‘ওরে ডাক একদিন। বানাইয়া প্যাকেট করি।’ বেঞ্চে টোকা দিতে দিতে বলল রাতুল। ইভানের কাছ থেকে জিকোর পুরো ঘটনা শুনে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ওর। টিফিনের পর স্কুল ছুটি হয়ে গেছে আজ। হুট করে ছুটি হয়ে যাওয়ায় স্কুলের দেয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে আছে ইভান আর রাতুল। বন্ধুকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে রাতুল আবার বলল, ‘দেখ ইভান, দেশে মিনিমাম চার-পাঁচ হাজার জিকো আছে। আছে না?’
‘থাকতে পারে।’
‘এ রকম একটা–দুইটা জিকো না থাকলে দুনিয়ার কোনো ক্ষতি হবে না।’ রাতুলের সিরিয়াসনেস দেখে হাসি আটকাতে পারল না ইভান। বিরক্ত হলো রাতুল।
‘কিরে? হাসলি যে?’
‘ধুর, বাদ দে।’
‘এত সুশীল হওয়ার ভং ধরিস না। ডাইকা আন। হাঁটুর মালাই চাকি খুইলা বাসায় পাঠায় দিই।’
‘মালাই চাকি কী?’
‘মালাই চাকি চিনিস না? তুই আসলেই একটা সুশীল। বাটি, বাটি। হাঁটুর বাটি।’
‘দরকার নাই। এমনিতেই বেচারা ক্রাচ নিয়ে হাঁটে।’
‘বেচারা? ও তো এখনো তোর পিছু ছাড়ে নাই। ক্রাচ নিয়ে হাঁটে বলে চুপচাপ আছে, এটা ভাবিস না। এই টাইপ ছেলেদের আমি ভালোমতো চিনি। এরা মনে কর, চল্লিশ বছর পরও তোর পেছনে লেগে থাকবে। মালাই চাকি দিলে কিছু করার আগে মনে পড়বে, না থাক। অফ যাই। এমনিতেই আমার মালাই চাকি নাই।’
‘এখন তুই অফ যা তো। আমি অন্য একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি।’
‘কী সেটা?’
‘ধর, তোর সোর্স যেমন আমাদের ছবি তুলেছে, জিকোও তো তুলতে পারে।’
‘পারেই তো। ও তো তোদের আরও কাছাকাছি ছিল।’
‘হ্যাঁ। তোর সোর্স ছবিটা ভালো উদ্দেশ্যেই তুলেছে। কিন্তু জিকোর উদ্দেশ্য যে ভালো নয়, তা তো আমি জানি। যদি ছবি তুলে থাকে, ও অবশ্যই কোনো একটা ঝামেলা করবে।’
‘এ জন্যই তো ওকে ডেকে মালাই চাকি খুলে দিতে হবে।’
‘আরে রাখ তোর মালাইচাকি।’
‘ওকে ডাকতে চাস না, ভালো কথা। তাহলে ওর বাসায় গিয়ে পিটাই, চল। মাঝেমধ্যে আমরা হোম সার্ভিসও দিই।’
‘বাসায় গিয়ে পিটাবি? ওর চাচা ওয়ার্ড কাউন্সিলর। জানিস সেটা?’
‘সে এক চরম মর্মান্তিক ইতিহাস…’ এটুকু শুনেই ‘ওহ নো’ বলে উঠে গেল রাতুল। সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করল না শিহাব। গল্প বলে চলল, ‘তখন আমি অনেক ছোট। চার কি পাঁচ বছর হবে বয়স।
‘তাহলে তো আরও ভালো। পেটানোর পর সবাই একটা করে চারিত্রিক সনদ নিয়ে আসব কাউন্সিলরের কাছ থেকে।’
‘এই মর্মে প্রত্যয়ন করা যাইতেছে যে জনাব রাতুল বাংলাদেশের একজন নাগরিক। তার স্বভাবচরিত্র ভালো। খালি মাঝেমধ্যে মানুষের হাঁটুর মালাই চাকি উত্তোলন করতে চায়…’
‘এবার তো তোরটাই খুলে ফেলতে হবে দেখছি!’
