ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: সংখ্যার মিছিল
১. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: প্রথম পর্ব
২. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: শূন্যের ভেলকি
৩. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: মৌলিক সংখ্যার রহস্য
৪. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: সৈকতে সংখ্যার খেলা
৫. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: নারকেলগাছের নিচে
৬. ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: ফিবোনাচ্চি এবং তাঁর খরগোশ বাহিনী
অধ্যায় নয়
রোহান স্বপ্নে দেখল, সে স্বপ্ন দেখছে। ব্যাপারটা এখন তার কাছে গা–সওয়া হয়ে গেছে। যখনই সে কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখত, মনে মনে ভাবত ‘যত ভয়ংকরই হোক, এটা সব স্বপ্ন।’
কিন্তু একদিন তার জ্বর হলো। সারা দিন জ্বর গায়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে আবিষ্কার করল, তার এই কৌশলটা আর কাজ করছে না। জ্বরের সময় স্বপ্নগুলো হয় সবচেয়ে বাজে। শেষবার যখন জ্বরে পড়ে সে বিছানায় ছিল, তখন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের স্বপ্ন দেখেছিল। আগুনের পাহাড়গুলো তাকে আকাশে ছুড়ে মেরেছিল। সে ধীরগতিতে সোজা গিয়ে পড়ছিল আগ্নেয়গিরির ভেতরে। এসব ভাবলেই তার গা শিউরে ওঠে। তাই সে জেগে থাকার চেষ্টা করছিল। যদিও তার মা বারবার বলছিলেন, ‘সবচেয়ে ভালো কাজ হলো ঘুমিয়ে পড়া। এত বেশি বই পড়ো না। এটা স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ!’
তবে বারো নম্বর কমিক বইটা পড়ার পর তার চোখ এত ভারী হয়ে এল যে সেগুলো নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে গেল। আর সে যা স্বপ্ন দেখল তা ছিল অদ্ভুতের চেয়েও অদ্ভুত।
সে দেখল, জ্বরে কাতর হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে আর তার পাশে বসে আছে সংখ্যার ভূত। তার বিছানার পাশের টেবিলে এক গ্লাস পানি ছিল। সে ভাবল, ‘আমার শরীর গরম। জ্বর এসেছে। মনে হয় না আমি ঘুমাচ্ছি।’
‘আর আমার কী হবে?’ ভূতটা জিজ্ঞেস করল। ‘তুমি কি আমাকে স্বপ্নে দেখছ, নাকি আমি সত্যিই এখানে আছি?’
‘আমি নিশ্চিত নই,’ বলল রোহান।
‘তাতে কী আসে যায়?’ বলল ভূতটা। ‘আমি শুধু রোগীকে দেখতে এসেছি। আর যেহেতু তুমি অসুস্থ ও তোমাকে বিছানায় থাকতে হবে, তাই মরুভূমিতে গাছ বাওয়া বা গ্রামে গিয়ে খরগোশ গোনা সম্ভব নয়। তাই ভাবলাম আমরা ঘরেই একটা শান্ত সন্ধ্যা কাটাব। তোমার মন ভালো করার জন্য আমি সঙ্গে কিছু সংখ্যা নিয়ে এসেছি। আমি কথা দিচ্ছি, ওগুলো একদম নিরীহ।’
‘তুমি তো সব সময় সেটাই বলো।’
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
‘ভেতরে এসো!’ ভূতটা হাঁক দিল।
