ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: ক্লাসে হইচই

১. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: প্রথম পর্ব

২. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: শূন্যের ভেলকি

৩. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: মৌলিক সংখ্যার রহস্য

৪. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: সৈকতে সংখ্যার খেলা

৫. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: নারকেলগাছের নিচে

৬. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: ফিবোনাচ্চি এবং তাঁর খরগোশ বাহিনী

৭. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: বিশাল ত্রিভুজ

অধ্যায় আট

রোহান ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লাসে তার সবচেয়ে ভালো দুই বন্ধু রাজ ও রাহিন। ওদের সঙ্গেই সে ফুটবল খেলে। আর আছে আনিসা। ওর মাথায় দুটি বেণি। ওরা বরাবরের মতো সামনের বেঞ্চে বসে আছে। এখন ওদের মধ্যে যথারীতি তর্ক চলছে।

আমার ঠিক এটাই দরকার ছিল, ভাবল রোহান। স্কুল নিয়ে স্বপ্ন! ঠিক সেই মুহূর্তে দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল। আর ক্লাসে মিস্টার বাকের ঢুকল না, ঢুকল সংখ্যার ভূত।

‘শুভ সকাল,’ সে বলল। ‘তোমরা দেখছি আবার ঝগড়া করছ।’

‘আনিসা আমার জায়গায় বসে আছে,’ বলল রাজ।

‘তাহলে জায়গা বদল করো।’

‘ও তো নড়ছেই না।’

‘রোহান, বোর্ডে রাজের জন্য A এবং আনিসার জন্য B লেখো,’ ভূতটা বলল।

কেন নয়, ভাবল রোহান। তাতে যদি ভূতটা খুশি হয়।

RA (রাজ ও আনিসা পাশাপাশি বসেছে)

‘আনিসা,’ ভূতটা বলল, ‘আমি চাই তুমি রাজের সঙ্গে জায়গা বদল করো।’

কোনো এক অদ্ভুত কারণে আনিসা কোনো ঝামেলা করল না। সে উঠে গিয়ে রাজের সঙ্গে জায়গা বদল করল।

AR (এবার আনিসা আগে বসেছে, রাজ পরে)

রোহান তা বোর্ডে লিখে রাখল।

ঠিক সেই মুহূর্তে দরজাটা আবার খুলে গেল এবং ইরা ঢুকল। সে বরাবরের মতো আজও দেরিতে এসেছে। ইরা বসল আনিসার পাশে।

EAR (প্রথমে ইরা, পরে আনিসা এবং শেষে রাজ)

রোহান তা–ও বোর্ডে লিখে রাখল।

কিন্তু আনিসার এটা পছন্দ হলো না। ‘আমি যদি বাঁয়ে বসি, তাহলে আমি একেবারে বাঁয়েই বসব।’

‘হায় রে কপাল!’ চেঁচিয়ে উঠল ইরা।

দুজনে আবার জায়গা বদল করল:

AER (আনিসা, ইরা ও রাজ ক্রমান্বয়ে বসেছে)

তারপর রাজ খেপে গেল। সে বলল, ‘আমি আনিসার পাশে বসতে চাই!’ ফলে শান্তশিষ্ট ইরা কোনো কথা না বলে রাজকে তার জায়গাটা ছেড়ে দিল।

ARE (আনিসা, রাজ ও ইরা ক্রমান্বয়ে বসেছে)

এভাবে চলতে থাকলে ক্লাস আর হবে না, মনে মনে বলল রোহান।

এভাবে চলতেই থাকল। কারণ, রাজ ঠিক করল সে বাঁ দিকে বসবে।

‘তার মানে আমাদের সবাইকে উঠতে হবে,’ আনিসা বলল। ‘আমি জানি না কেন, কিন্তু... ওঠো ইরা।’

সবাই আবার ঠিকঠাক বসার পর এমন দেখাল:

RAE (রাজ, আনিসা ও ইরা বাঁ থেকে ডানে বসেছে)

অবশ্য বেশিক্ষণ এভাবে টিকল না।

‘আমি আর এক মুহূর্তও রাজের পাশে বসব না,’ কিছুক্ষণ পরেই আনিসা বলল। এই আনিসা মেয়েটা না আসলেই একটা যন্ত্রণা। আর যেহেতু আনিসার কথাই শেষ কথা, তাই ছেলেদের উঠে সরে বসতে হলো। তখন রোহান লিখল:

ERA (ইরা, রাজ ও আনিসা পাশাপাশি)

‘যথেষ্ট হয়েছে,’ সে বলল। ‘আর না।’

‘তাই নাকি?’ বলল ভূতটা। ‘ওরা তিনজন এখনো ওদের সব বসার কায়দা শেষ করেনি। ধরো রাজ বাঁয়ে বসল, ইরা মাঝখানে আর আনিসা ডানে?’

‘মরে গেলেও না!’ চেঁচিয়ে উঠল আনিসা।

‘এত ঝামেলা কোরো না তো, আনিসা!’

তিনজনে আবার উঠল এবং জায়গা বদল করে বসল:

REA (রাজ, ইরা ও আনিসা পাশাপাশি)

‘এই রোহান! কিছু খেয়াল করেছ? আমার মনে হয় না ওই তিনজন আর নতুন কোনোভাবে বসতে পারবে।’

রোহান বোর্ডের দিকে তাকাল:

RA, AR, EAR, AER, ARE, RAE, ERA, REA

‘মনে হচ্ছে আমরা সব সম্ভাবনাই চেষ্টা করে দেখেছি।’ সে বলল।

‘তা দেখেছি,’ বলল ভূতটা। ‘কিন্তু ক্লাসে তো তোমরা চারজন ছাড়াও আরও অনেকে আছে। আসলে অনেক শিক্ষার্থীই আছে, আমার ধারণা।’

ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা খুলে গেল আর ডলি হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে ঢুকল।

‘আরে, এখানে কী হচ্ছে? মিস্টার বাকের কোথায়? আর আপনি কে?’ ‘আমি মিস্টার বাকেরের বদলি হিসেবে এসেছি। উনি আজ ছুটি নিয়েছেন। উনি বলেছেন এই ক্লাসের বিশৃঙ্খলা থেকে ওনার একটু বিশ্রাম দরকার।’

‘বুঝতে পারছি কেন।’ বলল ডলি। ‘ওদের দিকে তাকাও। সবাই ভুল জায়গায় বসে আছে। ইরা, তুমি কবে থেকে ওখানে বসো? ওটা তো আমার ডেস্ক!’

‘তুমি কোন জায়গায় বসবে, ডলি?’ ভূতটা জিজ্ঞেস করল। ‘আমরা এতক্ষণ একটা খেলা খেলেছি। তুমি কি আমাদের নিয়মে বসবে?’ ‘তোমার যা ইচ্ছা। চলো চেষ্টা করে দেখি।’

রোহান বোর্ডে নিচের লাইনটা আবার লিখল:

RAED

কিন্তু এই প্রস্তাবে বাকিরা মোটেও খুশি হলো না। ক্লাসের মধ্যে তখন হইহুল্লোড় লেগে গেল। আনিসা ছিল সবচেয়ে খারাপ, কেউ জায়গা ছাড়তে না চাইলে সে কামড়ে একাকার করে দিচ্ছিল। সবাই ধাক্কাধাক্কি শুরু করল। তারপর ধীরে ধীরে মিউজিক্যাল চেয়ারের এই পাগলামিটা ওদের কাছে খেলার মতো মনে হতে লাগল। ওরাও এত দ্রুত জায়গা বদল করতে লাগল যে রোহানের পক্ষে তাল রাখা কঠিন হয়ে পড়ল। তবে শেষমেশ সে তাদের বসার সব কম্বিনেশন বোর্ডে লিখতে পারল:

RAED, ARED, ERAD, DRAE, RADE, ARDE, ERDA, DREA, READ, AERD, EARD, DARE, REDA, AEDR, EADR, DAER, RDAE, ADRE, EDRA, DERA, RDEA, ADER, EDAR, DEAR

ভাগ্যিস আজ ক্লাসে অনেকে আসেনি, ভাবল রোহান। নইলে এটা অনন্তকাল চলত।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা খুলে গেল এবং রাকিব, সাবিনা, রিমা, শারমিন, জনি, পলাশ ও দীপ্ত ঢুকল।

‘না! না!’ রোহান চিৎকার করে উঠল। ‘না! প্লিজ! তোমরা বসো না, নইলে আমি পাগল হয়ে যাব!’

‘ঠিক আছে,’ বলল ভূতটা। ‘আজকের মতো ছুটি। তোমরা সবাই বাড়ি যেতে পারো।’

‘আমিও?’ জিজ্ঞেস করল রোহান।

‘না, তোমাকে আমার কিছুক্ষণ দরকার।’

তার সহপাঠীরা স্কুলমাঠের দিকে দৌড়ে গেলে রোহান বোর্ডের সংখ্যাগুলোর দিকে তাকাল।

‘বলো, কী বুঝলে?’ ভূতটা জিজ্ঞেস করল।

‘আমি ঠিক জানি না।’ বলল রোহান। ‘আমি শুধু জানি, ওরা বসার ধরন খুব দ্রুত বদলেছে। যতক্ষণ মাত্র দুজন ছিল, ব্যাপারটা সহজ ছিল। দুজন শিক্ষার্থী, দুটি সম্ভাবনা। কিন্তু তিনজন হতেই সেটা ছয়টা হলো। আর চারজন হলে—দাঁড়াও—চব্বিশ।’

‘যদি মাত্র একজন থাকে?’

‘এটা কোনো প্রশ্ন হলো! মাত্র একটাই সম্ভাবনা।’

‘চলো গুণ করে দেখি।’ বলল ভূতটা।

‘বুঝেছি,’ রোহান বলল। ‘মজার তো।’

‘তোমার যত বেশি বন্ধু খেলায় যোগ দেবে, ওভাবে লিখে রাখা ততটাই অসুবিধা হবে। তবে একটা ছোট উপায় আছে। তুমি সংখ্যাটা নেবে আর তার পরে একটা আশ্চর্যবোধক চিহ্ন (!) বসাবে। এভাবে:

৪! = ২৪

আর এটাকে পড়বে এভাবে: চার ফ্যাক্টরিয়াল!

‘তোমার কী মনে হয়, তুমি যদি রাকিব, সাবিনা, রিমা, শারমিন, জনি, পলাশ ও দীপ্তকে বাড়ি না পাঠাতে, তাহলে কী হতো?’

‘চরম বিশৃঙ্খলা। হট্টগোল,’ ভূতটা উত্তর দিল। ‘আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি ওরা ধাক্কাধাক্কি আর চিৎকার করছে, নিজেদের অজান্তেই প্রতিটি কম্বিনেশন চেষ্টা করে দেখছে। যুগ পার হয়ে যেত। রাজ, আনিসা আর ইরাকে নিয়ে ওরা মোট ১১ জন হতো। তার মানে ১১ ফ্যাক্টরিয়াল! আন্দাজ করতে পারো সেটা কত?’

‘আমি জানি এটা মুখে মুখে গুণ করতে পারব না। তবে আমি স্কুলে সব সময় ক্যালকুলেটর নিয়ে আসি। অবশ্য লুকিয়ে রাখতে হয়। মিস্টার বাকের ক্যালকুলেটর সহ্য করতে পারেন না। তাই আমি এক নিমেষে তোমাকে উত্তরটা বলছি।’

১ × ২ × ৩ × ৪ × ৫ × ৬ × ৭ × ৮ × ৯ × ১০ × ১১ =

‘এগারো ফ্যাক্টরিয়াল!’ সে উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘তাহলে হলো ঠিক ৩৯,৯১৬,৮০০। বাপ রে! প্রায় চার কোটি!’