‘দোস্ত, তোদের কারও ফোনে ডেটা আছে?’ পেছন থেকে এসে বলল শিহাব।
‘আছে। কেন?’ জিজ্ঞেস করল ইভান।
‘একটু হটস্পট দে না। রিলস দেখছিলাম, আঁতকা ডেটা শেষ হয়ে গেল।’
‘যা সর। তুই রিলস দেখবি, এ জন্য আমি ডেটা দেব? অসম্ভব।’
‘দে না, এমন করিস কেন?’
‘উঁহু। সারা দিন কানলেও পাবি না।’
‘কিছুক্ষণ হটস্পট চালাতে দিলে আমি তোকে বলব, কেন আমার একটা আঙুল নেই।’ হেসে শিহাবের ওপর গড়িয়ে পড়ল রাতুল। বন্ধুর পিঠে হালকা থাপ্পড় দিয়ে বলল,
‘এক আঙুলের স্টোরি বেচে আর কয় দিন খাবি?’
‘যত দিন না নতুন স্টোরি পাচ্ছি, তত দিন। কিরে ইভান, শুনবি? গল্পের বিনিময়ে হটস্পট। ডিল?’
‘ডিল।’
‘ডিল বলে বসে আছিস কেন? প্রশ্ন কর। প্রশ্ন না করলে আমি শুরু করতে পারি না। বল, আচ্ছা, আপনার একটা আঙুল নেই কেন?’ হেসে ফেলল ইভান। তারপর টিভি চ্যানেলের প্রেজেন্টারদের মতো জিজ্ঞেস করল,
‘আচ্ছা, আপনার একটা আঙুল নেই কেন?’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করল শিহাব। তারপর শুরু করল।
‘সে এক চরম মর্মান্তিক ইতিহাস…’ এটুকু শুনেই ‘ওহ নো’ বলে উঠে গেল রাতুল। সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করল না শিহাব। গল্প বলে চলল, ‘তখন আমি অনেক ছোট। চার কি পাঁচ বছর হবে বয়স। বড় ভাই আমার চেয়ে দুই বছরের বড়। ঈদের ছুটিতে আমরা গিয়েছিলাম দাদাবাড়ি। খুব মজা হচ্ছিল। এদিক–সেদিক ছোটাছুটি করছিলাম আমরা। হঠাৎ…’
‘হঠাৎ?’
‘হঠাৎ দেখলাম ধারালো এক দা হাতে এগিয়ে আসছে একটা লুঙ্গি পরা লোক। খালি গা। সূর্যের আলোয় দা-টা চকচক করছে। উঠানে কয়েকটা ডাব পড়ে ছিল, লোকটা ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে দা দিয়ে ডাব কাটতে লাগল। আমরা দুই ভাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার ডাব কাটা দেখতে লাগলাম। এর আগে আমরা কোনো দিন কাউকে এত সুন্দর করে ডাব কাটতে দেখিনি।’
‘তারপর?’
‘হ্যাঁ। তবে ব্যাপার কী জানিস, আঙুল আসলে চারটাই ভালো। এই ধর, আমাদের কপাল। কপাল কিন্তু চার আঙুল। একদম খাপে খাপ।’ ইভান সঙ্গে সঙ্গে কপালে হাত দিয়ে মেপে দেখল। আসলেই, কপালের মাপ ঠিক চার আঙুল।
‘আমাদের ইচ্ছা হলো ডাব কাটার। তক্কে তক্কে রইলাম। দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে, তখন আমরা রান্নাঘর থেকে দা নিয়ে আসলাম। উঠানে ডাব তো ছিলই। বড় ভাই কোটায় আমার ভাই হাতে তুলে নিল দা, আমি ধরলাম ডাব। তারপর বড় ভাই দা দিয়ে ডাবের ওপর দিল এক কোপ—ঘ্যাচাং! ডাবের তেমন কিছু হলো না, আমার কেনি আঙুলটা খসে পড়ে গেল মাটিতে।
‘ইশ্!’ শিউরে উঠল ইভান।
‘গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। কী করব, বুঝতে পারলাম না দুই ভাই। নিজের আঙুল তো আর ফেলে দেওয়া যায় না। তাই আঙুলটা তুলে ঘরে গিয়ে দাদিকে বললাম, দাদি, দেখো আমার আঙুল নেই। দাদি পাত্তাই দিল না। তারপর যখন দেখল আমি এক হাতে আমার আঙুল ধরে আছি, রক্ত পড়ছে, দেখেই দাদি এক চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। সেটা দেখে অজ্ঞান হয়ে গেল আমার বড় ভাই। তার পর থেকে আঙুলটা আর হাতের সাথে নাই। তবে আমার পকেটেই আছে। দেখবি? এই দেখ…’ বলে পকেট থাকে মুঠো করা হাত বের করে ইভানের মুখের সামনে খুলল শিহাব। চমকে উঠল ইভান। তাকিয়ে দেখল, হাতে কিছু নেই। ফাঁকা।
‘ওরে বাপরে বাপ! আমি তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম!’ হাঁপ ছেড়ে বলল ইভান। ‘কী সাংঘাতিক!’