মার্চ করতে করতে ওরা ভেতরে ঢুকল। ওদের দেখে রোহানের ম্যারাথন দৌড়বিদদের কথা মনে পড়ল। কারণ, ওদের সাদা টি-শার্টের ওপর সংখ্যা লেখা ছিল। ওরা এত বেশি পরিমাণে আসতে লাগল যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রোহানের ঘরটা ভরে গেল। প্রথমে সে এত ছোট জায়গায় এতজনের গাদাগাদি দেখে অবাক হলো, কিন্তু তারপর সে বুঝতে পারল, যত বেশি ভিড় বাড়ছে, দরজাটা তত দূরে সরে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ সংখ্যাগুলো সেখানে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি আর বকবক করল। তারপর সংখ্যার ভূত তার সেরা সেনাপতির গলায় চিৎকার করে বলল, ‘অ্যাটেনশন! প্রথম সারি, লাইনে দাঁড়াও!’ আর সঙ্গে সঙ্গে ওরা দেয়াল ঘেঁষে লাইনে দাঁড়িয়ে গেল। একজন সবার আগে, বাকিরা তার পেছনে ক্রম অনুযায়ী।
‘শূন্য কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল রোহান।
‘শূন্য, সামনে এবং মাঝখানে!’ ভূতটা গর্জন করে বলল।
শূন্য বিছানার নিচে লুকিয়ে ছিল। সেখান থেকে সে খুব লজ্জিত মুখে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল।
‘আমি ভেবেছিলাম আমাকে দরকার হবে না। আমি আজ নিজের মধ্যে নেই। সম্ভবত আমার ফ্লু হয়েছে। আমি অসুস্থতার ছুটি চাইছি।’
‘ছুটি মঞ্জুর!’ ভূতটা চেঁচিয়ে উঠল। শূন্য আবার রোহানের বিছানার নিচে সুড়সুড় করে ঢুকে গেল।
‘ওই শূন্যটা সব সময় ঝামেলা পাকায়। নিজেকে বিশেষ কিছু ভাবে। কিন্তু বাকিরা—আশা করি তুমি বুঝতে পারছ ওরা কতটা বাধ্য।’
সে এক সারি সাধারণ সংখ্যা দেখে যারপরনাই খুশি হলো:
‘দ্বিতীয় সারি, লাইনে দাঁড়াও!’ সে চিৎকার করে বলল। সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যার এক নতুন দল হুড়মুড় করে ঢুকে প্রচণ্ড হট্টগোল আর হইচই করে নিজেদের জায়গা খুঁজে নিল:
ওরা ঠিক অন্যদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ফলে ঘরটাকে এখন আরও বেশি অন্তহীন সুড়ঙ্গের মতো মনে হচ্ছিল। ওরা সবাই একই রকম লাল টি-শার্ট পরে ছিল।
‘বুঝেছি,’ বলল রোহান। ‘এগুলো বিজোড় সংখ্যা।’
‘ঠিক। আমি চাই এখন তুমি আন্দাজ করো দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানো সাদা টি-শার্ট পরা সাথিদের তুলনায় ওরা সংখ্যায় কতগুলো।’
‘এটা তো জানা কথা,’ বলল রোহান। ‘একটা বাদ দিয়ে আরেকটা বিজোড় সংখ্যা। তাই লালের সংখ্যা সাদার ঠিক অর্ধেক।’
‘তুমি বলতে চাইছ বিজোড় সংখ্যার তুলনায় সাধারণ সংখ্যা দ্বিগুণ।’
‘হ্যাঁ’
সংখ্যার ভূত হাসল, কিন্তু হাসিটা খুব একটা ভালো শোনাল না। রোহানের মনে হলো ওটা বিদ্রূপের হাসি।
‘তোমাকে হতাশ করার জন্য দুঃখিত, বাছা। কিন্তু তুমি যেমনটা দেখছ, একটার সংখ্যা অন্যটার ঠিক সমান।’
‘হাস্যকর!’ রোহান চেঁচিয়ে উঠল। ‘সবগুলো আর অর্ধেক তো সমান হতে পারে না।’
‘ভালো করে দেখো, আমি তোমাকে দেখাচ্ছি আমি কী বোঝাতে চাই।’ সে সংখ্যাগুলোর দিকে ফিরে গর্জন করে উঠল, ‘প্রথম ও দ্বিতীয় সারি, হ্যান্ডশেক করো!’