‘তার মানে আমরা যদি সব কম্বিনেশন চেষ্টা করতাম, তবে ৮০ বছর পরেও আমরা এখানেই থাকতাম। তোমার বন্ধুরা সব হুইলচেয়ারে থাকত আর ওগুলো ঠেলার জন্য আমাদের ১১ জন নার্স ভাড়া করতে হতো। দেখলে তো একটু গণিত জানা কতটা কাজের হতে পারে? ভালো কথা... জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখো তো তোমার বন্ধুরা এখনো ওখানে আছে কি না।’

‘ওহ, আমি নিশ্চিত ওরা যার যার পথে চলে গেছে।’

‘আমি ধরে নিচ্ছি তোমরা বিদায় নেওয়ার সময় হ্যান্ডশেক করো।’

‘হ্যান্ডশেক! ভাগ্য ভালো থাকলে আমরা বিড়বিড় করে বলি, পরে দেখা হবে।’

‘দুঃখের বিষয়,’ বলল ভূতটা। ‘কারণ আমি ভাবছিলাম ওদের প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে কত সময় নিত।’

‘তুমি ভালো করেই জানো যে অসংখ্য হ্যান্ডশেক হতো। এগারো ফ্যাক্টরিয়াল হয়তো, যেহেতু ওরা এগারোজন।’

‘ভুল!’ বলল ভূতটা।

‘এক মিনিট দাঁড়াও,’ রোহান বলল। ‘বুঝেছি। যদি দুজন থাকত, তবে তারা মাত্র একটা হ্যান্ডশেক করত। যদি তিনজন থাকত...’

‘বোর্ডে লেখার চেষ্টা করো।’

রোহান বোর্ডে লিখল:

‘দুজন মানুষ—একবার হ্যান্ডশেক। তিনজন মানুষ—তিনবার হ্যান্ডশেক। চারজন মানুষ—ছয়বার হ্যান্ডশেক। পাঁচজন মানুষ—দশবার।’

‘এক, তিন, ছয়, দশ... চেনা চেনা লাগছে?’

রোহান মনে করতে পারল না, তাই ভূতটা বোর্ডে কয়েকটা বড় বড় বিন্দু আঁকল:

‘নারকেল!’ রোহান চেঁচিয়ে উঠল। ‘ত্রিভুজ সংখ্যা!’

‘ওগুলো কীভাবে বাড়ে?’

রোহান বোর্ডে লিখল:

১ + ২ = ৩

৩ + ৩ = ৬

৬ + ৪ = ১০

১০ + ৫ = ১৫

১৫ + ৬ = ২১

২১ + ৭ = ২৮

২৮ + ৮ = ৩৬

৩৬ + ৯ = ৪৫

৪৫ + ১০ = ৫৫

‘তার মানে তোমার ঠিক পঞ্চান্নবার হ্যান্ডশেক করতে হতো।’

‘এটা খুব একটা খারাপ না,’ রোহান বলল।

‘আর ওই সব পাটিগণিত এড়ানোর জন্য তুমি এটা করতে পারো। বোর্ডে কয়েকটা বৃত্ত আঁকো:

অক্ষরগুলো দিয়ে তোমার বন্ধুদের বোঝাচ্ছে। রাজের জন্য R, আনিসার জন্য A, ইরার জন্য E ইত্যাদি।

তারপর তুমি অক্ষরগুলো রেখা দিয়ে যোগ করো:

‘সুন্দর, তাই না? যেহেতু প্রতিটি রেখা একবার করে হ্যান্ডশেক বোঝাচ্ছে, তোমাকে শুধু ওগুলো গুনতে হবে।’

‘এক, তিন, ছয়, দশ, পনেরো...আগের মতোই,’ বলল রোহান। ‘শুধু একটা জিনিস আমি বুঝি না। তুমি যা-ই করো না কেন, সব কাজ করে কীভাবে?’