‘হ্যাঁ। সেই থেকে আমার বাঁ হাতে চারটা আঙুল। হিসাব করার সময় আমি পাঁচ থেকে গুনি।’
‘বলিস কী!’
‘হ্যাঁ। আর কাউকে থাপ্পড় মারলে সেটা মানুষ মনে রাখে অনেক দিন। সবারটায় তো পাঁচ আঙুলের ছাপ পড়ে, আমি মারলে পড়ে চার আঙুলের ছাপ।’
‘কীহ!’
‘হ্যাঁ। তবে ব্যাপার কী জানিস, আঙুল আসলে চারটাই ভালো। এই ধর, আমাদের কপাল। কপাল কিন্তু চার আঙুল। একদম খাপে খাপ।’ ইভান সঙ্গে সঙ্গে কপালে হাত দিয়ে মেপে দেখল। আসলেই, কপালের মাপ ঠিক চার আঙুল। শিহাব বলল,
‘তো দে এবার। হটস্পট দে।’ হটস্পট অন করল ইভান। কানেক্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে ডুবে গেল শিহাব।
ঠোঙাভর্তি ছোট ছোট শিঙাড়া নিয়ে এল রাতুল। বাড়িয়ে দিল ইভান আর শিহাবের দিকে। শিহাব শিঙাড়া নিল ফোনের দিকে তাকিয়েই।
‘কিরে, কয় নম্বরটা বললি?’ শিঙাড়ায় কামড় বসিয়ে শিহাবকে জিজ্ঞেস করল রাতুল।
‘কয় নম্বর মানে?’ ইভান অবাক।
‘ওর এই আঙুলের অনেকগুলো গল্প আছে। একেকজনকে একেকটা বলে। তোকে কোনটা বলেছে?’
‘ডাব কাটতে গিয়ে…’
‘ওটা তিন নম্বর। এ রকম ছয়টা-সাতটা গল্প আমরা শুনেছি। যত দিন যাচ্ছে, তত বাড়ছে গল্পের সংখ্যা।’
‘বলিস কী!’