‘তোমার কি ওদের ওপর চিৎকার না করলে হয় না?’ রোহান রেগে বলল। ‘এটা তো আর সেনাবাহিনীর ব্যারাক না। একটু ভদ্র হওয়ার চেষ্টা করো।’
কিন্তু তার প্রতিবাদ কানেই নিল না ভূতটা। কারণ, ততক্ষণে ওরা জোড়া বেঁধে ফেলেছে এবং প্রতিটি সাদা সৈন্য একেকটি লাল সৈন্যের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে:
‘দেখলে? প্রতিটি সাধারণ সংখ্যার জন্য এক থেকে শুরু করে নিজস্ব একটি বিজোড় সংখ্যা আছে। তুমি কি আমাকে সঙ্গীহীন একটাও লাল দেখাতে পারবে? সুতরাং সাধারণ সংখ্যার পরিমাণও অসীম এবং বিজোড় সংখ্যার পরিমাণও অসীম। অসীম, বুঝেছ?’
রবার্ট কিছুক্ষণ ভাবল।
‘তার মানে, আমি যদি একটা অসীম পরিমাণকে অর্ধেক করি, তবে আমি দুটো অসীম পরিমাণ পাব। কিন্তু তাহলে তো পুরোটা আর অর্ধেকের আকার সমানই হলো।’
‘ঠিক,’ বলল ভূতটা। ‘আর শুধু তাই নয়।’ সে পকেট থেকে একটা বাঁশি বের করে ফুঁ দিল। সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যার এক নতুন কলাম অন্তহীন ঘরের গভীর থেকে বেরিয়ে এল। এগুলো সবুজ টি-শার্ট পরা। ভূতটা হুকুম না দেওয়া পর্যন্ত ওরা ধাক্কাধাক্কি করতে করতে এল। ভূতটা চেঁচিয়ে বলল, ‘তৃতীয় সারি, লাইনে দাঁড়াও!’
চোখের পলকে সবুজ সংখ্যাগুলো লাল ও সাদা সঙ্গীদের সামনে একটি পরিপাটি লাইন তৈরি করল:
‘প্রিমা ডোনা,’ তাদের টি-শার্টের সংখ্যা দেখে রোহান বলল।
সংখ্যার ভূত কেবল মাথা নাড়ল। তারপর সে বাঁশিতে আরেকটা ফুঁ দিল। তারপর আরেকটা, এবং আরও একটা। সঙ্গে সঙ্গে নরক গুলজার হয়ে গেল। একটা দুঃস্বপ্ন! কে জানত যে একটা ঘরে এত সংখ্যা আঁটতে পারে! যদিও ঘরটা এখন চাঁদে যাওয়ার রাস্তার মতো লম্বা হয়ে গেছে। নিশ্বাস নেওয়ার মতো বাতাসও আর অবশিষ্ট নেই। রোহানের মাথাটা যেন একটা জ্বলন্ত লাইটবাল্ব হয়ে গেছে।
‘থামো! থামো! আমি আর পারছি না!’
‘তোমার ফ্লু তোমাকে কাবু করে ফেলছে,’ ভূতটা বলল। ‘আমি নিশ্চিত, কাল সকালে তুমি ভালো বোধ করবে।’
তারপর সে সংখ্যাগুলোর দিকে ফিরে চিৎকার করল, ‘সবাই শোনো! চার, পাঁচ, ছয় ও সাত নম্বর সারি লাইনে দাঁড়াও! জলদি!’
রোহান তার ঝাপসা হয়ে আসা চোখেজোড়া জোর করে মেলে দেখল, সাত রকমের সংখ্যা। সাদা, লাল, সবুজ, নীল, কমলা, কালো ও গোলাপি টি-শার্ট পরে আছে ওগুলো। একে অপরের পেছনে পরিপাটি হয়ে অন্তহীন সারিতে দাঁড়িয়ে আছে:
গোলাপি টি-শার্টের ওপরের সংখ্যাগুলো এত বড় হয়ে যাচ্ছিল যে টি-শার্টে আর ধরছিল না। রোহানের পক্ষে ওগুলো পড়াই দায় হয়ে গেল।
‘ওরা এত দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে! আমি কখনোই তাল মেলাতে পারব না।’
‘ফ্যাক্টোরিয়াল!’ বলল ভূতটা। ‘ফ্যাক্টোরিয়াল চিহ্নওয়ালা সংখ্যাগুলো:
৩! = ১ × ২ × ৩
৪! = ১ × ২ × ৩ × ৪
এভাবে চলতে থাকবে। তাল মেলানো কঠিন, তাই না? কিন্তু বাকিদের কী খবর? ওদের চিনতে পারছ?’