‘এটাই তো সংখ্যার ভূতের কাজ। সবকিছু কাজ করে। আচ্ছা, প্রায় সবকিছুই কাজ করে। কারণ সেই আগের। তোমার মনে আছে? ওদের নিজস্ব সমস্যা আছে। আর তোমাকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে, নইলে তুমি মুখ থুবড়ে পড়বে। এ জন্যই অনেকে সংখ্যা ঘৃণা করে। আমি অগোছালো লোক সহ্য করতে পারি না। আর ওরা সংখ্যা সহ্য করতে পারে না। যা-ই হোক, জানালার কাছে যাও, দেখবে স্কুলমাঠটা ছাগলের খোঁয়াড়ের মতো দেখাচ্ছে।’

রোহানকে মানতেই হলো। স্কুলমাঠজুড়ে ক্যানের বোতল, খবরের কাগজ আর স্যান্ডউইচের প্যাকেট ছড়িয়ে আছে।

‘তোমাদের মধ্যে তিনজন যদি ঝাড়ু হাতে নাও, তবে আধঘণ্টার মধ্যে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

‘কোন তিনজনের কথা ভাবছ?’ জিজ্ঞেস করল রোহান।

‘ধরো রাজ, আনিসা ও ইরা। অথবা ডলি, পলাশ ও দীপ্ত। আর তোমার হাতে শারমিন, রাকিব, সিমা, সাকিবও আছে।’

‘তার মানে কোন তিনজন নেব, সেটা কোনো ব্যাপার না।’

‘ঠিক।’

‘তাহলে আমরা যেকোনোভাবে ওদের দল বানাতে পারি,’ বলল রোহান।

‘আবারও ঠিক। কিন্তু ধরো সবাই উপস্থিত নেই। ধরো ডোলি, পলাশ ও দীপ্ত। তাই আমাদের হাতে মাত্র তিনজন আছে—রাজ, আনিসা ও ইরা।

‘তাহলে ওরাই করবে।’

‘ঠিক আছে। ওটা বোর্ডে লেখো।’

রোহান লিখল:

RAE

‘এখন, যদি ডলি বরাবরের মতো দেরি করে আসে, তখন আমরা কী করব? কী কী সম্ভাবনা আছে?’

রোহান একমুহূর্ত ভেবে নিচের লাইনগুলো লিখল: RAE, RAD, RED ও AED। এই চারভাবে, বলল রোহান।

‘এবার পলাশ এল। ওকে কেন বাদ দেওয়া হবে? তাহলে মোট পাঁচজন প্রার্থী। দেখো তো পাঁচজনকে নিয়ে কী করতে পারো।’ কিন্তু রোহান রাজি হলো না। সে একটু ঘাবড়ে যাচ্ছিল।

‘তুমিই বলো,’ রোহান বলল।

‘ঠিক আছে। তিনজন মানুষ দিয়ে আমরা তিনজনের মাত্র একটা দল বানাতে পারি; চারজন দিয়ে চারটা। আর পাঁচজন দিয়ে আমরা দশটা দল বানাতে পারি। দাও, আমি বোর্ডে লিখে দিই:

একটা বিশেষ জিনিস খেয়াল করো। দেখছ, আমি দলগুলোকে সাজিয়েছি। রাজ বা R দিয়ে কয়টা দল শুরু হয়েছে? ছয়টা (আসলে এখানে ছবিতে ১০টা কম্বিনেশন দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে R দিয়ে শুরু ৬টা: RAE, RAD,RAP, RED, REP, EDP)। আনিসা বা A দিয়ে কয়টা? চারটা। আর ইরা বা E দিয়ে মাত্র একটা। সেই একই সংখ্যাগুলো ফিরে আসছে:

১, ৪, ১০…

আসলে এখানে ত্রিভুজ সংখ্যার প্যাটার্ন বোঝানো হচ্ছে। অনুমান করতে পারো এর পরে কী হবে? মানে, আমরা যদি আরও কয়েকটা নাম যোগ করি: দীপ্ত, সিমা, শারমিন, সাকিব এবং আরও। তখন আমাদের কয়টা দল হবে?’

‘জানি না,’ বলল রোহান।

‘হ্যান্ডশেকের সমস্যার সমাধান আমরা কীভাবে করেছিলাম মনে আছে? যখন প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে?’

‘ওটা তো সহজ ছিল। আমরা ত্রিভুজ সংখ্যা ব্যবহার করেছিলাম:

১, ৩, ৬, ১০, ১৫, ২১...

কিন্তু ওটা আমাদের ঝাড়ুদার বাহিনীর কাজে আসবে না, কারণ এখানে প্রতি দলে তিনজন করে থাকে।’

‘এখন তুমি যদি প্রথম দুটি ত্রিভুজ সংখ্যা যোগ করো?’

‘চার হয়।’

‘আর তার পরেরটা।’

‘দশ।’

‘তার পরেরটা।’

‘১০ + ১০ = ২০।’

‘চালিয়ে যাও।’

‘তুমি কি বলতে চাও আমি ১১ নম্বর পর্যন্ত চালিয়ে যাব? তুমি নিশ্চয়ই মজা করছ।’

‘চিন্তা কোরো না। কোনো পাটিগণিত ছাড়াই তুমি ওখানে পৌঁছাতে পারবে। কোনো অনুমান ছাড়াই।’

‘কীভাবে?’

‘আমাদের সেই পুরোনো সংখ্যার ত্রিভুজ দিয়ে,’ ভূতটা বলল।

‘তুমি কি বলতে চাইছ তুমি বোর্ডে ওটা আঁকবে?’

‘হায় খোদা, না! আমার লাঠিটা যখন হাতের কাছেই আছেই।’

লাঠি দিয়ে বোর্ডে টোকা দিতেই সেটা সেখানে হাজির হলো তার পূর্ণ মহিমায়। লাঠিটাও এখন রঙিন হয়ে গেছে।

‘এর চেয়ে সহজ আর কিছু হতে পারে না,’ সে বলল। ‘হ্যান্ডশেকের জন্য তুমি সবুজ কিউবগুলো ধরে ওপর থেকে নিচে গুনবে। দুজন মানুষের জন্য একবার হ্যান্ডশেক, তিনজনের জন্য তিনবার এবং ১১ জনের জন্য ৫৫ বার।

আমাদের ঝাড়ুদার বাহিনীর জন্য তুমি লাল কিউবগুলো ওপর থেকে নিচে ব্যবহার করবে। আমরা তিনজন মানুষ আর একটা সম্ভাবনা দিয়ে শুরু করি। যখন আমাদের হাতে চারজন থাকে, তখন চারটা কম্বিনেশন হয়। পাঁচজন থাকলে দশটা। যদি তোমার ক্লাসের ১১ জনই আসে, তবে কয়টা হবে?’

‘১৬৫,’ উত্তর দিল রোহান। ‘তুমি ঠিক বলেছ। এটা সহজ। এই সংখ্যার ত্রিভুজটা প্রায় কম্পিউটারের মতোই ভালো। কিন্তু বলো তো, কমলা কিউবগুলো কিসের জন্য?’