‘আরে কী অদ্ভুত, সব সময় এক গল্প বলতে ভালো লাগে নাকি?’ আরেকটা শিঙাড়া নিয়ে বলল শিহাব।
‘তোদের এখনো বিশ্বাস করি, এই ব্যাপারটাই আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে মাঝেমধ্যে।’ বিরক্ত হয়ে বলল ইভান। ‘গেলাম আমি বাসায়।’ লাফ দিয়ে দেয়াল থেকে নামল ইভান।
‘আরে, আমার হটস্পটের কী হবে…?’ চেঁচিয়ে বলল শিহাব।
‘বেশি দরকার হলে পেছন পেছন দৌড়া।’ যেতে যেতে বলল ইভান।
দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিল ইভান। বাইরে বের হলো বিকেলে। কোচিং শেষে রুশার আসার কথা। নুরুল ইসলামের বাসায় যাওয়ার চেষ্টা করবে ওরা আজ। হাঁটতে হাঁটতে তিন রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়াল ইভান। শিস বাজাতেই ছুটে এল ডগেশ আর রকি। তিনজন মিলে হাঁটা শুরু করল গলির ভেতর। আলো কমে আসছে। মাঝেমধ্যেই মাথার ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুরছে মশা। ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। এই ল্যাম্পপোস্টগুলো কোত্থেকে নিয়ন্ত্রণ করে, জানার খুব ইচ্ছা ইভানের। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। ফোন বেজে উঠল ওর। রুশা।
‘হ্যালো।’
‘ইভান, গলির মাথায় আসো। আমি রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়েছি।’
‘ওকে।’
‘হাজার হাজার টাকা নিয়া রাখসিল কত লোক, তাদের কারও খবর নাই। আর তোমরা পোলাপান মানুষ, বাসা খুঁইজা ঠিকই চইলা আসলা।’
দ্রুত পা চালাল ইভান। ডগেশ আর রকিও ছুটল পেছন–পেছন। ওরা রিকশার কাছে আসতেই হাসি ফুটল রুশার মুখে।
‘আরে, তুমি তো ছোটখাটো একটা মিছিল নিয়ে এসেছ।’
‘ও হলো ডগেশ। আর ও রকি।’ রিকশায় উঠে পড়ল ইভান। ‘অ্যাই, তোরা আসবি না পেছন–পেছন। যা ভাগ।’ কুকুর দুটিকে বলল ও। রিকশা চলতে শুরু করল। কিছুদূর ছুটে থেমে গেল কুকুর দুটি। রিকশার দিকে তাকিয়ে জিব বের করে লেজ নাড়তে লাগল জোরে জোরে।
‘আমরা কি তাহলে ওই বাসায় যাচ্ছি?’ জিজ্ঞেস করল ইভান।
‘তো আর কোথায় যাব?’
‘খালি ত্যাড়া কথা বলো কেন? বললেই তো হয়, হ্যাঁ, যাচ্ছি।’
‘তুমি এমন প্রশ্ন করো কেন?’
‘ধুর। শোনো, সাবধান হতে হবে আমাদের। জিকো কাল আমাদের ফলো করেছে।’
‘কী বলো! কীভাবে জানলে?’
‘এক ফ্রেন্ড দেখেছে। এই দেখো।’ পকেট থেকে ফোন বের করে রাতুলের পাঠানো ছবিটা দেখাল ইভান।
‘এই ছেলে তো তোমার পিছু ছাড়ছেই না।’
‘হ্যাঁ। নিশ্চয়ই ওর কোনো মতলব আছে। সো, সাবধান।’
‘ওকে।’
জি ব্লকে এসে রিকশা থেকে নামল ওরা। হেঁটে এগোল গলির মাঝখান দিয়ে। অসংখ্য দোকান, ফুডকার্ট পার হয়ে অন্য একটা গলিতে ঢুকল ওরা। গলির মাথায় এক নোংরা ভবঘুরেকে বসে থাকতে দেখে ভয়ে চমকে উঠল রুশা। ওর অবস্থা দেখে বিকট শব্দে হাসল ইভান। নুরুল ইসলামের বাসাটা আগের দিনই দেখিয়ে দিয়েছিল চায়ের দোকানদার। আজকে খুঁজে বের করতে সময় লাগল না ওদের। দই-ফুচকার দোকানের বিল্ডিংয়ের দোতলায় চলে এল ওরা। কলিং বেল চাপার মিনিটখানেক পর এসে দরজা খুললেন একজন মহিলা।
‘তোমরা?’
‘আমরা…’ ইতস্তত করল ইভান।
‘আন্টি, আমরা পাশের এলাকার।’ রুশা বলল। ‘আঙ্কেলের দোকানে আমরা রেগুলার খেতে আসতাম। কিছু টাকা বাকি ছিল, দিতে এলাম।’
‘আসো, ভেতরে আসো।’
‘না না, থাক আন্টি।’ ইতস্তত করল ইভান।
‘আরে আসো তো।’ কপট ধমক দিলেন মহিলা।
স্যান্ডেল খুলে ভেতরে ঢুকল ওরা। খুব সাধারণ একটা বসার ঘর। সোফা, একটা টেবিল। এক পাশে ঘরের তুলনায় বেশ বড় একটা শোকেস। সেখানে শোপিসের চেয়ে প্লেট–বাটির সংখ্যা বেশি। দেয়ালে ঝোলানো টিভিতে ভারতীয় সিরিয়াল চলছে। সোফায় একটা বালিশও আছে। বোধ হয় সোফায় শুয়ে টিভি দেখছিলেন ভদ্রমহিলা।
বাতি জ্বেলে টিভি মিউট করে সোফায় বসে তিনি বললেন, ‘আমি তোমাদের আন্টি।’
‘জি, আমরা বুঝতে পেরেছি।’ রুশা বলল। ব্যাগ খুলে টাকা বের করতে গেল ও। বাধা দিলেন আন্টি।
‘ঊঁহু। লাগবে টাকা লাগবে না। তোমরা আসছ, এতেই আমি খুশি হইসি। টাকা রাইখা দাও। কত টাকা বাকি ছিল?’