‘দেখি। লালগুলো বিজোড়, সবুজগুলো নাকউঁচু বা প্রিমা ডোনা, নীলগুলো সম্পর্কে আমি জানি না, তবে চেনা চেনা লাগছে।’
‘খরগোশের কথা ভাবো।’
‘ওহ, হ্যাঁ। ফিবোনাচ্চি। তার মানে কমলা সংখ্যাগুলো নিশ্চয়ই ত্রিভুজ সংখ্যা।’
‘মন্দ বলোনি। ফ্লু হোক আর যা-ই হোক, তোমার উন্নতি হচ্ছে।’
‘কালোগুলো অবশ্যই বর্গ সংখ্যা: ২২, ২৩, ২৪…।’
‘আর প্রতিটি রঙের পরিমাণ সমান,’ ভূতটা বলল।
‘অসীম পরিমাণ,’ রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল। ‘ভয়ংকর, তাই না। একদম জনসমুদ্র।’
‘এক থেকে সাত নম্বর সারি, ছুটি!’ ভূতটা গর্জন করে বলল।
জুতো ঘষার শব্দ, ধাক্কাধাক্কি, হাঁপানো আর পায়ের আওয়াজ তুলে সংখ্যাগুলো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তাদের জায়গায় নেমে এল এক চমৎকার নিস্তব্ধতা। রোহানের ঘরটা আগের মতোই ছোট আর খালি হয়ে গেল।
‘এখন আমার শুধু একটা অ্যাসপিরিন আর এক গ্লাস পানি দরকার।’
‘সঙ্গে ভালো ঘুম হলেই কাল তুমি উঠে বসতে পারবে,’ রোহানকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ভূতটা বলল।
‘কিন্তু আমাদের হাতে যা বাকি আছে, সেটা শেষ করা পর্যন্ত কি তুমি চোখ খোলা রাখতে পারবে?’
‘কীসের বাকি?’
‘ব্যাপারটা হলো,’ সে আবার লাঠিটা নেড়ে বলল, ‘আমরা সংখ্যাগুলোকে বের করে দিলাম কারণ ওরা তোমার ঘর নোংরা করছিল। কিন্তু আমাদের এখনো সিরিজ নিয়ে কাজ বাকি।’
‘সিরিজ? সিরিজ আবার কী?’
‘আচ্ছা, তুমি নিশ্চয়ই ভাবো না যে সংখ্যাগুলো শুধু সৈন্যদের মতো দাঁড়িয়েই থাকে? ওদের একটাকে অন্যের সঙ্গে মেলালে কী হয়? মানে যখন ওদের একসঙ্গে যোগ করা হয়?’
‘তুমি কী বলছ আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না,’ রোহান গোঙানি দিয়ে বলল।
কিন্তু ততক্ষণে সংখ্যার ভূত তার লাঠি দিয়ে ছাদের ওপর প্রথম সিরিজটা এঁকে ফেলেছে।
‘তুমি না বললে আমার বিশ্রাম দরকার।’
‘এতে তোমার খুব একটা খাটুনি হবে না। তোমাকে শুধু পড়তে হবে ওখানে কী লেখা আছে।’
‘ভগ্নাংশ!’ রোহান আবার গোঙাল। ‘ইয়াক!’
‘মানে কী? ভগ্নাংশের চেয়ে সহজ আর কী হতে পারে? এগুলো দেখো!’
‘হাফ,’ পড়তে শুরু করেছে রবার্ট, ‘যোগ এক-চতুর্থাংশ, যোগ এক-অষ্টমাংশ, যোগ এক-ষোড়শাংশ, যোগ এক-বত্রিশাংশ, ইত্যাদি…। ওপরে সব এক আর নিচে সব বর্গ সংখ্যা। ঠিক কালো টি-শার্টের মতো। দুই, চার, আট, ষোল, বত্রিশ...। আমি নিশ্চিত এরপর কী আসবে।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু এগুলো সব যোগ করলে কী পাওয়া যাবে?’