‘ওহ, ওগুলো। তুমি হয়তো খেয়াল করেছ, আমরা সংখ্যার ভূতেরা সহজে সন্তুষ্ট হই না; আমরা একটু বাড়াবাড়ি করতে পছন্দ করি। তাই তিনজন মানুষে যদি পরিষ্কারের কাজ না হয় এবং তোমার চতুর্থ একজনের দরকার হয়, আমি চেয়েছিলাম তুমি যেন বুঝতে পারো, তোমার হাতে কতগুলো সম্ভাবনা আছে। ধরো, আটজন মানুষ ঝাড়ুদার বাহিনীর চারজনের দলের জন্য আবেদন করল, তখন কয়টা সম্ভাবনা থাকবে?’

‘৭০,’ রোহান বলল। সংখ্যার ত্রিভুজে উত্তরটা খুঁজে পেতে তার কোনো কষ্ট হলো না।

‘ঠিক,’ ভূতটা বলল। ‘এতক্ষণে তুমি নিশ্চয়ই বুঝে গেছ নীল কিউবগুলো কিসের জন্য।’

‘ঝাড়ুদার বাহিনীর আটজনের দল,’ বলল রোহান। ‘আমার যদি আটজন ভলান্টিয়ার থাকে, তবে মাত্র একটি সম্ভাবনা। কিন্তু ১০ জন থাকলে ৪৫টা। এভাবেই হতে থাকবে।’

‘তুমি ব্যাপারটা ধরে ফেলেছ।’

‘এখন স্কুলমাঠটা দেখতে কেমন লাগছে?’ রোহান জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল। সে ওটা কখনো এত পরিষ্কার দেখেনি। ‘ভাবছি কোন তিনজন এটা করল?’

‘ভালো কথা, তুমি কিন্তু ওদের মধ্যে ছিলে না, রোহান।’

‘তুমি কীভাবে আশা করো আমি স্কুলমাঠ ঝাড়ু দেব? তুমিই তো আমাকে সারা রাত ধরে সংখ্যা আর কিউব ছুড়ে মারছ?’

‘হয়তো আমার কাছ থেকে তোমার একটু বিশ্রাম দরকার।’

‘মানে কী? তুমি কি আর আসছ না?’

‘ভাবলাম আমি একটু ছুটি কাটাই,’ ভূতটা বলল। ‘তুমি তো চাইলে মিস্টার বাকেরের সঙ্গেই সংখ্যা নিয়ে কথা বলতে পারো।’

এটা মোটেও পৃথিবীর সেরা প্রস্তাব ছিল না, কিন্তু রোহানের কোনো উপায়ও ছিল না। তা ছাড়া পরদিন তাকে স্কুলেও যেতে হতো। সে যখন ক্লাসে ঢুকল, দেখল রাজ ও আনিসা তাদের সাধারণ জায়গায় বসে আছে। কাউকেই জায়গা বদলাতে আগ্রহী মনে হলো না।

‘ওই তো জাদুকর আসছে!’ ইরা চেঁচিয়ে উঠল।

‘রোহান তো ঘুমের মধ্যেই অঙ্ক করে ফেলে!’ আনিসা খ্যাপাল।

‘তোমার কি মনে হয়, এতে কোনো লাভ হয়?’ ডলি জিজ্ঞেস করল। ‘খুব একটা না,’ পলাশ বলল। ‘মিস্টার বাকের তো ওকে সহ্যই করতে পারেন না।’

‘অনুভূতিটা দুই দিক থেকেই সমান।’ রোহান জবাব দিল।

রোহান স্কুলমাঠের দিকে একনজর তাকাল। আগের মতোই আছে, একটা আস্ত ডাস্টবিন! তার স্বপ্নের কোনোই মানে নেই। কিন্তু সংখ্যাগুলো রয়ে গেল। সে সংখ্যার ওপর ভরসা করতে পারে। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল এবং ক্লাসে ঢুকলেন সেই অনিবার্য মিস্টার বাকের। তাঁর ব্রিফকেসটা রুটিতে ঠাসা ছিল।

চলবে…