‘এক শ টাকার মতো।’
রুশার কথায় হাসলেন মহিলা।
‘হাজার হাজার টাকা নিয়া রাখসিল কত লোক, তাদের কারও খবর নাই। আর তোমরা পোলাপান মানুষ, বাসা খুঁইজা ঠিকই চইলা আসলা।’
‘আঙ্কেলের খবরটা শোনার পর থেকেই আমাদের খুব খারাপ লাগছিল।’ বলল রুশা। ওর কথায় বিস্মিত হলো ইভান। ওকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বহুদিন থেকে চেনে লোকটাকে। এমন চোখে চোখ রেখে মিথ্যা বলে কীভাবে মেয়েটা?
একটু পর কাজের লোক এসে দুই গ্লাস শরবত রেখে গেল ওদের সামনে।
‘শরবত খাও।’ বললেন আন্টি। ‘খুব ভালো মানুষ ছিল তোমাদের আঙ্কেল। চারটা দোকান। সবগুলা দেইখা হিসাব নিয়া রাত কইরা বাড়ি ফিরত। কত দিন কইসি, এত রাত কইরো না। বিপদ–আপদ হইতে পারে। শোনে নাই। সেই দিন আমারে ফোন দিয়া কইল, ডিম ভাজি করো। ডিমভাজি দিয়া ভাত খাব। আমি ডিমভাজি কইরা বইসা আছি, তার খবর নাই। ফোন করি, ফোন ধরে না। না খাইয়াই আমি ঘুমায় গেলাম। এই সোফাতেই। হঠাৎ ফোন বাজল। ধইরা শুনি সে নাই…।’ ইভান দেখল, মহিলার চোখে পানি টলমল করছে। কী বলবে, বুঝতে পারল না ও। রুশা বলল, ‘আন্টি, আমি আপনার কাছে এসে একটু বসি?’ উনি মাথা নাড়লেন। রুশা তাঁর কাছে গিয়ে বসতেই রুশাকে ধরে কেঁদে ফেললেন আন্টি। রুশাও জড়িয়ে ধরল তাঁকে। ওর চোখেও পানি দেখে তাজ্জব হয়ে গেল ইভান। রুশা তো একেবারে পেশাদার অভিনেতা। এত নিখুঁত ওর অভিনয়, মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি কাঁদছে। ওদের নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন আন্টি। ঘরে ঢুকতেই দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধাই করা নুরুল ইসলামের ছবি দেখতে পেল ইভান। পত্রিকা আর অনলাইনে ঘাঁটাঘাঁটির সময় এই ছবিটাই দেখেছিল ও। বেশ সুদর্শন ছিলেন লোকটা। তাঁর স্ত্রী ততক্ষণে একটা বড় অ্যালবাম বের করে এনেছেন। বিছানায় বসে সেখানকার কিছু ছবি দেখালেন ইভান আর রুশাকে। একটা গ্রুপ ছবি দেখে থমকে গেল রুশা।
‘এই আঙ্কেলকে পরিচিত লাগছে…চুল কম মাথায়…’ বলল সে। অবাক হয়ে গেল ইভান। রুশা কখনো নুরুল ইসলামকেই দেখে নাই। এই টাক মাথার লোককে দেখার প্রশ্নই আসে না। তা ছাড়া ও এই এলাকায় এসেছে মাত্র কয়েক মাস। কিন্তু এমনভাবে বলছে, বিশ্বাস না করার উপায় নেই।
‘ওর নাম ফরিদ। তোমার আঙ্কেলের সাথেই বিজনেস করে। পার্টনার বলতে পারো।’ আন্টি ব্যাখ্যা করলেন।
‘হ্যাঁ, তা–ই হবে। দোকানে দেখেছি মনে হয়।’ মাথা নেড়ে বলল রুশা। আরও কিছু ছবি দেখালেন আন্টি। নিচের দোকান থেকে দই–ফুচকা এনে খাওয়ালেন। তারপর বিদায় নিল ইভানরা। যাওয়ার সময় কথা দিয়ে এল, মাঝেমধ্যেই আসবে। আন্টি এটাও বললেন, দোকান খোলার পর ওয়াফল ওদের জন্য ফ্রি।
নুরুল ইসলামের বাসার গলি থেকে বেরিয়ে ভেতরের বিস্ময় আর গোপন রাখতে পারল না ইভান।
‘ভাই রে ভাই! তুমি যে এ রকম পাকা অভিনেতা, এটা তো জানতাম না। এ রকম ইনস্ট্যান্ট কেঁদে ফেললা কীভাবে? আমি তো ভেবেছিলাম রিয়েল!’