‘আমার কোনো ধারণা নেই। যদিও সিরিজটা যদি কখনো শেষ না হয় তবে যোগফলও নিশ্চয়ই কখনো শেষ হবে না। অন্যদিকে, এক-চতুর্থাংশ হাফের চেয়ে ছোট, এক-অষ্টমাংশ আবার এক-চতুর্থাংশের চেয়ে ছোট, এবং এভাবে চলতে থাকবে। তাই আমি যে সংখ্যাগুলো যোগ করব সেগুলো ছোট থেকে আরও ছোট হতে থাকবে।’
রোহান যখন আবার ছাদের দিকে তাকাল, তখন সংখ্যাগুলো উধাও হয়ে গেছে। সংখ্যার জায়গায় একটা লম্বা লাইন এসেছে:
‘আমার মনে হয় আমি বুঝেছি,’ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে বলল। ‘তুমি অর্ধেক দিয়ে শুরু করেছ, তারপর অর্ধেকের অর্ধেক যোগ করেছ, বা এক-চতুর্থাংশ যোগ করেছ।’
সে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ছাদে সাদা-কালোয় সংখ্যাগুলো ফুটে উঠল:
‘তুমি চালিয়ে যাও, আগের সংখ্যার অর্ধেক যোগ করতে থাকো। এক-চতুর্থাংশের অর্ধেক হলো এক-অষ্টমাংশ, এক-অষ্টমাংশের অর্ধেক এক-ষোড়শাংশ, এভাবে চলতেই থাকবে। টুকরাগুলো ছোট থেকে আরও ছোট হবে, এত ছোট যে শিগগিরই আর দেখাই যাবে না। ঠিক সেই প্রথম রাতে ভাগ করা চুইংগামের টুকরোটার মতো।
তুমি মুখ নীল করে ফেলা পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারো, কিন্তু কখনোই এক (১) নম্বর সংখ্যায় পৌঁছাতে পারবে না। প্রায় পৌঁছে যাবে, কিন্তু পুরোপুরি না।’
‘ভালো, আমি চাই তুমি চালিয়ে যাও।’
‘আমি আর চাই না। আমার জ্বর হয়েছে, তা কি তোমার মনে আছে?’
‘এটাই তো পয়েন্ট। তুমি ক্লান্ত হতে পারো, কিন্তু সংখ্যা ক্লান্ত হয় না,’ বলল ভূতটা। ‘ওরা অনন্তকাল ধরে চলতেই পারে।’
হঠাৎ ছাদের ওপরের লাইনটা বদলে নিচেরটা এল:
‘খুব ভালো!’ ভূতটা চেঁচিয়ে উঠল। ‘চমৎকার! চালিয়ে যাও।’
‘কিন্তু আমি ক্লান্ত। আমার ঘুমানো দরকার।’
‘ঘুম?’ ভূতটা বলল। ‘তুমি তো ঘুমাচ্ছই। তুমি আমাকে স্বপ্নে দেখছ, তাই না? আর তুমি কেবল ঘুমালেই স্বপ্ন দেখতে পারো।’
এর উত্তরে রোহানের কিছু বলার ছিল না। যদিও তার মনে হচ্ছিল, তার মগজ গলে জেলি হয়ে যাচ্ছে।
‘ঠিক আছে, আমি তোমার আরেকটা পাগলাটে আইডিয়া মেনে নিচ্ছি, কিন্তু তারপর আমাকে বিশ্রাম দিতে হবে।’
ভূতটা লাঠি তুলল, তুড়ি বাজাল; সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন একটা সিরিজ ছাদে ভেসে উঠল:
‘এটা তো ঠিক আগেরটার মতোই,’ বলল রোহান। ‘গরু ঘরে না ফেরা পর্যন্ত আমি যোগ করে যেতে পারি। কিন্তু যেহেতু প্রতিটি সংখ্যা আগেরটার চেয়ে ছোট, তাই যোগফল কখনোই এক হবে না।’
‘তাই মনে হয় তোমার? তাহলে চলো একটু কাছ থেকে দেখি। যেমন ধরো প্রথম দুটো সংখ্যা।’
এখন ছাদে সিরিজের শুধু প্রথম দুটো সংখ্যা রইল:
‘উত্তর কত?’
