভাগ্য খুলে যায় মার্তিনেজের। একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে জায়গা করে নেন আর্সেনাল–ভক্তদের মনে। কিন্তু ভক্তদের মনে জায়গা করে নিলে কী হবে, মূল গোলরক্ষক হিসেবে তখনো তেমন আস্থার পাত্র হতে পারেননি। ফলে লেনো সুস্থ হতেই তাঁকে ফিরতে হলো বেঞ্চে। কিন্তু এমি তত দিনে তারকা, তিনি কেন দলের মূল ভরসা হবেন না! সেই চিন্তা থেকেই আর্সেনাল ছেড়ে যোগ দিলেন অ্যাস্টন ভিলায়।
অ্যাস্টন ভিলায় যোগ দেওয়াটা ছিল এমির জন্য সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। নিয়মিত যেমন খেলার সুযোগ পাচ্ছিলেন, তেমনই তার ওপর চাপও কমে এসেছিল। ফলে নিজের ওপর যে আত্মবিশ্বাস না খেলতে খেলতে হারিয়ে ফেলেছিলেন, সেটা ফেরত পেয়েছিলেন দ্রুতই। অন্যদিকে জাতীয় দলে লিওনেল স্কালোনি সুযোগ করে দিলেন মূল গোলরক্ষক হিসেবে। ফলাফল? এমি মার্তিনেজ হয়ে উঠলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকদের একজন।
বিদায় বলেও হলো না বিদায়
২০২২ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, এমি মার্তিনেজকে বোধ হয় বড় কোনো দল কিনে নেবে চড়া দামে। সেটা হয়নি। এমি থেকে গিয়েছেন অ্যাস্টন ভিলাতেই। বড় কোনো দল তাঁকে কেনার জন্য আগ্রহ দেখায়নি। ২০২৪-২৫ মৌসুমের ঘটনা তো আরও করুণ। লিগের শেষ ম্যাচে এমি মার্তিনেজ রীতিমতো কান্না করে বিদায় বলেছিলেন অ্যাস্টন ভিলার সমর্থকদের। তাঁর সেই কান্নাজড়িত ভিডিও এখনো দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সবাই ভেবেছিলেন, বড় কোনো দলে খেলার সুযোগ বুঝি হলো তাঁর। কিন্তু কেউ আসেনি তাঁকে কিনতে। গুঞ্জন ছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, এমনকি বার্সেলোনার সঙ্গেও জুটি বাঁধতে যাচ্ছেন এমি। কিন্তু কেউ শেষ পর্যন্ত রাজি হয়নি দলে নিতে। অগত্যা বিদায় নেওয়ার পরও তাঁকে খেলতে হয়েছিল অ্যাস্টন ভিলায়।
গত মৌসুমে মার্তিনেজ ফিরেছেন আগের ফর্মে। অ্যাস্টন ভিলাকে জিতিয়েছেন তাদের ইতিহাসের প্রথম ইউরোপিয়ান শিরোপা। চোট নিয়েও ইউরোপা লিগের ফাইনাল খেলে জিতেছেন শিরোপা। সেই পদক গলায় ঝুলিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বকাপে। ফাইনাল পর্যন্ত পারফরম্যান্স যেমন তেমন হলেও কাঁপিয়ে দিয়েছেন শেষ ম্যাচে। ১১টি সেভ দিয়ে দলের জয় আনতে পারেননি বটে, কিন্তু দর্শকদের মন আরেকবার জিতে নিয়েছেন তিনি।
কিন্তু এবারও যেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। অ্যাস্টন ভিলায় যোগ দিয়েছেন জাপানের তরুণ গোলরক্ষক জিওন সুজুকি। ফলে এমি মার্তিনেজের জায়গাটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁকে কেনার জন্য বেশ আগ্রহ দেখিয়েছিল জুভেন্টাস। কিন্তু বেশ অনেক দিন কথাবার্তা হওয়ার পর শেষ মুহূর্তে এমিকে বাদ দিয়ে তারা নিয়েছে টটেনহামের গুলিয়েলমো ভিকারিওকে। গুঞ্জন আছে, এমিকে কিনতে চেয়েছিল ইন্টার মায়ামি, ইন্টার মিলানের মতো দল। কিন্তু কিছুদূর কথাবার্তা হওয়ার পরই আবারও ঘুরেফিরে ফেরত যায় প্রতিটি দল।
এমিকে কেন নিতে চাইত না দলগুলো
এর কারণ খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। অনেকেই আঙুল তুলেছেন তাঁর আচরণের দিকে। এমি মার্তিনেজের উগ্র আচরণের কারণে বড় দলগুলো তাঁর সঙ্গে নিজেদের জড়াতে চায় না। বড় দলগুলোর লক্ষ্য থাকে ভালো খেলার সঙ্গে সঙ্গে তরুণ ও কিশোরদের জন্য আইডল তৈরি করা। সেখানে এমি মার্তিনেজ একেবারেই বেমানান। অতঃপর আসে তাঁর পারফরম্যান্সও। কাপ টুর্নামেন্ট, অর্থাৎ যেখানে নক আউট রাউন্ডের খেলা হয়, সেখানে এমি যতটা দুর্দান্ত, লিগে ততটাই দুর্বল। অর্থাৎ টানা ৩৮ ম্যাচের লিগে তাঁর ভুলগুলো স্পষ্ট হয়ে চোখে পড়ে। কিন্তু বড় ম্যাচে তিনি হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। এ কারণে বড় দলগুলো তাঁর ওপর ভরসা রাখতেও ভয় পায়। এরপরও বড় দলগুলো তাঁকে টানত, যদি দলের জন্য বেঞ্চে থাকতে রাজি হতেন তিনি। কিন্তু এমি তাতে রাজি নন। যে দলেই যান না কেন, ৩৩ বছর বয়সে তিনিই থাকতে চান প্রথম পছন্দ হিসেবে। আর সবশেষে আসে টাকার প্রশ্ন। চুক্তিতে যেতে গেলেই যেন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় সবাইকে, সেটাই এখনো সমাধান করতে পারেননি তাঁর এজেন্ট।
তাই তো গুঞ্জন আছে, পরপর দুই বছর অ্যাস্টন ভিলা থেকে নতুন দল খুঁজে না পাওয়ায় নিজের এজেন্টকে বরখাস্ত করেছেন তিনি। আর এরপরই আরও দুই দলের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু হয়েছে তাঁর। লন্ডনের দুই প্রান্তের দল চেলসি ও টটেনহাম একই সঙ্গে আগ্রহ দেখিয়েছে তাঁর দিকে।
অবশেষে চেলসিতে এমি
ফাব্রিজিও রোমানোর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চেলসি এর মধ্যে এমি মার্তিনেজকে কেনার সব বন্দোবস্ত পাকা করে গেছে। ৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে তাঁকে অ্যাস্টন ভিলা থেকে কিনছে তারা। মার্তিনেজও চেলসির প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছেন। কারণ, চেলসিতে বেশ কয়েক বছর ধরেই ভালো একজন গোলরক্ষকের বেশ অভাব। জাবি আলোনসোর দলেও গোলবারের নিচে পরীক্ষিত ও ছটফটে কাউকে দরকার। সব মিলিয়ে চেলসির সঙ্গে এমির বনিবনা হবে ভালোই।
দুই বছরের চেষ্টার পর অবশেষে নিজের পছন্দসই দলে ভেড়ার সুযোগ হয়েহে এমির। এখন দেখার বিষয়, বড় দলে গিয়ে কতটা চমক দেখাতে পারেন তিনি।