‘অভিনয় করি নাই। আমি সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলেছিলাম।’ থমকে দাঁড়াল ইভান।
‘বলো কী? আসলেই? কেন? তুমি তো ওদের কাউকে চেনোই না।’
‘ওই আন্টি যখন আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। মা অনেক দিন আমার সাথে দেখা করে না।’ গলা ভারী হয়ে এল রুশার। চুপ করে রইল ইভান। হাঁটতে হাঁটতে আরেকটা গলিতে এসে পড়ল ওরা। রুশা বলল,
‘ইভান, ওই টাক মাথার লোকটাই নুরুল ইসলাম আঙ্কেলকে খুন করেছে।’
‘মানে! কীভাবে বুঝলে?’
‘আমি জানতাম আগে থেকেই। লোকটাকে দেখার পর নিশ্চিত হলাম।’
‘কী যে বলো। চেনো না, জানো না, একটা লোককে খুনি বানিয়ে দিলে! এটা কোনো কথা হলো?’
‘তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছ না?’
‘না। বিশ্বাস করার মতো কোনো কথা তুমি বলছ না, রুশা। লোকটার জাস্ট একটা ছবি দেখেছ তুমি। তা–ও একটা পারিবারিক গ্রুপ ছবি। এটাতে এমন কী পেলে, যেটা দেখে তুমি শিওর বলে দিচ্ছ এই লোকটাই খুনি?’
‘বিড়ালটা…’
‘বিড়ালটা বলেছে তোমাকে। এ–ই তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘আশ্চর্য!’
দ্রুত চিন্তা করল ইভান। চারজনই বসে আছে মোটরসাইকেলে। নামতে একটু হলেও সময় লাগবে ওদের। ওই সময়টাই কাজে লাগাতে হবে। নিজের অবস্থান দেখে নিল ইভান। বাঁ পাশের মোটরসাইকেলটার খুব কাছেই আছে ও।
‘ইভান, তুমি বোঝার চেষ্টা করো। বিড়ালটা ওই সময় ওই জায়গায় ছিল। ও দেখেছে পুরো ঘটনাটা।’
‘ঠিক আছে। চলো এখন। বাসায় যেতে…’ কথা শেষ করতে পারল না ইভান। বিকট শব্দে দুটি মোটরসাইকেল এসে ব্রেক কষল ওদের সামনে। হেডলাইটের আলোতে তাকাতে পারল না ইভান আর রুশা। হাত দিয়ে আলো ঠেকানোর চেষ্টা করতে করতে সামনে এগোল ইভান।
‘কিরে, তোরা কারা? এই গলিতে কী?’ ধমকে উঠল মোটরসাইকেলে বসা একজন। ইভান দেখল, দুটি মোটরসাইকেলে মোট চারজন বসা। ‘কিরে ওই, কথা কস না ক্যান? কথা ক। তোরা কোন এলাকার?’
‘কাছেই।’
‘এদিকে কী?’