‘আমি জানি না,’ বিড়বিড় করে বলল রোহান।
‘বোকা সেজো না। কোনটা বেশি? অর্ধেক নাকি এক-তৃতীয়াংশ?’
‘অবশ্যই অর্ধেক!’ রোহান বিরক্ত হয়ে বলল। ‘তুমি আমাকে কী ভাবো?’
‘থাক, থাক। শুধু বলো যে কোনটা বেশি? এক-তৃতীয়াংশ নাকি এক-চতুর্থাংশ?’ ‘এক-তৃতীয়াংশ, অবশ্যই।’
‘তাহলে আমাদের হাতে দুটো ভগ্নাংশ আছে, যার দুটোই এক-চতুর্থাংশের চেয়ে বড়। আর দুটো এক-চতুর্থাংশে কত হয়?’
‘কী বোকা প্রশ্ন! দুটো এক-চতুর্থাংশে অর্ধেক হয়।’
‘ভালো। ১/২ + ১/৩ হলো ১/৪ + ১/৪-এর চেয়ে বেশি। আমরা যদি সিরিজের পরের চারটা অংশ নিই এবং যোগ করি, তবে ওগুলোও অর্ধেকের চেয়ে বেশি হবে। দেখো:
‘এটা আমার জন্য বেশি জটিল,’ রোহান গজগজ করল।
‘বাজে কথা!’ ভূতটা চেঁচিয়ে উঠল। ‘কোনটা বেশি? এক-চতুর্থাংশ নাকি এক-অষ্টমাংশ?’
‘এক-চতুর্থাংশ।’
‘কোনটা বেশি, এক-পঞ্চমাংশ নাকি এক-অষ্টমাংশ?’
‘এক-পঞ্চমাংশ।’
‘ঠিক। আর এক-ষষ্ঠাংশ ও এক-সপ্তমাংশের জন্যও একই কথা খাটে। এই ভগ্নাংশগুলো দেখো:
এরা সবাই এক-অষ্টমাংশের চেয়ে বড়। আর চারটা এক-অষ্টমাংশে কত হয়?’
রোহান উত্তর দিতে চাইছিল না, কিন্তু শেষমেশ বলল, ‘চারটা এক-অষ্টমাংশে ঠিক অর্ধেক হয়।’
‘চমৎকার। তাহলে এখন আমাদের হাতে আছে:
খেয়াল করলে দেখবে, আমরা যদি সিরিজের প্রথম ছয়টা অংশ যোগ করি, তবে তা একের চেয়ে বেশি হয়। আমরা এভাবে যতক্ষণ খুশি চালিয়ে যেতে পারি।’
‘না, না!’ রোহান চিৎকার করে উঠল। ‘প্লিজ!’
‘কিন্তু যদি আমরা চালিয়ে যেতাম—চিন্তা কোরো না, আমরা যাব না—তবে এটা আমাদের কোথায় নিয়ে যেত?’
‘অসীমে, আমার ধারণা,’ রোহান বলল।
‘কী শয়তানি বুদ্ধি তোমার।’
‘শুধু সমস্যা হলো এতে অনন্তকাল সময় লাগত। এমনকি আমরা যদি বিদ্যুতের গতিতেও কাজ করতাম, তবু আমরা বিশ্ব শেষ হওয়ার আগে প্রথম হাজারেও পৌঁছাতে পারতাম না। সিরিজটা এতই ধীরে বাড়ে।’
‘তাহলে ওটা ওভাবেই থাক।’
‘হ্যাঁ, ওটা ওভাবেই থাক।’
এই বলে ছাদের ওপরের লেখাগুলো ফিকে হতে শুরু করল। সংখ্যার ভূত পাতলা হতে হতে প্রায় মিলিয়ে গেল। সময় বয়ে চলল।
রোদ এসে নাকে সুড়সুড়ি না দেওয়া পর্যন্ত রোহান ঘুম থেকে উঠল না।
‘যাক বাবা, জ্বরটা ছেড়েছে,’ কপালে হাত রেখে মা বললেন।
ততক্ষণে সে ভুলে গেছে, এক থেকে অসীমে পিছলে যাওয়াটা কত সহজ এবং কতটা ধীর হতে পারে।
চলবে…