‘কিছু না।’
‘কিছু না মানে? ওই, এগো মোবাইল চেক কর। তোরা দই-ফুচকার বিল্ডিংয়ে গেসিলি ক্যান?’
‘দই ফুচকা খেতে। কেন? আপনাদের কী সমস্যা? মোবাইল চেক করবেন মানে? আপনারা কারা?’
‘আর এভাবে চোখের ওপর লাইট মারছেন কেন? লাইট অফ করে কথা বলেন।’ ধমক দিল রুশা।
‘একটা বন মারমু। চোখেই দেখবি না আর। বাইর কর মোবাইল।’
দ্রুত চিন্তা করল ইভান। চারজনই বসে আছে মোটরসাইকেলে। নামতে একটু হলেও সময় লাগবে ওদের। ওই সময়টাই কাজে লাগাতে হবে। নিজের অবস্থান দেখে নিল ইভান। বাঁ পাশের মোটরসাইকেলটার খুব কাছেই আছে ও। ডান হাত দিয়ে রুশার হাত ধরল ও। ঝট করে ওর দিকে তাকাল রুশা। মাথা হালকা কাত করে ইশারা করল ইভান। রুশা বুঝে ফেলল। দৌড়াতে হবে।
‘কিরে, কথা কানে যায় না? ফোন বাইর করবি, নাকি নামমু?’
‘নামেন।’ বলেই বাঁ হাত দিয়ে বাইকের চাবিটা টেনে খুলল ইভান। সঙ্গে সঙ্গে দৌড় দিল রুশার হাত ধরে। পেছন থেকে ‘ধর ধর’ বলে ছুটল মোটরসাইকেলে বসা লোকগুলো। ছুটতে ছুটতেই মোটরসাইকেলের চাবিটা পাশের ড্রেনের দিকে ছুড়ে মারল ইভান। কিন্তু রাস্তার ওপরই পড়ল চাবিটা। দৌড়ের গতি আরও বাড়িয়ে দিল ওরা।
‘দৌড়াও রুশা।’ বলল ইভান। ‘গলির ভেতর বাইক ঘুরিয়ে আসতে ওদের খুব একটা টাইম লাগবে না।
‘দৌড়াচ্ছি তো…’
পেছনে বাইকের শব্দ শুনতে পেল ইভান। চট করে আরেকটা গলিতে ঢুকে পড়ল ওরা দুজন। মোটরসাইকেল দুটি আসতে বড়জোর এক মিনিট লাগবে। কিন্তু থামল না ওরা।
‘কোনো একটা বাসায় ঢুকে যাই, চলো।’
‘সেটাই ভাবছি। ওয়েট।’ বুদ্ধি এল ইভানের মাথায়। দৌড়ে গলির মাথায় চলে এল ওরা। এখানে এই গলির একটা মেইন গেট আছে। রাত ১২টায় বন্ধ করে দেওয়া হয় লোহার গেটটা। রুশার হাত ছেড়ে দিয়ে দরজার একটা পাল্লার ছিটকিনি খুলতে লাগল ইভান। পেছনে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে রুশা। কী করছে ইভান, বুঝে ফেলল সঙ্গে সঙ্গেই। অন্য পাশের পাল্লাটার ছিটকিনি খুলতে শুরু করল ও। মোটরসাইকেলগুলো গলিতে ঢুকে তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছে। একেবারে শেষ মুহূর্তে দুপাশ থেকে দুটি গেটের দুটি পাল্লা এক করে ফেলল ইভান আর রুশা। ঠেলে লাগাল গেটের মাঝখানের ছিটকিনিটা। বিকট শব্দে হর্ন দিতে লাগল মোটরসাইকেল দুটি। সঙ্গে অকথ্য গালাগাল।
‘ওপাশ থেকে হাত দিয়ে ছিটকিনি খুলে ফেলবে ওরা।’ রুশা বলল।
‘খুলুক। তার আগেই আমরা চলে যাব এখান থেকে।’
‘কীভাবে?’
‘ওই দেখো।’ রুশা দেখল, ডান পাশ থেকে একটা পিকআপ আসছে। ‘গলির মাথায় এসে স্লো করবেই পিকআপটা। সঙ্গে সঙ্গে ওটার পেছনে উঠে পড়তে হবে। পারবা?’
‘জীবনেও না।’ রুশা বলল।
‘জাস্ট বাংকারে পা রাখব। আসো।’ রুশার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ইভান। গতি কমানোর সঙ্গে সঙ্গে পিকআপের বাংকারে পা রাখল দুজন। এক হাতে শক্ত করে পিকআপের ডালা ধরে রাখল ইভান। আরেক হাতে ধরে রাখল রুশাকে। রুশা দুই হাত দিয়ে ধরে রেখেছে পিকআপের ডালা। মেইন রোডে ঢোকার আগেই পিকআপ থেকে নেমে গেল ওরা দুজন। দ্রুত একটা রিকশা নিয়ে ঢুকে পড়ল পাশের গলিতে। শব্দ শুনে টের পেল, মোটরসাইকেল দুটি ছুটছে পিকআপটার পেছনে।
হাঁপ ছেড়ে বাঁচল দুজন। দৌড়ে ঘেমে চুপসে গেছে দুজনই। ভয়ে হাত–পা কাঁপছে রুশার।
‘আমি জীবনে কোনো দিন এভাবে দৌড়াই নাই…মরেই যেতাম আজকে…ওরা কারা?’
‘আমার মনে হয়…জিকোর দলবল…ফলো করেছে আমাদের।’
‘কিন্তু কেন?’
‘জানি না। মনে হয় আমাদের ফলোয়ার।’
হেসে উঠল দুজনই।
আজকেও বাসায় ঢুকতে ঢুকতে সাতটা বেজে গেল। আজকে নিশ্চিত বকা দেবে ফুফু। ভাগ্যিস, ফুফা এখনো আসেন নাই। ভয়ে ভয়ে গোসল করতে গেল ইভান। গোসল শেষে বেশ হালকা লাগল ওর। ‘জিকোর সঙ্গে একটা চিরস্থায়ী বোঝাপড়া করে ফেলতে হবে।’ ভাবল ও। ‘কদিন পরপর এই সব আর ভালো লাগছে না। আজকেই একটা অ্যাকসিডেন্ট হতে পারত। আমার না হোক, রুশার তো হতেই পারত।’ বিছানায় গা এলিয়ে দিল ইভান। ফোন বেজে ওঠায় উঠে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। নিশ্চয়ই বাবা। কিন্তু উঠে গিয়ে দেখল অচেনা নম্বর।
‘হ্যালো।’
‘ইভান বলছ?’
‘জি…আপনি কে বলছেন?’
‘আমি থানা থেকে বলছি, ওসি মোস্তাফিজ।’
‘স্যার…কেমন আছেন?’
‘আছি। তুমি কোথায় এখন?’
‘বাসায় স্যার।’
‘তোমাকে একটু থানায় আসতে হবে। এখনই। পারবা না?’
‘কেন স্যার?’
‘আসো, তারপর বলছি। দ্রুত আসো, ঠিক আছে?’
‘জি স্যার।’
ফোন রেখে চিন্তিত হয়ে গেল ইভান। ‘হঠাৎ আমাকে কেন থানায় যেতে বললেন রুশার বাবা? রুশার কিছু হয়েছে? ওকে কি জানানো উচিত?’ ভাবতে ভাবতেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ‘ফুফু, আমি একটু আসছি, আর্টপেপার কিনতে হবে অ্যাসাইনমেন্টের।’ বলে বাসা থেকে বের হলো ইভান। কিন্তু ও জানে না, আসলে কখন ফিরবে।
চলবে...
আদনান মুকিতের লেখা 'দ্য নিউ অ্যাডভেঞ্চার অব ফার্মের মুরগি' ২০২৩ সালের জানুয়ারি সংখ্যা থেকে কিশোর আলোতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রথমা প্রকাশনী থেকে কিশোর উপন্যাসটি পরিমার্জিত হয়ে বই হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি কিনতে পাওয়া যাবে এই লিংক থেকে: 'দ্য নিউ অ্যাডভেঞ্চার অব ফার্মের মুরগি' । লিংকে ক্লিক করে বইটি অর্ডার করতে পারো অথবা ফোন করো এই নম্বরে: 01730000619